ঝালকাঠি জেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা শংকর মুখার্জীর জীবনে ২৭ ডিসেম্বরের সকালটি ছিল অন্য দিনের মতোই। কিন্তু সেই সকালই তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ওয়ারেন্ট দেখানো ছাড়াই সাদা পোশাকে আসা গোয়েন্দা পুলিশ তাকে নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন তাকে ২০২২ সালের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়—যে মামলায় দায়েরের সময় তার নামই ছিল না। অভিযোগ করা হয়, তিনি বিএনপির একটি অফিসে হামলা ও ভাঙচুরে জড়িত ছিলেন। অথচ পরিবারের দাবি, এলাকার বাজারসংলগ্ন জমি ও খামার দখলের উদ্দেশ্যেই পুরোনো একটি মামলায় নতুন করে তাকে জড়ানো হয়েছে। এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়; বরং সাম্প্রতিক বাংলাদেশে নির্বিচার আটক ও মামলা বাণিজ্যের যে চিত্র ফুটে উঠছে, তারই একটি প্রতীকী প্রতিফলন।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তার ও মামলা যেমন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সেই ধারার অবসান ঘটেনি—বরং অনেকের মতে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch–এর ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী ও সমর্থককে সন্দেহভাজন হত্যা মামলায় আটক রাখা হয়েছে। এসব অভিযুক্তদের তালিকায় আছেন আইনজীবী, অভিনয়শিল্পী এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মীরাও। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং মানবাধিকার সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবায়নে মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে খুবই স্পষ্ট। ৩৩ ধারায় বলা আছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হবে, তাকে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ দিতে হবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া কাউকে আটক রাখা যাবে না। তবু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আইনজীবীরা বলছেন, বর্তমানে কাউকে আটক করার জন্য মামলা বা আদালতের নির্দেশনা ছাড়াও ‘সন্দেহ’ই যথেষ্ট হয়ে উঠেছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদের ভাষায়, “বিচার ছাড়া কাউকে এক মুহূর্তও আটক রাখা যায় না—আইনে এটা স্পষ্ট। কিন্তু এখন সেটাই অহরহ ভাঙা হচ্ছে।”
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, তাহলে সংবিধান কোথায় দাঁড়িয়ে? আইন অনুযায়ী, প্রয়োজনে কাউকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে, কিন্তু ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে রাখতে হলে আদালতে হাজির করতেই হবে। অথচ বহু ক্ষেত্রে পরিবার জানতেই পারছে না, আটক ব্যক্তিকে কোথায় রাখা হয়েছে, কী অভিযোগে তাকে ধরা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের হেবিয়াস কর্পাস ক্ষমতা থাকার কথা থাকলেও, আইনজীবীদের অভিযোগ—আদালত এই ক্ষমতা প্রয়োগে যথেষ্ট সক্রিয় নয়। হাজার হাজার মামলা জমা পড়লেও তালিকাভুক্ত হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকটি। এর ফলে বিচার বিভাগের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালিত হচ্ছে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই সংকটের পেছনে দুটি কারণ বারবার উঠে আসছে—মব সহিংসতা এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তা বা হস্তক্ষেপ। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। একদিকে সরকার ও প্রশাসনের চাপ, অন্যদিকে ‘মব’ দ্বারা ভয়ভীতি—এই দ্বিমুখী চাপে বিচারকদের মধ্যে এক ধরনের নীরব আতঙ্ক কাজ করছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের মতে, বিচারকদের ব্যাপক বরখাস্ত এবং প্রকাশ্য আক্রমণের ঘটনা বিচার বিভাগকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, একটি ঘটনায় প্রকৃত অভিযুক্ত নির্ধারণের বদলে অজ্ঞাতনামা শত শত মানুষকে আসামি করা হচ্ছে। এতে একদিকে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে মামলা বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শাহদীন মালিকের ভাষায়, পুলিশ যদি প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করত, তাহলে এত বেশি নাম ঢুকত না। কিন্তু নাম বাদ দিলে ‘ব্যবসা’ কমে যায়—এই ধারণাই বাস্তবে প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনেই গলদ রয়ে গেছে। তার মতে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তারা জনগণের ওপর ভরসা না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চাইছেন। এর ফলেই মব সন্ত্রাস বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় লোকজন কাউকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছে, আর পুলিশ মবের চাপে মামলা নিতে বা আটক করতে বাধ্য হচ্ছে। এই প্রবণতা থামাতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে শক্ত ও স্পষ্ট বার্তা প্রয়োজন ছিল, তা দেওয়া হয়নি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক আটক ছাড়াও নারী ও ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে মব সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন। একই প্রতিবেদনে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর আওতায় আট হাজার ৬০০ জন গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনেও আরও বহু মানুষ আটক হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার সাম্প্রতিক উদাহরণও এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। গত বছরের জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে একটি সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। এর পরপরই শত শত কথিত আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটক করা হয় এবং আট হাজার ৪০০–এর বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যার অধিকাংশই অজ্ঞাতনামা। সরকার অবশ্য ‘গণগ্রেফতার’-এর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে অক্টোবরে প্রকাশিত অধিকারের তথ্য উদ্ধৃত করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যু নির্যাতনের ফলে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনে যে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই সামনে আসছে। অনেকে মনে করছেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। আইনের শাসন যেখানে নাগরিকের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হওয়ার কথা, সেখানে আইনই হয়ে উঠছে ভয়ের উৎস। শংকর মুখার্জীর মতো অসংখ্য মানুষের গল্প তাই আর শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—এগুলো এখন রাষ্ট্র, সংবিধান ও বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নের প্রতিচ্ছবি।
আপনার মতামত জানানঃ