মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের গন্ধ ভাসছে। পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির নিচে জমে উঠছে অদৃশ্য উত্তাপ। দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আঘাতকারী যুদ্ধগোষ্ঠী এখন ইরানের সামরিক নাগালের মধ্যে অবস্থান করছে। এর একটি, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে। আরেকটি রণতরী পারস্য উপসাগরে মার্কিন উপস্থিতি জোরদার করতে মোতায়েন। সামরিক শক্তির এই প্রদর্শন নিছক মহড়া নয়; এটি একটি বার্তা। আর তেহরানও পাল্টা বার্তা দিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আমেরিকা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে পারবে না—বরং একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
এই দুই শক্ত অবস্থানের মাঝখানে চলছে নীরব কূটনীতি। জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা আলোচনায় বসেছেন। প্রশ্নটি এখন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে—এ কি প্রকৃত যুদ্ধের পূর্বাভাস, নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের দীর্ঘ, চক্রাকার উত্তেজনার আরেকটি অধ্যায়?
গত এক বছরে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলেছে। জুনে ১২ দিনব্যাপী ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যোগ দেয়। সেই ঘটনার পর থেকে হুমকি আর পাল্টা হুমকি কেবল কথার লড়াই বলে মনে হচ্ছে না। ওয়াশিংটনের অবস্থানও কঠোর। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো গ্রহণযোগ্য চুক্তি না হলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে। তাঁর নীতিনির্ধারণের অপ্রত্যাশিত স্বভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে; আলোচনার মাঝেই তিনি আগে সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন—এই নজির এখনও তাজা।
তবে সামরিক প্রস্তুতি মানেই যুদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি পুরোনো কৌশল হলো জবরদস্তিমূলক কূটনীতি—চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে নমনীয় করা। উপসাগরে রণতরী মোতায়েন, আকাশে নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা—এসবের উদ্দেশ্য হতে পারে বোঝানো যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগে দ্বিধা করবে না। কিন্তু এই কৌশলের বড় ঝুঁকি হলো ভুল বোঝাবুঝি। কোনো ভুল সংকেত, ভুল ব্যাখ্যা, কিংবা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া মুহূর্তেই সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এটিই তথাকথিত নিরাপত্তা দ্বন্দ্ব—যেখানে এক পক্ষের আত্মরক্ষামূলক প্রস্তুতি অন্য পক্ষের কাছে আক্রমণের পূর্বাভাস বলে মনে হয়।
ইরানও বসে নেই। ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়া চালিয়েছে। তেহরান বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রয়োজনে তারা ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে। কিন্তু এখানেও দ্বিধা আছে। উপসাগরীয় অনেক মার্কিন ঘাঁটি এমন দেশে অবস্থিত, যাদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক পুরোপুরি শত্রুতাপূর্ণ নয়। কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে আগের হামলার পর কাতারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। ফলে তেহরান জানে, অতি আগ্রাসী পদক্ষেপ কৌশলগতভাবে বিপরীত ফল দিতে পারে।
এদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো—সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান—উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। তাদের উদ্বেগ স্পষ্ট: আঞ্চলিক যুদ্ধ মানেই অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি রপ্তানিতে ধাক্কা, বিনিয়োগে ভাটা। পারস্য উপসাগরের প্রতিটি বন্দর, প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি পাইপলাইন এই উত্তেজনার সঙ্গে জড়িয়ে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্ব সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরান যদি সত্যিই এটি অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করে, তাহলে বৈশ্বিক তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং বিশ্ব অর্থনীতি নতুন ধাক্কা খাবে। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের স্মৃতি তখন আবার ফিরে আসতে পারে।
