
আগামীকাল ভোট। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল, নিষেধাজ্ঞা ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসা এক নির্বাচনের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। রাজনীতির মেরুকরণ এখন স্পষ্টতই দুই শিবিরে—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (জামাত)। মাঠের ভাষায় এটিই প্রধান দ্বৈরথ; আর ভোটারদের মনে প্রশ্ন একটাই—কার সম্ভাবনা বেশি?
স্টেট ওয়াচচের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, প্রকাশিত জরিপ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনৈতিক সূচকের আলোচনায় একটি জটিল কিন্তু স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বিএনপি সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও জামাত খুব কাছাকাছি অবস্থানে। একাধিক বেসরকারি জরিপে বিএনপির সম্ভাব্য ভোটশেয়ার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, আর জামাতের সমর্থন ৩৫ থেকে ৪৩ শতাংশের মধ্যে। পার্থক্য এতটাই কম যে অনির্ধারিত ভোটারদের সিদ্ধান্ত, ভোটের দিন উপস্থিতির হার এবং শেষ মুহূর্তের প্রচারণা ফলাফল বদলে দিতে পারে।
এই নির্বাচনকে আলাদা করে তুলেছে প্রেক্ষাপট। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শক্তির অনুপস্থিতিতে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে দুই বিপরীত ধারা—একদিকে বিএনপির পুরনো সংগঠনভিত্তিক রাজনীতি, অন্যদিকে জামাতের আদর্শনির্ভর ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্যাডার কাঠামো। বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে বৃহৎ ভোটব্যাংক ও গ্রামীণ নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে তাদের সংগঠন বিস্তৃত, এবং অতীত নির্বাচনে তারা যে ভোটশক্তি দেখিয়েছে, তার স্মৃতি এখনও টিকে আছে। বিপরীতে জামাতের শক্তি সংগঠনের শৃঙ্খলা, তৃণমূলের নিবেদিত কর্মী এবং শহুরে মধ্যবিত্তের একাংশে প্রভাব।
মাঠের বাস্তবতা বলছে, বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে “পরিবর্তন” এবং “স্থিতিশীলতা” দুই ধরনের প্রত্যাশা কাজ করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর তারা প্রশাসনিক স্বাভাবিকতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক আস্থার পুনর্গঠন চায়। ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করছে, বড় দল হিসেবে বিএনপি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনরায় মেরামত করতে সক্ষম হবে। বিশেষত রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে নীতি-স্থিতিশীলতা জরুরি—এই বার্তা তাদের প্রচারণায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে জামাত প্রচারণায় জোর দিচ্ছে নৈতিকতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং শৃঙ্খলার ওপর। তরুণ ভোটারদের একটি অংশ, বিশেষত প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া প্রজন্ম, “পরিষ্কার রাজনীতি” ও বিকল্প ধারার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামাত-সমর্থিত প্রচারণা তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ও সক্রিয়। তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়লেও তাদের অংশগ্রহণ ভোটকেন্দ্রে কতটা প্রতিফলিত হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ভোটার উপস্থিতির হার এ নির্বাচনের নির্ধারক ফ্যাক্টর হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভোটের হার ৬৫ শতাংশের ওপরে যায়, তাহলে বিএনপির জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, কারণ তাদের বিস্তৃত ভোটব্যাংক উচ্চ উপস্থিতিতে কার্যকর হয়। কিন্তু যদি উপস্থিতি ৫৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে, তাহলে জামাতের সংগঠিত সমর্থকগোষ্ঠী তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ গণউপস্থিতি বনাম সংগঠিত উপস্থিতি—এই দ্বন্দ্বই ফল নির্ধারণে মুখ্য।
ভৌগোলিকভাবে চিত্র ভিন্ন। উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বিএনপির ঐতিহাসিক প্রভাব এখনও শক্তিশালী। পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় জামাতের সংগঠনগত ভিত্তি দৃঢ়। রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র; এখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের মনোভাব ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে। শহুরে ভোটাররা অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন; গ্রামীণ ভোটারদের কাছে স্থানীয় নেতৃত্ব ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—এসব ইস্যু নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের। জামাত বলছে, দুর্নীতি কমিয়ে ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা সম্ভব। ভোটাররা দেখছেন কে কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে রোডম্যাপ উপস্থাপন করতে পারছে।
নারী ভোটারদের ভূমিকা এই নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বাড়তে পারে। বিএনপি নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে ও নারী অধিকার ইস্যু তুলে ধরছে। জামাতের ক্ষেত্রে নারী প্রার্থীতার প্রশ্নে বিতর্ক থাকলেও তাদের সমর্থকরা বলছেন, সামাজিক কল্যাণ ও পারিবারিক নিরাপত্তা তাদের অগ্রাধিকার। নারী ভোটারদের মনোভাব শেষ মুহূর্তে ফল বদলে দিতে পারে।
নিরাপত্তা ও ভোটের পরিবেশও বড় বিবেচ্য বিষয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা স্বচ্ছতা ও সহিংসতামুক্ত ভোটের আহ্বান জানিয়েছেন। ভোটের দিন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা ভীতি সঞ্চার হলে উপস্থিতি কমে যেতে পারে, যা সরাসরি ফলাফলে প্রভাব ফেলবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের আস্থা ফলাফলের অন্যতম চাবিকাঠি।
দলীয় অভ্যন্তরীণ বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির ভেতরে কিছু আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি রয়েছে, যা ভোট বিভক্তির ঝুঁকি তৈরি করছে। জামাত তুলনামূলকভাবে প্রার্থী মনোনয়নে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে। তবে বৃহত্তর জাতীয় ইস্যুতে বিএনপির পরিচিত মুখ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে।
স্টেট ওয়াচচের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সংখ্যাগত বিচারে বিএনপি সামান্য এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান অত্যন্ত সংকীর্ণ। অনির্ধারিত ভোটারদের অনুপাত ৮ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে—যা শেষ মুহূর্তে যে কোনো দিকে যেতে পারে। এছাড়া প্রবাসী প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং স্থানীয় প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এখন প্রশ্ন—কার সম্ভাবনা বেশি? বর্তমান ডেটা ও মাঠপর্যায়ের চিত্র অনুযায়ী বলা যায়, উচ্চ ভোটার উপস্থিতি ও তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত হলে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা কিছুটা বেশি। কিন্তু যদি উপস্থিতি কম হয় এবং সংগঠিত ভোটব্যাংক প্রাধান্য পায়, তাহলে জামাত উল্লেখযোগ্য আসন পেতে পারে, এমনকি ফল উল্টেও দিতে পারে। ব্যবধান যাই হোক, এটি একপাক্ষিক নির্বাচনের আভাস দিচ্ছে না; বরং অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অনিশ্চিত লড়াই।
সব মিলিয়ে আগামীকালের ভোট শুধু সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ নির্ধারণের পরীক্ষা। ভোটকেন্দ্রে কারা উপস্থিত হবে, শেষ মুহূর্তে অনির্ধারিতরা কাকে বেছে নেবে, এবং নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে—এই তিন উপাদানই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে। স্টেট ওয়াচচের মূল্যায়নে, সামান্য ব্যবধানে হলেও বিএনপি এগিয়ে; তবে জামাতের সংগঠিত শক্তি ও তরুণ ভোটের সম্ভাবনা তাদেরকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াইয়ে রাখবে। ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত নিশ্চিত কিছু বলা কঠিন, কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশের রাজনীতি একটি নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
আপনার মতামত জানানঃ