বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা যখন সামনে, তখন আঞ্চলিক কূটনীতি, বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-এর সাম্প্রতিক বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও তা দুই দেশের বৃহত্তর সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বক্তব্যটি এসেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Hindu-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। এই মন্তব্য শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির একটি ইঙ্গিতও বহন করে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুস্তরীয়, ইতিহাসনির্ভর এবং বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাণিজ্য, নিরাপত্তা, পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের সম্পর্ক কখনও উষ্ণ, কখনও টানাপোড়েনপূর্ণ থেকেছে। এমন বাস্তবতায় একটি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সম্পর্ককে আটকে না রাখার যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা কূটনৈতিক বিচক্ষণতার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে। মির্জা ফখরুলের ভাষায়, রাষ্ট্রের সম্পর্ক কোনো একটি ইস্যুর কাছে ‘বন্দি’ থাকতে পারে না। এই বক্তব্যে যেমন রাজনৈতিক দৃঢ়তা আছে, তেমনি আছে বাস্তববাদী কৌশলও।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের মধ্যে তাকে আইনের মুখোমুখি করার দাবি রয়েছে এবং ভারত যদি তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে, সেটিই হবে যৌক্তিক পদক্ষেপ। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন—ভারত যদি তাকে ফেরত না-ও দেয়, তবুও তা ব্যবসা-বাণিজ্য বা কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্তরায় হবে না। এই অবস্থানটি একদিকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা, অন্যদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। কারণ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক কেবল আবেগ বা প্রতিশোধের রাজনীতির উপর দাঁড়িয়ে টেকসই হয় না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতের উদাহরণ টেনে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৫ সালের পর শেখ হাসিনা যখন ভারতে অবস্থান করছিলেন, তখনও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ভারত সফর করে ইন্দিরা গান্ধী-র সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেই সময়টিও ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার। তবুও রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সংলাপ ও সম্পর্ক রক্ষা করা হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাষ্ট্রনীতি ব্যক্তি-নির্ভর নয়; বরং জাতীয় স্বার্থনির্ভর। অতীতের এই অভিজ্ঞতা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা হলো—আবেগ নয়, প্রাধান্য পাবে কৌশলগত বাস্তবতা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আরেকটি বড় মাত্রা হলো নদীর পানি বণ্টন। তিস্তা ও গঙ্গা চুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, চোরাচালান, অনুপ্রবেশ—এসব বিষয়ও দুই দেশের মধ্যে সংবেদনশীল ইস্যু। মির্জা ফখরুলের মতে, এসব কঠিন প্রশ্নের সমাধান যুদ্ধংদেহী মনোভাব দিয়ে নয়, আলোচনার টেবিলেই সম্ভব। তিনি এমনকি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর কথা যারা বলে, তারা বাস্তবতা বিবর্জিত। এই বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি প্রতিবেশী কূটনীতিতে উত্তেজনার বদলে সংলাপ ও কৌশলগত সংযমকে প্রাধান্য দিতে চান।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পথচলাও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি জানিয়েছেন, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব ও ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নিতে চায় তার দল। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন এখন কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি ভূ-রাজনৈতিক শক্তিরও অংশ। বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক চেইনে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে চায়, তাহলে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সমন্বয় অপরিহার্য।
অন্যদিকে, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা ও মেগা প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়নের কথাও বলেছেন। তার মতে, জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো রাখা হবে, অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হবে। এই অবস্থান অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। কারণ, বড় অবকাঠামো প্রকল্প শুধু রাজনৈতিক সাফল্যের প্রতীক নয়; তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্থিক দায়ও তৈরি করে। ফলে পুনর্মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি এক ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কারের বার্তা বহন করে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বরাজনীতিতে এখন বহুমুখী জোট, প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার সমীকরণ একসঙ্গে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে—এই উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দ্বন্দ্ব থাকা মানেই সম্পর্ক ছিন্ন নয়। বরং বাস্তবতা মেনে নিয়ে স্বার্থের জায়গায় একসঙ্গে কাজ করাই আধুনিক কূটনীতির বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটতে চায়—এমন ইঙ্গিত তার বক্তব্যে স্পষ্ট।
রাজনৈতিকভাবে এই বক্তব্যের আরেকটি দিক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভাজন তৈরি হয়েছে। কেউ ভারতঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তোলে, কেউ আবার ভারতবিরোধিতাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। এমন প্রেক্ষাপটে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়া সহজ নয়। শেখ হাসিনার হস্তান্তর চাওয়ার পাশাপাশি সম্পর্ক নষ্ট না করার প্রতিশ্রুতি—এই দ্বৈত অবস্থান রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এটি একদিকে দলীয় সমর্থকদের আশ্বস্ত করে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্বশীলতার বার্তা দেয়।
বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা চায়। তারা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংঘাত বা কূটনৈতিক উত্তেজনার মূল্য দিতে চায় না। তাই পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তববাদী ও স্থিতিশীল অবস্থান জনসমর্থন পেতে পারে। একই সঙ্গে আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতিও জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের বক্তব্যকে কেবল একটি সাক্ষাৎকারের মন্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের সম্ভাব্য পররাষ্ট্রনীতির একটি রূপরেখা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। ব্যক্তি বা দলগত বিরোধ থাকলেও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে বৃহত্তর স্বার্থে এগিয়ে নেওয়ার যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক বাস্তবতায় তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্ন চলতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ইস্যু—সবকিছুই পারস্পরিক নির্ভরতার নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। এমন বাস্তবতায় কোনো একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে সম্পর্ককে স্থবির করে রাখা উভয় দেশের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। তাই রাষ্ট্রসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি, সংলাপের পথ এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হয়েছে, তা আগামী দিনের কূটনৈতিক দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতি বারবার প্রমাণ করেছে, পরিবর্তনই তার একমাত্র ধ্রুবক। ক্ষমতার পালাবদল, নীতি পরিবর্তন, কৌশলগত পুনর্বিন্যাস—সবই সময়ের অংশ। কিন্তু প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এমন একটি বিষয়, যা ধারাবাহিকতা দাবি করে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করা—এটাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মির্জা ফখরুলের বক্তব্য সেই পরীক্ষার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে ব্যক্তিগত বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