নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের জ্বালানি খাতের ভেতরে জমে আছে বহু বছরের জট, আর বাইরে জমে উঠছে চাহিদার চাপ। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও সরবরাহ ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা আমদানির অনিশ্চয়তা এবং এলপিজি বাজারের টানাপোড়েন মিলিয়ে সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন এক সময়। শীতের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ইতিমধ্যে ঘণ্টায় এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিংয়ের নজির দেখা গেছে। সামনে রোজা, তারপর গরম, বোরো ধানের সেচ মৌসুম, আর শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বাড়বে। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারকে প্রথম দিন থেকেই জ্বালানি–বিদ্যুতের অঙ্ক মেলাতে হবে।
গত গরম মৌসুমে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে উঠেছিল; তখন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বা তার কিছু বেশি–কম লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এবার একই সময়ে চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত যেতে পারে বলে পরিকল্পনায় ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড—বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড—এর হিসাবে, কিছুটা লোডশেডিং ধরে নিয়েই সরবরাহ পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনার কাগুজে হিসাব বাস্তবের সঙ্গে মিলবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো গ্যাসনির্ভর। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সচল রাখতে দৈনিক ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চাওয়া হলেও সরবরাহের প্রতিশ্রুতি মিলছে প্রায় ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলা—পেট্রোবাংলা—ফেব্রুয়ারি–মার্চে ৮০০–৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এপ্রিল–জুনে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহের পরিকল্পনা জানিয়েছে। এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। আবার বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়াতে হলে গৃহস্থালি সংযোগে গ্যাস কমে যাবে, ফলে রান্নার গ্যাসের জন্য সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে। এক খাত বাঁচাতে অন্য খাতে চাপ—এই টানাপোড়েনই এখন নীতিনির্ধারকদের প্রধান দুশ্চিন্তা।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়। জ্বালানি আমদানি, অর্থায়ন ও সরবরাহ চেইনের জটিলতায় বড় বড় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন হুমকির মুখে পড়তে পারে। রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট এবং বাঁশখালীর ১৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের মতো স্থাপনাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পারলে চাহিদা–জোগানের ফাঁক আরও বাড়বে। কয়লার আন্তর্জাতিক বাজার, ডলার সংকট, জাহাজীকরণ বিলম্ব—সবকিছু মিলিয়ে অনিশ্চয়তার স্তর বাড়ছে।
শীতের মাঝামাঝি সময়ে যে মাত্রার লোডশেডিং দেখা গেছে, তা উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। ২৯ জানুয়ারির হিসাবে চাহিদা ১১ হাজার ৫০ মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন ছিল ৯ হাজার ৮৯০ মেগাওয়াট; সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছাড়িয়েছে ১১০৮ মেগাওয়াট। গত বছরের একই দিনে লোডশেডিং ছিল মাত্র ১২০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, চাহিদা বড় লাফ না দিলেও সরবরাহ–ব্যবস্থাপনায় চাপ বেড়েছে। জেলা–উপজেলা শহরে দিনে দু–তিনবার এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ না থাকা এখন অনেকের কাছে নতুন স্বাভাবিকতা হয়ে উঠছে।
এই সংকটের আর্থিক দিকটিও কম গুরুতর নয়। বিদ্যুৎ ভর্তুকি বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতায় সরকারকে ধারাবাহিকভাবে অর্থ জোগাতে হচ্ছে। চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, সক্ষমতা ভাড়া, এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয়—সব মিলিয়ে খরচের চাপ বাড়ছে। গবেষকদের মতে, বর্তমান ভর্তুকি তুলে দিলে বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে; আবার দাম বাড়ালে শিল্প ও সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ বাড়বে। এই দ্বৈত ফাঁদ থেকে বেরোনোর পথ সহজ নয়।
এলপিজি বাজারেও টানাপোড়েন অব্যাহত। আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহে টান পড়েছে, নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির নজির রয়েছে। জানুয়ারিতে ১ লাখ ৬৭ হাজার টন আমদানির পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে এসেছে ১ লাখ ৫ হাজার টন। রোজা সামনে রেখে ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৮৪ হাজার টন আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। গৃহস্থালি গ্যাস কমলে এলপিজির চাহিদা বাড়বে—তাই এই বাজারে স্থিতি না ফিরলে জনজীবনে অস্বস্তি বাড়বে।
