বিশ্বব্যবস্থা এখন এক অদ্ভুত, অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে পুরোনো নিয়মগুলো ভাঙছে, কিন্তু নতুন কোনো স্থায়ী কাঠামো এখনও স্পষ্ট হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে উদার বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল আরেকটি বৈশ্বিক যুদ্ধ ঠেকানো। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই গড়ে ওঠে জাতিসংঘ, আইএমএফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক—নিয়ম, প্রতিষ্ঠান আর সমঝোতার এক জাল। এই কাঠামো নিখুঁত ছিল না; ভিয়েতনাম থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত যুদ্ধ হয়েছে, সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে, শক্তির রাজনীতিও চলেছে। তবু একটি বিশ্বযুদ্ধ আর হয়নি—এই একটি সত্যই বলে দেয়, ব্যবস্থাটি পুরোপুরি ব্যর্থও ছিল না।
কোল্ড ওয়ার শেষ হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, ইতিহাস বুঝি চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা বিশ্ব বিজয়ের উল্লাসে বলেছিল—লিবারেল গণতন্ত্র আর বাজার অর্থনীতিই মানুষের শেষ ঠিকানা। এই আত্মবিশ্বাসের বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষ্য দিয়েছিলেন ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা। কিন্তু সেই স্বপ্ন খুব বেশি দিন টেকেনি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করল। আফগানিস্তান, ইরাক—দুই যুদ্ধই দীর্ঘ হলো, ব্যয়বহুল হলো, কিন্তু নিরঙ্কুশ বিজয় এলো না। উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ল, অর্থনীতি ও রাজনীতির ভেতরের ফাটল স্পষ্ট হলো।
এই শূন্যতাই সুযোগ করে দিল নতুন শক্তির উত্থানের। রাশিয়া, চীন, ইরানসহ কয়েকটি দেশ নিজেদের মতো করে প্রভাব বলয় গড়তে শুরু করল। এখনকার দৃশ্যে তিনটি পরাশক্তি সবচেয়ে দৃশ্যমান—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন। তিন দেশের নেতৃত্বও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন এবং সি চিন পিং—তিনজনের রাজনীতি, ভাষা ও কৌশল আলাদা হলেও মিল আছে এক জায়গায়: প্রত্যেকে নিজের কল্পিত মানচিত্র অনুযায়ী পৃথিবীকে সাজাতে চান।
পুতিনের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি। ‘বড় রাশিয়া’ ফেরানোর স্বপ্নে তিনি জর্জিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছেন, ক্রিমিয়া দখল করেছেন, শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করেছেন। এটি কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি সীমান্ত, প্রভাব আর ইতিহাসের পুনর্লিখন। চীনের স্বপ্ন আবার ‘ন্যাশনাল রেজুভেনেশন’—চীনা জাতির পুনরুত্থান। দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ, সামরিক ঘাঁটি, তাইওয়ান ঘিরে মহড়া—সবই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, যা অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কৌশলগত নির্ভরতা তৈরি করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বদলেছে। আগে তারা নিজেদের ‘ফ্রি ওয়ার্ল্ড’-এর নেতা হিসেবে দেখত—নিয়ম তৈরি করত, জোট বানাত, আবার সেই নিয়ম থেকেই সুবিধা নিত। ট্রাম্প-যুগে সেই দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে পড়ল। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, প্যারিস ক্লাইমেট অ্যাগ্রিমেন্ট বা ইরান নিউক্লিয়ার ডিল থেকে সরে আসা, মিত্রদের প্রকাশ্যে অপমান—সব মিলিয়ে বহুপাক্ষিকতার জায়গায় একধরনের লেনদেনভিত্তিক শক্তির রাজনীতি সামনে এলো। ডলার, নিষেধাজ্ঞা, সাপ্লাই চেইন—সবই রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ারে পরিণত হলো।
এই অবস্থাকে অনেকে ‘রুলস-বেজড অর্ডার’-এর ভাঙন বলছেন। নিয়ম আগে কখনোই পুরোপুরি মানা হয়নি, কিন্তু অন্তত নিয়মের ভাষা ছিল। এখন সমস্যা হলো—শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যখন খোলাখুলি ‘যার শক্তি তার নিয়ম’ নীতিতে হাঁটছে, তখন ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ভেনেজুয়েলা, সিরিয়া বা অন্যত্র একতরফা হস্তক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে—আন্তর্জাতিক নর্মস প্রয়োজন হলে পাশ কাটানো যায়। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনও নিজেদের স্বার্থে একই ধরনের আচরণ করছে। সাম্রাজ্যবাদ বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি।
