আসন্ন নির্বাচনী প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যেন নীরবে কিন্তু গভীরভাবে ঢুকে পড়েছে রাজনৈতিক মাঠে। পোস্টার, মিছিল কিংবা সরাসরি বক্তৃতার পাশাপাশি এখন ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আর সেই মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ছে এআই দিয়ে বানানো ভিডিও। এগুলোর কিছু নিছক প্রচারণামূলক হলেও বড় একটি অংশে দেখা যাচ্ছে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ, চরিত্রহনন, এমনকি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা। প্রযুক্তির এই নতুন হাতিয়ার নির্বাচনী রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলছে এবং এর লাগাম টানতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কী করছে—এই প্রশ্ন এখন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলে আসছিলেন, এআই ব্যবহারের ব্যাপকতা বাড়লে নির্বাচন হবে তার প্রথম বড় পরীক্ষাক্ষেত্র। কারণ ভোটের সময় আবেগ, ভয়, আশ্বাস আর পরিচয়ের রাজনীতি সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। সেই আবেগকে আরও তীব্র করতে কিংবা বিভ্রান্ত করতে এআই-নির্মিত ভিডিও অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। বাস্তব মানুষের কণ্ঠ নকল করে, পরিচিত রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যক্তিত্বের মুখ বসিয়ে, অথবা পুরোপুরি কল্পিত দৃশ্য তৈরি করে এমন সব বার্তা ছড়ানো হচ্ছে যা সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে যাচাই করা কঠিন। কম ডেটা ব্যবহার করে শুধু টেক্সট পড়ার অপশন থাকলেও, বাস্তবে ভিডিওই বেশি প্রভাব ফেলছে, কারণ দৃশ্য ও শব্দ একসঙ্গে মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতার অনুভূতিকে জোরালো করে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক মাধ্যমে যে বিপুল সংখ্যক এআই ভিডিও ছড়িয়েছে, তার একটি বড় অংশ সরাসরি আক্রমণাত্মক। কোথাও প্রতিপক্ষকে দুর্নীতিগ্রস্ত, কোথাও রাষ্ট্রবিরোধী, আবার কোথাও ধর্ম বা মুক্তিযুদ্ধের মতো সংবেদনশীল ইস্যু টেনে এনে ঘৃণা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। গবেষণা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শত শত এমন ভিডিও তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যেগুলো মিলিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে। অ্যালগরিদম-নির্ভর সামাজিক মাধ্যম এসব কন্টেন্টকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে, কারণ এগুলোতে প্রতিক্রিয়া বেশি, মন্তব্য বেশি, শেয়ার বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনী আচরণবিধি কী বলছে এবং সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে। আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, মিথ্যা বা মানহানিকর কন্টেন্ট তৈরি ও প্রচার করা নিষিদ্ধ—সে কন্টেন্ট এআই দিয়ে তৈরি হোক বা না হোক। অর্থাৎ এআই ব্যবহারে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু এর মাধ্যমে আক্রমণ বা বিভ্রান্তি ছড়ানো হলে তা আচরণবিধির লঙ্ঘন। সমস্যা হলো, বাস্তবে কোন ভিডিও নিছক প্রচারণা আর কোনটি ক্ষতিকর অপপ্রচার—এই সীমারেখা টানা সহজ নয়, বিশেষ করে যখন কন্টেন্টের পরিমাণ এত বেশি।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এই বিষয় নিয়ে উদ্বেগ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা যাচ্ছে। বড় দলগুলো একে অন্যের দিকে আঙুল তুলছে, বলছে প্রতিপক্ষ পরিকল্পিতভাবে এআই ভিডিও ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। একই সঙ্গে কেউই নিজেদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করছে না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় সমর্থক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট কিংবা অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে কাজ করা পেজ ও চ্যানেলগুলো এই কন্টেন্ট তৈরি ও ছড়াচ্ছে। নির্বাচনী মৌসুমে ভিউ আর এনগেজমেন্ট বাড়ে—এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ ক্লিকবেইট ভিডিও বানাচ্ছে, যার রাজনৈতিক দায় কেউ নিতে চায় না।
এই পরিস্থিতিতে নজর পড়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন-এর দিকে। নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন এবং আগেই আচরণবিধিতে এআই সংক্রান্ত নির্দেশনা যুক্ত করেছে। কমিশনের আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলে একটি মনিটরিং ব্যবস্থাও চালু আছে, যেখানে প্রযুক্তির সহায়তায় সামাজিক মাধ্যম স্ক্যান করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা UNDP-এর সহায়তায় তৈরি একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কন্টেন্ট চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তবে কমিশনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব কন্টেন্ট নজরে রাখা সম্ভব নয়, তাই যেগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে হয়, সেগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি জটিলতা। কোন কন্টেন্ট সত্যিই বিপজ্জনক আর কোনটি রাজনৈতিক সমালোচনা—এই পার্থক্য করতে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা দরকার। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি ঢিলেঢালা নজরদারিতে ক্ষতিকর কন্টেন্ট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও প্রবল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এআই কন্টেন্ট পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়, বরং লেবেলিং ও স্বচ্ছতার দিকে জোর দেওয়া উচিত। অর্থাৎ কোন ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি—তা স্পষ্টভাবে জানানো হলে দর্শক অন্তত সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
ভোটারদের সচেতনতার প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বড় একটি অংশ এখনো ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসিতে পিছিয়ে। অনেকেই ভিডিও দেখেই ধরে নেন সেটি সত্য। পরিচিত মুখ বা কণ্ঠ থাকলে বিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে এআই ভিডিও সহজেই মতামত গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল বা কম তথ্যপ্রবাহের এলাকায় এসব ভিডিও গুজবের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার প্রতিক্রিয়া পরে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
একই সঙ্গে এআইয়ের ইতিবাচক দিকও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কম খরচে, কম সময়ে প্রচারণার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ অনেক প্রার্থী ও ছোট দলের জন্য একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করছে। আগে যেখানে বড় বাজেট ছাড়া প্রচারণা কঠিন ছিল, এখন সেখানে প্রযুক্তি কিছুটা সমতা আনছে। কিন্তু সেই সুযোগ যখন আক্রমণাত্মক বা বিদ্বেষমূলক কন্টেন্ট তৈরিতে ব্যবহার হয়, তখন পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় এআই এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভোটার—সবারই ভূমিকা আছে। কমিশনের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি যতটা সম্ভব শক্ত করতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের সমর্থকদের দায়িত্বশীল আচরণে উৎসাহ দিতে হবে, প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, আর ভোটারদের শেখাতে হবে কীভাবে সত্য আর কৃত্রিম বিভ্রান্তির পার্থক্য করা যায়। নইলে প্রযুক্তির এই নতুন হাতিয়ার নির্বাচনী রাজনীতিকে আরও বেশি অনিশ্চয়তা আর অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হবে
আপনার মতামত জানানঃ