মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই জটিল সমীকরণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কৌশলগত জোটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তবে সাম্প্রতিক এক অবকাঠামো উদ্যোগ এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যে নতুন আলোড়ন তুলতে পারে। সৌদি আরব যে ফাইবার অপটিক কেবল প্রকল্পে সিরিয়াকে ট্রানজিট দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে—এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত বা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির গভীর পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করছে। ভূমধ্যসাগর হয়ে সৌদি আরবকে গ্রিসের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পিত এই কেবল প্রকল্প এখন মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার খেলায় নতুন অধ্যায় রচনা করতে যাচ্ছে।
প্রাথমিক আলোচনায় ধারণা ছিল, কেবলটি ইসরায়েল হয়ে যাবে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব-ইসরায়েল সম্পর্কের উষ্ণতার ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু রিয়াদের নতুন অবস্থান—সিরিয়া হয়ে গ্রিসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন—ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সৌদি নেতৃত্ব তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে অবকাঠামোগত রুট পরিবর্তনের সম্ভাবনা কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও পড়া হচ্ছে।
ফাইবার অপটিক কেবল আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির স্নায়ুতন্ত্রের মতো কাজ করে।
আলোর স্পন্দনের মাধ্যমে মিলিসেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ তথ্য এক দেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছে দেয় এই কেবল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে যে দেশগুলো দ্রুত, নিরাপদ এবং বিকল্প ডেটা রুট নিশ্চিত করতে পারে, তারাই ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। উপসাগরীয় দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে নিজেদেরকে বৈশ্বিক ডেটা ও এআই হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বড় বিনিয়োগ শুরু করেছে। ফলে ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি উচ্চক্ষমতার ডেটা সংযোগ তাদের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২২ সালে ঘোষিত ‘ইস্ট টু মেড ডেটা করিডর’ বা ইএমসি প্রকল্প মূলত এই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়। সৌদি টেলিকম কোম্পানি এসটিসি, গ্রিসের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী পিপিসি, গ্রিক টেলিকম কোম্পানি এবং স্যাটেলাইট অ্যাপ্লিকেশন কোম্পানি টিটিএসএ—এই যৌথ উদ্যোগ ইউরোপ ও উপসাগরের মধ্যে একটি দ্রুত ডেটা করিডর গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু প্রকল্পের প্রযুক্তিগত রুট এখন কূটনৈতিক অর্থে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। কারণ রুটের মধ্য দিয়ে কোন দেশ যুক্ত হবে, সেটিই হয়ে উঠেছে মূল রাজনৈতিক প্রশ্ন।
সৌদি আরব যদি সত্যিই সিরিয়াকে এই করিডরের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে, তবে তা হবে দামেস্ককে আঞ্চলিক পরিসরে পুনর্বাসনের একটি বড় পদক্ষেপ। এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে থাকা সিরিয়া ধীরে ধীরে আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করছে। সৌদি বিনিয়োগ—বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ খাতে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ঘোষিত পরিকল্পনা—দামেস্ককে অর্থনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করার পথে বড় সহায়তা হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দেয়, রিয়াদ সিরিয়াকে ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সংযোগের একটি লজিস্টিক হাব হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
এই সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসরায়েলকে আংশিকভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া। ২০২০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে কার্যত স্থগিত করে দেয়। গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি আরব জনমতকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে, যা সৌদি নেতৃত্বের ওপরও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। ফলে দৃশ্যমান সহযোগিতা থেকে কিছুটা দূরত্ব রাখা এখন রিয়াদের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক হতে পারে।
এখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আরব বিশ্বের মধ্যে আমিরাতই বর্তমানে ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার। ইয়েমেন, সুদান ও লোহিত সাগর ইস্যুতে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করেছে। সৌদি আরব যদি নতুন অবকাঠামো নেটওয়ার্কে সিরিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তা আমিরাত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতার একটি ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
গ্রিস এই সমীকরণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। এথেন্স নিজেকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে জ্বালানি, রিয়েল এস্টেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। উপসাগরীয় বিনিয়োগ আকর্ষণে গ্রিস সক্রিয় কূটনীতি চালাচ্ছে। তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে গ্রিস ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে, বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে পূর্ব ভূমধ্যসাগর নিয়ে বিরোধের প্রেক্ষাপটে। ফলে সৌদি আরব যদি প্রকল্পের রুটে ইসরায়েলকে বাদ দেয়, তাহলে গ্রিসকে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ভূরাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি, সামুদ্রিক সীমানা ও নিরাপত্তা প্রতিযোগিতায় উত্তপ্ত। তুরস্ক এই অঞ্চলের একটি বড় অংশে দাবি জানায়, যা গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে বিরোধ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় যেকোনো নতুন সাবমেরিন কেবল বা বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্প কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং সামুদ্রিক আইনি ও নিরাপত্তা হিসাবেও জটিল হয়ে ওঠে। অতীতে গ্রিস-সাইপ্রাস-ইসরায়েল গ্যাস পাইপলাইন কিংবা গ্রেট সি ইন্টারকানেক্টর কেবল—উভয় প্রকল্পই নানা কারণে বিলম্ব বা স্থবিরতার মুখে পড়েছে। তাই ইএমসি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথও পুরোপুরি মসৃণ নয়।
তবু বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, ডেটা কেবল প্রকল্পগুলো জ্বালানি পাইপলাইনের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য। কারণ এগুলোর অবকাঠামোগত ঝুঁকি কম এবং অর্থনৈতিক রিটার্ন দ্রুত পাওয়া যায়। ইতিমধ্যে গ্রিক ও সৌদি ব্যাংকগুলো প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থায়নে চুক্তি করেছে এবং আলকাতেল সাবমেরিন নেটওয়ার্কসের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তিও সই হয়েছে। এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে পরিকল্পনাটি কেবল কাগুজে নয়, বাস্তব অগ্রগতির দিকেও এগোচ্ছে।
ডিজিটাল অবকাঠামোর গুরুত্ব আগামী দশকে আরও বাড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালাতে যে বিপুল ডেটা প্রবাহ প্রয়োজন, তা নির্ভর করবে উচ্চক্ষমতার ফাইবার নেটওয়ার্কের ওপর। উপসাগরীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে বিশাল ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করছে। ইউরোপে দ্রুত তথ্য পাঠানোর বিকল্প রুট তৈরি করা তাদের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিকল্প স্থলপথ খোঁজার প্রবণতা তাই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের দৃষ্টিতে সিরিয়াকে আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র বানানোর চিন্তা একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূঅর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ ও ডেটা—সব ধরনের নেটওয়ার্ক যদি সিরিয়া হয়ে যায়, তবে দামেস্ক নতুন করে ট্রানজিট অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারবে। একই সঙ্গে রিয়াদ মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামোগত মানচিত্রে নিজের প্রভাব আরও গভীর করতে পারবে।
তবে ঝুঁকিও কম নয়। সিরিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনো ভঙ্গুর, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নও পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করা সহজ হবে না। তাছাড়া আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও প্রকল্পের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ইসরায়েলকে পাশ কাটানোর যেকোনো উদ্যোগ ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতেও সংবেদনশীল হতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েল-গ্রিস অংশীদারিত্বকে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন করে আসছে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের সম্ভাব্য রুট পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। এটি দেখাচ্ছে যে অবকাঠামো এখন কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়; বরং কূটনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আগামী কয়েক বছরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, সিরিয়ার স্থিতিশীলতা এবং সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ডিজিটাল মানচিত্র কোন দিকে মোড় নেবে।
আপনার মতামত জানানঃ