গুলশানের এক বিকেলে রাজনৈতিক আবহে জমে ওঠা প্রশ্নের ভিড়ে একটি বিষয়ই ঘুরেফিরে সামনে এসেছে—আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা কি আদৌ সম্ভব, আর হলে কোন প্রেক্ষাপটে? দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–এর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই প্রশ্নকে সরাসরি কোনো হ্যাঁ–না উত্তরে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন—আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
দেশের রাজনীতিতে গত দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহ ছিল নাটকীয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধ মিলিয়ে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে কৌতূহল তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি স্পষ্ট রূপরেখা ফুটে উঠেছে। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। দীর্ঘদিন পর এককভাবে সরকার গঠনের সুযোগ তাদের সামনে। এই বিজয়কে ঘিরে দলের ভেতরে যেমন আনন্দ, তেমনি রয়েছে গভীর আবেগও। কারণ দলটির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এই বিজয় প্রত্যক্ষ করতে পারেননি—এমন অনুভূতি দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের কথাবার্তায় স্পষ্ট হয়েছে। বিজয়ের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি তাই এক ধরনের বিষাদও রাজনীতির আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে।
রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি আসলে কেবল একটি দলের ভবিষ্যৎ নয়; এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি বড় প্রশ্ন। কোনো দল নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কেমন হবে, বিরোধী রাজনীতির পরিসর কতটা বিস্তৃত থাকবে, আর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস কীভাবে ঘটবে—এসবই এখন আলোচনার বিষয়। আওয়ামী লীগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে—এমন বার্তা ইঙ্গিত করে যে, বর্তমান সরকার অন্তত তাৎক্ষণিক কোনো অবস্থান স্পষ্ট করছে না।
নির্বাচনকে ‘স্বচ্ছ’ ও ‘চমৎকার’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বহু প্রাণের বিনিময়ে এই নির্বাচন সম্ভব হয়েছে—এমন কথাও উচ্চারিত হয়েছে। এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ক্ষমতার পরিবর্তন যখন গণ-আন্দোলনের পর ঘটে, তখন তার রাজনৈতিক অভিঘাত দীর্ঘমেয়াদি হয়। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা সেই অভিঘাতেরই একটি অংশ।
বিএনপির সামনে এখন যে চ্যালেঞ্জগুলো, সেগুলোও কম নয়। অর্থনীতিকে সচল করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন—এই চারটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দাঁড় করানো সহজ হবে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থিতি আনা, কর্মসংস্থান বাড়ানো—এসবের জন্য ধারাবাহিক নীতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যে চাপ তৈরি হয়, তা সামাল দিতে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রশাসন দরকার। একই সঙ্গে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও গতি আনতে হবে। দুর্নীতি দমনও কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।
এই সমীকরণের ভেতরেই আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে। একটি বড় দল দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে হঠাৎ নিষিদ্ধ হয়ে গেলে তার সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় না। মাঠপর্যায়ের কর্মী–সমর্থক, স্থানীয় নেতৃত্ব, সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছু কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় থাকে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালে সেই কাঠামো আবার দৃশ্যমান হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের নীতি, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং জনমতের গতিপথের ওপর।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা, পুনর্বাসন এবং পুনর্গঠন দেখা গেছে। ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক দলগুলো চিরস্থায়ীভাবে হারিয়ে যায় না; বরং রূপ বদলায়, জোট বদলায়, নেতৃত্ব বদলায়। তাই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎও সময়ের স্রোতে নির্ধারিত হবে—এমন ধারণাই এখন প্রধান আলোচ্য।
এই নির্বাচনের ফলাফল আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। পরিবর্তনের এই ম্যান্ডেট কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের কর্মদক্ষতার ওপর। যদি প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়িত হয়, তাহলে রাজনৈতিক স্থিতি আসতে পারে। আর যদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থতা দেখা দেয়, তাহলে বিরোধী শক্তির পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিএনপির জন্য বিজয় যেমন গৌরবের, তেমনি দায়িত্বেরও। দীর্ঘ বিরোধী জীবনের পর ক্ষমতায় এলে প্রত্যাশার মাত্রা বেড়ে যায়। জনতার প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে হতাশা দ্রুত তৈরি হয়। তাই নতুন সরকারকে প্রথম দিন থেকেই কর্মসূচিভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে।
রাজনীতিতে আবেগ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নীতিই শেষ কথা। বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে যে আবেগ প্রকাশিত হয়েছে, তা দলীয় ঐক্যকে দৃঢ় করতে পারে। একই সঙ্গে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও বিজয় রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তব ফলাফল—চাকরি, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা, সুশাসন।
আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় সংসদে বিরোধী রাজনীতির রূপ কেমন হবে, সেটিও একটি প্রশ্ন। গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে নীতি–বিতর্ক সমৃদ্ধ হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে, তা দেখার বিষয়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে—জোট, পুনর্গঠন কিংবা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ক্ষমতার পালাবদল ও বিজয়ের আবেগ, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা এখনো অনির্ধারিত এক সম্ভাবনা, যা নির্ভর করছে সময়, আইন ও জনমতের ওপর। আর বিএনপির সামনে রয়েছে শাসনের কঠিন পরীক্ষা।
এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যায়—দেশের রাজনীতিতে স্থবিরতা নেই; পরিবর্তন চলছে। যে পরিবর্তনের ভেতরে বিজয় আছে, শোক আছে, প্রত্যাশা আছে, আবার অনিশ্চয়তাও আছে। আগামী দিনগুলোই নির্ধারণ করবে—এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে এবং রাজনৈতিক মানচিত্রে কারা কীভাবে জায়গা করে নেবে।
আপনার মতামত জানানঃ