তবে সংঘাতের প্রেক্ষাপট শুধু সামরিক নয়; এটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকও। ইরান ভেতরে প্রবল চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, খাদ্যদ্রব্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণের বেশি, বিক্ষোভ হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতিকে চেপে ধরেছে। তেহরানের বড় লক্ষ্য হলো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। কিন্তু কতটা ছাড় দিলে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব, আর কতটা ছাড় দিলে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বলতার বার্তা যাবে—এই দ্বিধা তাদের নীতিনির্ধারকদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, শুধু একটি সরকারের নয়, পুরো শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব—সবই আলোচনার ফলাফলের সঙ্গে জড়িত।
আলোচনার আনুষ্ঠানিক কেন্দ্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরান বলছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তাদের সার্বভৌম অধিকার এবং তা আলোচনার অযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে শূন্য সমৃদ্ধকরণ। এই দুই অবস্থানের ফারাক বিশাল। তাছাড়া আলোচনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন—যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ বা গাজায় হামাস—এগুলো অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, তা নিয়েও মতপার্থক্য আছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ওয়াশিংটনের নজরে।
ইরানের তথাকথিত প্রতিরোধ বলয়ও আগের মতো অটুট নয়। হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়েছে, হুতিরা তুলনামূলক স্বাধীন আচরণ করছে, ইরাকি মিলিশিয়াদের নিজস্ব উদ্দেশ্য আছে। ফলে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে ইরানকে নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেরও সীমাবদ্ধতা আছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমেরিকান জনগণকে ক্লান্ত করেছে। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ মানে বিপুল ব্যয়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, এবং বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যেন উচ্চ ঝুঁকির তাসের খেলা। প্রত্যেকেই শক্তি প্রদর্শন করছে, কৌশলী ভান করছে, কিন্তু কেউই পুরোপুরি নিশ্চিত নয় পরের চাল কী হবে। একটি ভুল ড্রোন হামলা, একটি ভুল সনাক্তকরণ, একটি ভুল সিদ্ধান্ত—এসবই আগুনে ঘি ঢালতে পারে। আবার একইভাবে, একটি অপ্রত্যাশিত সমঝোতাও উত্তেজনা কমাতে পারে।
প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ কতটা ঘনিয়ে এসেছে? সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এখনো অনিবার্য বলে মনে হয় না। উভয় পক্ষই জানে, তার মূল্য ভয়াবহ। কিন্তু সীমিত সংঘর্ষ, সহযোগী গোষ্ঠীর মাধ্যমে হামলা, সাইবার আক্রমণ, কিংবা সামুদ্রিক উত্তেজনা—এসবের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। উত্তেজনা যত বাড়ে, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তত বাড়ে।
ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাত ও আলোচনার দোলাচলে ঘুরছে। কখনো নিষেধাজ্ঞা, কখনো গোপন আলোচনা, কখনো প্রকাশ্য হুমকি। বর্তমান পরিস্থিতি সেই দীর্ঘ চক্রেরই নতুন অধ্যায় হতে পারে। তবু একটি পার্থক্য আছে—এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি আরও জটিল। ইউক্রেন যুদ্ধ, এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে একটি নতুন যুদ্ধের প্রভাব আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি হবে।
এই মুহূর্তে কূটনীতির জানালা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। জেনেভার আলোচনায় যদি কোনো অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়—যেমন সীমিত সমৃদ্ধকরণে সম্মতি, আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল, বা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে পারস্পরিক অঙ্গীকার—তাহলে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু যদি আলোচনা ভেঙে যায় এবং উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করে, তাহলে সামরিক প্রস্তুতির এই ঘনঘটা দ্রুত বাস্তব সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
অতএব, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দরজায় কড়া নাড়ছে কি না—তার উত্তর সরল নয়। যুদ্ধের সম্ভাবনা বাস্তব, কিন্তু অনিবার্য নয়। এটি নির্ভর করছে কয়েকটি সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তের ওপর—কে কতটা আপস করবে, কে কতটা চাপ সহ্য করবে, এবং কে কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। পারস্য উপসাগরের জলে ভাসমান রণতরীগুলো শুধু ইস্পাতের কাঠামো নয়; তারা বিশ্বরাজনীতির অনিশ্চয়তার প্রতীক। এখন দেখার বিষয়, শক্তির এই প্রদর্শন শেষ পর্যন্ত আগুন জ্বালাবে, নাকি আলোচনার পথেই ফিরে যাবে বিশ্ব।
আপনার মতামত জানানঃ