এই ভাঙনের মধ্যে বাংলাদেশের মতো দেশের অবস্থান কোথায়—এটাই মূল প্রশ্ন। উদার বিশ্বব্যবস্থা আমাদের জন্য একধরনের নরম সুরক্ষা তৈরি করেছিল। শান্তিরক্ষী মিশনে অংশ নিয়ে সম্মান ও অর্থ এসেছে; ঋণ, অনুদান, বাণিজ্য সুবিধা মিলেছে; জাতিসংঘ-এর মতো ফোরামে ছোট দেশও কথা বলার জায়গা পেয়েছে। কিন্তু যদি বিশ্ব পুরোপুরি ‘জোর যার মুল্লুক তার’ মডেলে চলে যায়, তখন এই সুরক্ষা পাতলা হয়ে যাবে—এটা আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি।
রোহিঙ্গা সংকট তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। মিয়ানমার সেনাবাহিনী যখন লাখ লাখ মানুষকে জোর করে সীমান্ত পার করে দিল, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যত অসহায় ছিল। বড় শক্তির নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ সামনে চলে এলো। ফলাফল—একটি বিশাল মানবিক বোঝা বাংলাদেশের কাঁধে। এখানে ‘রুলস-বেজড অর্ডার’ খুব একটা কাজ করেনি।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট। আমাদের কোনো সুসংহত ইন্ডিয়া পলিসি নেই, নেই চায়না পলিসি, নেই আমেরিকা পলিসি। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক মুডের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির ভাষা বদলে যায়। ভারতপন্থী সরকার এলে এক সুর, চীনা বিনিয়োগ এলে আরেক সুর, ওয়াশিংটনের সংকেত এলে নতুন বয়ান। মনে হয়, সবাইকে একসঙ্গে ব্যবহার করব—আর কেউ অসন্তুষ্ট হলে তখন একটু আবেগী জাতীয়তাবাদী ভাষণ দিয়ে পরিস্থিতি সামলাব।
এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি। বড় বড় কথা, হুংকার, ভাইরাল ক্লিপ—সবই জনপ্রিয়তা আনে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দেয় না। ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের জন্য সাধারণ নিয়ম একটাই—বড় শক্তির সরাসরি দ্বন্দ্বে ফ্রন্টলাইনে দাঁড়ানো আত্মঘাতী। সেখানে প্রয়োজন পূর্বানুমানযোগ্যতা, ধৈর্য আর সীমাবদ্ধতা বোঝার বুদ্ধি। বৈশ্বিক বিতর্কে সবসময় সবচেয়ে জোরে কথা বলাই কৌশল নয়; কখন কোথায় চুপ থাকতে হবে, সেটাও কৌশল।
ইউক্রেন আজ এই শিক্ষাটাই দিচ্ছে। জাতীয় গর্ব আর নিরাপত্তা ক্যালকুলেশনের ভারসাম্য ঠিকভাবে না মিললে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তা এখন সবার চোখের সামনে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আলাদা, কিন্তু শিক্ষা একই—আবেগ দিয়ে ভূরাজনীতি সামলানো যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই এটিই: আমরা কি বুঝতে পারব যে পররাষ্ট্রনীতি কোনো দলের নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়? আমরা কি অন্তত কয়েকটি মৌলিক স্বার্থ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়তে পারব—কোথায় আমাদের রেড লাইন, কোথায় আপস সম্ভব, আর কোথায় নয়? এই আলোচনা আমাদের পাবলিক পরিসরে প্রায় অনুপস্থিত, আর নীতিনির্ধারণী মহলেও সীমিত।
বিশ্বব্যবস্থা এখন তার সবচেয়ে ভঙ্গুর সময় পার করছে। এই ভাঙন আমাদের জন্য সুযোগও আনতে পারে—বিকল্প বাণিজ্য, কূটনৈতিক ভারসাম্য, নতুন জোট—সবই সম্ভব। কিন্তু ঝুঁকিও বিশাল। ভারত ও চীনের মতো প্রতিবেশী শক্তি নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থরক্ষার নামে আরও আগ্রাসী হবে না—এ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। তাই কথার রাজনীতি, ফেসবুকের রাজনীতি আর টক শোর রাজনীতির বাইরে এসে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই থেকে যায়—নতুন বিশ্বব্যবস্থার এই অস্থির সময়ে বাংলাদেশ কি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তববাদী কৌশল দিয়ে নিজেকে দাঁড় করাতে পারবে, নাকি মুহূর্তের আবেগ আর জনতার তালিতে ভেসে এমন সিদ্ধান্ত নেবে, যার মূল্য আমাদের অনেক বছর ধরে দিতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেবে, নতুন বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের জায়গাটা কোথায় হবে।
আপনার মতামত জানানঃ