গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নির্বাচনটি ২০২৪ সালের জেন–জি নেতৃত্বাধীন গণ–অভ্যুত্থানের ফলেই হয়েছিল। কিন্তু সেই আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া তরুণদের দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ৩৫০ আসনের সংসদে ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে জয় পেতে সক্ষম হয়েছে।
শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ভোটাররা বিপুলভাবে সমর্থন দিয়েছেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে। দলটি আরামসে পরাজিত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটকে, যার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল এনসিপি।
বিএনপির নেতা তারেক রহমান—যিনি এর আগে দলটি তিনবার ক্ষমতায় থাকাকালে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছেন—এখন দেশের ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়া অনেক তরুণ বাংলাদেশি এই নির্বাচনকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করলেও বলেছেন, এটি তাদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি।
শিক্ষার্থী আফসানা হোসেন হিমি আল জাজিরাকে বলেন, “জেনারেশন জেড হিসেবে আমরা এত রক্ত ঝরিয়ে, এত প্রাণ হারিয়ে যে প্রতিনিধিত্ব ও ফলাফল আশা করেছিলাম, তা পাইনি। তবুও আমরা খুব আশাবাদী। তরুণ প্রজন্মের কিছু প্রতিনিধি তো আছে, আমরা আশা করি তারা ভালো কিছু করবে”—এ কথা বলে তিনি এনসিপির ছয়জন বিজয়ীর দিকে ইঙ্গিত করেন।
অনেক তরুণের মতে, এনসিপি নির্বাচনের আগে পর্যাপ্ত জনসমর্থন গড়ে তুলতে পারেনি।
২৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান বলেন, “২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর মানুষের যে আশা-স্বপ্ন ছিল, এনসিপি তা পূরণ করতে পারেনি। জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোট আমাদের অনেকের কাছেই বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হয়েছে। তাই অনেক তরুণ ভোটার তাদের সমর্থন করিনি।”
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, দলটি বিরোধী দলে থেকে নিজেদের পুনর্গঠন করবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোযোগ দেবে।
১৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দক্ষিণ এশীয় এই দেশটির জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ। ভোটারদের প্রায় ৪৪ শতাংশ—সংখ্যায় প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ—১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর টানা অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনের ফলাফলকে অনেকেই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ১,৪০০–এর বেশি মানুষ নিহত হন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে ওই দমন–পীড়নের ঘটনায় অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে ভারতের নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে এসেছেন শেখ হাসিনা ও তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া। তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালে হত্যাকাণ্ডের আগ পর্যন্ত দেশ শাসন করেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সম্ভবত মঙ্গলবার শপথ নিতে যাওয়া তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর সরকার আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দেবে।
শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। যে কোনো মূল্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের অন্যায় বা অবৈধ কার্যকলাপ সহ্য করা হবে না। দল, ধর্ম, জাতি বা ভিন্নমত—যে-ই হোক, শক্তিশালীর দ্বারা দুর্বলদের ওপর হামলা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায়বিচারই হবে আমাদের পথনির্দেশক।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, জামায়াত-এনসিপি জোট অনেক তরুণ ভোটারকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, যারা শেখ হাসিনার পতনের পর নতুন রাজনৈতিক শ্রেণির প্রত্যাশা করছিল।
তিনি বলেন, “অনেকেই এটিকে পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া হিসেবে দেখেছেন, পরিবর্তনের পথ হিসেবে নয়। এতে তরুণদের ভোট বিভক্ত হয়েছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আরও সংগঠিত ও শাসনক্ষম দল হিসেবে সামনে এসেছে।”
তবে শিক্ষার্থী ফারহান উল্লাহর কাছে এই ভোট ছিল বহু প্রতীক্ষিত পরিবর্তনের সূচনা।
তিনি বলেন, “সব মিলিয়ে এই নির্বাচন আমাদের জন্য এক ধরনের স্বপ্নপূরণ, বাংলাদেশের জন্য নতুন শুরু। আমি জানি বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। আমি আশা করি তারা আমাদের কথা শুনবে।”
এই নির্বাচনের ফল তাই শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা, হতাশা ও সতর্ক আশাবাদের এক জটিল প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার সেই আশার প্রতিফলন ঘটাতে পারে কি না।
আপনার মতামত জানানঃ