শিল্পখাতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব আরও গভীর। গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে, কেউ কেউ উৎপাদন কমিয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ থাকা অনেক ইউনিট চালু হতে পারে—এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, কিন্তু সঙ্গে বাড়বে বিদ্যুৎ–গ্যাসের চাহিদা। পর্যাপ্ত জোগান না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, রপ্তানি–আয়েও প্রভাব পড়বে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা অপরিহার্য।
কৃষিখাতেও সামনে বড় চাপ। বোরো ধানের সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। ডিজেল–চালিত সেচের খরচ বেশি; তাই গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে এই বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। গরম বাড়লে আবাসিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহারও বাড়ে—চাহিদার গ্রাফ দ্রুত উঁচুতে ওঠে।
এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকদের সামনে কয়েকটি তাৎক্ষণিক ও মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার স্পষ্ট। প্রথমত, জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন ও সরবরাহ চেইন স্থিতিশীল করা। দ্বিতীয়ত, গ্যাস বরাদ্দে অগ্রাধিকার–নীতি স্পষ্ট করা—শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা। তৃতীয়ত, ভর্তুকি কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো। চতুর্থত, চুক্তি–ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদার করা, যাতে ব্যয়ের চাপ কমে।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি মিশ্রণ বৈচিত্র্য করা জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো, গ্রিড আধুনিকায়ন, চাহিদা–ব্যবস্থাপনা (ডিমান্ড–সাইড ম্যানেজমেন্ট) শক্তিশালী করা—এসব উদ্যোগ বিদ্যুৎ খাতকে স্থিতিশীল করতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ ছাদ–ভিত্তিক স্থাপনা, শিল্পে শক্তি–দক্ষতা কর্মসূচি, স্মার্ট মিটারিং—এই সব প্রযুক্তিগত সমাধান চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন, যদিও তা ফল দিতে সময় লাগবে।
রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রশ্নও সামনে এসেছে। জ্বালানি–বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার কেবল একটি সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ধারাবাহিক নীতির বিষয়। অতীতের চুক্তি, বর্তমানের আর্থিক দায় এবং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ দরকার। সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নীতিগত প্রস্তাব তৈরি হলে নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—কেন শীতকালেই এত লোডশেডিং? উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি, অর্থায়নের বিলম্ব—সবকিছু মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আবার বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কাগজে যত, বাস্তবে ততটা পাওয়া যায় না—কারিগরি ও জ্বালানি–সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা থাকে। ফলে পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়।
নতুন সরকারকে তাই শুরুতেই বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা তৈরি করতে হবে। লোডশেডিং পুরোপুরি শূন্যে নামানো সম্ভব কি না, তা স্পষ্ট করে বলা দরকার। একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে—আমদানি ত্বরান্বিত করা, বিল পরিশোধে অগ্রাধিকার, রক্ষণাবেক্ষণ সূচি পুনর্বিন্যাস, শিল্প–আবাসিক চাহিদা ব্যবস্থাপনা—এসব নিয়ে স্বচ্ছ যোগাযোগ জরুরি। জনগণকে অন্ধকারে রেখে নীতি টেকসই হয় না।
গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট কেবল প্রযুক্তিগত বা আর্থিক সমস্যা নয়; এটি শাসন–ব্যবস্থার পরীক্ষাও। চুক্তির স্বচ্ছতা, বিল–পরিশোধের শৃঙ্খলা, আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা—এসবের ওপর আস্থা তৈরি করতে পারলে বাজারেও ইতিবাচক বার্তা যাবে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো, এলএনজি সরবরাহে স্থিতি আনা, কয়লা আমদানির লজিস্টিক উন্নত করা—এই কাজগুলো দ্রুত শুরু করতে হবে।
সবশেষে, জ্বালানি–বিদ্যুৎ খাতের এই জটিল অঙ্কের ভেতরে রয়েছে মানুষের প্রতিদিনের জীবন। রান্নাঘরে গ্যাস না থাকলে বা রাতে আলো নিভে গেলে তার প্রভাব সরাসরি অনুভূত হয়। শিল্পে বিদ্যুৎ না থাকলে কর্মসংস্থান ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নতুন সরকারের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হবে—সীমিত সম্পদে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা, আর দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা। সামনে গরম, সেচ, রোজা—সব মিলিয়ে সময় খুব বেশি নেই। দ্রুত, সমন্বিত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপই পারে সম্ভাব্য ঝড়কে সামলাতে।
আপনার মতামত জানানঃ