২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া আর্থ-সামাজিক অসন্তোষ এখন ইরানে একটি বিশাল সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত অব্যাহত ও তীব্র হয়ে উঠেছে। শুরুতে এটি মূল্যস্ফীতি, রিয়ালের অবমূল্যায়ন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ক্ষুব্ধ জনগণের বিরোধের মতো হলেও দ্রুতই রাজনৈতিক ভাবধারায় পড়েছে এবং সরকারের অবসান ও বিশ্বাসযোগ্য শাসন দাবিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
ইরানের প্রায় সব প্রধান শহর — তেহরান, মাশহাদ, ইসমেফাহান, কিউম, আব্বাস ও অন্যান্য শহরে বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ করছে, তারা সরকারের কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে এবং অনেক স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হচ্ছে।
সরকারি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইন্টারনেট ও টেলিফোন যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আন্দোলনের পরিধি ও তথ্যপ্রবাহ কমিয়ে আনা যায়। সরকার ও রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বিক্ষোভকারীদের “উসকানি ও উদ্বিগ্নতা সৃষ্টিকারী” বলে অভিহিত করছে, এবং তাদের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন, ব醫বন্ধিসংস্থা ও অনলাইন ভিডিওর ভিত্তিতে জানা গেছে যে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি ও তীব্র বলপ্রয়োগ ব্যবহার করেছে, যার ফলে হতাহতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন একযোগে জানিয়েছে যে অন্তত কয়েকশ মানুষ মারা গেছেন ও আহত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন; হাসপাতালগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত ও মৃতদেহের সংখ্যা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক অধিকার সংগঠন Human Rights Activists News Agency জানায়, দেশজুড়ে প্রায় ১১৬ জনের বেশি বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন, এবং ২ হাজারেরও বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছে। সরকারি বাহিনী ও নিরাপত্তা সদস্যদের উপস্থিতিও সহিংসতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের কারণে শিশু, কিশোর ও বয়স্কসহ সাধারণ নাগরিকদেরও মৃত্যু হয়েছে এবং অনেককে গুরুতরভাবে আহত হতে হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর প্রতিক্রিয়া, লাইভ অ্যামুনিশন ব্যবহার ও অনির্দিষ্ট সংখ্যা ধারনাযোগ্য নাশকতার অভিযোগের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরানের সরকার প্রতিরোধ তুলছে পাশাপাশি কূটনৈতিক ভাবে বিরোধীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও পশ্চিমা দেশগুলোর বাধা সৃষ্টি হওয়া ও ‘বাইরের হাত’–এর হুমকি স্বীকার করছে। পার্লামেন্ট স্পিকার দাবি করেছেন, যদি বাইরের কোনো সেনা হস্তক্ষেপ ঘটে, তাহলে ইরান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে এবং অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারে।
বিক্ষোভ একটি ভিন্ন রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। অনেক নাগরিক এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান নয়, বরং সাধারণ ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তনের স্লোগান দিচ্ছেন। কিছু ভিডিওতে এমন স্লোগানও দেখা গেছে যেগুলো ১৯৭৯ সালের পূর্ববর্তী সম্রাজ্যবাদের কথা স্মরণ করে, এবং প্রাক্তন শাহের জয়ের আহ্বান শোনা যাচ্ছে।
এই বিক্ষোভের ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরও প্রখর হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও আন্তর্জাতিক নেতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমালোচনার পাশাপাশি ইরানের সরকারের প্রতি সহিংসতা কমানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন, যদিও ইরান এইধরনের চাপকে “দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ” হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান আন্দোলন ইরানের জন্য ২০২২-২৩ সালের ওম্যান, লাইফ, ফ্রিডম বিক্ষোভের পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যার ফলে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থান ও বিক্ষোভকারীদের দৃঢ়তা মিলিয়ে ইরানের অভ্যন্তর এবং আন্তর্জাতিক অঞ্চলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