পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে বালুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটাসহ অন্তত ১২টি শহরে একযোগে সংঘটিত সাম্প্রতিক হামলাগুলো। সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলা ও পাল্টা অভিযানে দুই দিনে মোট ১০৮ জন ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছে। তবে নিহতের সংখ্যা, পরিচয় এবং প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি দাবি ও স্বাধীন সূত্রের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় বিষয়টি ঘিরে প্রশ্নও বাড়ছে। বিশেষ করে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা এবং হামলার ব্যাপকতা নিয়ে স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ পায়নি।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোয়েটা ছাড়াও মাসতুং, পাসনি, গোয়াদার, খারান, নুশকি, মাখসহ বালুচিস্তানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে হামলার চেষ্টা চালানো হয়। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত সরকারি ভবন, নিরাপত্তা বাহিনীর স্থাপনা, কারাগার এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়ি। নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা অভিযানের ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, এই সংঘর্ষে সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং বেসামরিক নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন, যা পরিস্থিতির জটিলতাকে আরও গভীর করেছে।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, খারানে মালাজাই ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের চেয়ারম্যান মীর শাহিদ গুলের বাড়িতে হামলার ঘটনায় তিনি নিজে এবং তার পরিবারের সদস্যসহ অন্তত সাতজন নিহত হন। একই সময়ে বাড়ি ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। খুজদার এলাকায় একটি পরিবারের ১১ জন সদস্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। এসব তথ্য সরকারিভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও, এগুলো বালুচিস্তানে চলমান সহিংসতার মানবিক মূল্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
এই হামলাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বালুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার ভেতরে সংঘটিত আক্রমণ। সাধারণত কোয়েটাকে প্রদেশের তুলনামূলকভাবে নিরাপদ শহর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শহরের চারপাশে এবং ভেতরে বহু চেকপোস্ট, নিরাপত্তা চৌকি ও একটি শক্ত নিরাপত্তা বলয় রয়েছে। তবুও ভোরের দিকে বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে শহর কেঁপে ওঠে, রেড জোন সিল করে দেওয়া হয় এবং হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এই ঘটনাই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত, নাকি গোয়েন্দা পর্যায়ে ব্যর্থতার ফল?
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলাগুলো শুধু তাৎক্ষণিক সহিংসতার ঘটনা নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বার্তা বহন করে। নিষিদ্ধ ঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এক বিবৃতিতে হামলার দায় স্বীকার করে এটিকে তাদের ‘অপারেশন হিরো’-এর দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর মাধ্যমে তারা দেখাতে চেয়েছে যে, কেবল প্রত্যন্ত অঞ্চল নয়, চাইলে তারা প্রাদেশিক রাজধানী এবং উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকাতেও আঘাত হানতে সক্ষম।
বালুচিস্তানে সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সামরিক অভিযান, গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিযোগ উঠে আসছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও স্থানীয় জনগণের বড় একটি অংশ মনে করে, তারা সেই সম্পদের ন্যায্য ভাগ থেকে বঞ্চিত। এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ থেকেই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান, যারা নিজেদের লড়াইকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরে।
তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ধরন ও ব্যাপ্তি আগের অনেক ঘটনার চেয়ে ভিন্ন। একাধিক শহরে সমন্বিত আক্রমণ, কারাগারে হামলা চালিয়ে বন্দিদের পালিয়ে যাওয়া, ডেপুটি কমিশনারের বাসভবন থেকে জিম্মি তুলে নেওয়ার খবর এবং নারী আত্মঘাতী হামলাকারীর ব্যবহার—সব মিলিয়ে এটি পরিকল্পিত ও বহুস্তরীয় অভিযানের ইঙ্গিত দেয়। মাসতুং কারাগার থেকে অন্তত ২৭ জন বন্দির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিবিসি বাংলা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসছে, সরকার ও সেনাবাহিনীর বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ফারাক। নিরাপত্তা বাহিনী যেখানে দ্রুততা ও প্রস্তুতির কথা বলছে, সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়–এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক মুহাম্মদ শোয়াইবের মতে, এই হামলাগুলো একটি শক্ত বার্তা বহন করে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তানের শহরগুলো এতটাই বিস্তৃত যে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তবুও কোয়েটার মতো একটি প্রাদেশিক রাজধানীর ভেতরে এমন হামলা বড় ঘটনা, কারণ এটি মানুষের নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দেয়। তার ভাষায়, “তারা দেখাতে চেয়েছে যে চাইলে যে কোনো জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব।”
শোয়াইব আরও মনে করেন, নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে তারা আগের হামলাগুলো থেকে কিছু শিক্ষা নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবি থেকে বোঝা যায়, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বালুচিস্তানের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জটি আসলে রাজনৈতিক। শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন জনগণের “হৃদয় ও মন জয়” করা।
এই বক্তব্য বালুচিস্তান প্রসঙ্গে নতুন নয়, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বরাবরই ঘাটতি দেখা গেছে। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকার ও সেনাবাহিনী নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেয়, অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির দাবি জানায়। এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষ, যারা প্রতিদিন সহিংসতা, তল্লাশি, চেকপোস্ট এবং অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়।
সাম্প্রতিক হামলাগুলো পাকিস্তানের সামগ্রিক নিরাপত্তা নীতির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। আঞ্চলিক রাজনীতি, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে একদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংলাপ ও উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোনো যাবে।
এই হামলাগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্যের স্বচ্ছতা। নিহতের সংখ্যা, পরিচয় এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য আসছে। নিরাপত্তা বাহিনী যাদের ‘জঙ্গি’ হিসেবে উল্লেখ করছে, তাদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা নিয়ে স্বাধীন যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত। একই সঙ্গে বেসামরিক হতাহতের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়ায় সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়ছে। গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাই আরও স্বচ্ছ তদন্ত ও তথ্য প্রকাশের দাবি জানাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, কোয়েটাসহ বালুচিস্তানের বিভিন্ন শহরে সংঘটিত এই হামলাগুলো কেবল একটি সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার ধারাবাহিকতা নয়, বরং পাকিস্তানের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে নিরাপত্তা, রাজনীতি ও উন্নয়নের প্রশ্নগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগ দিয়ে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অবিশ্বাস দূর না হলে সহিংসতার চক্র ভাঙা কঠিন হবে। কোয়েটার ভেতরে এই হামলা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনে দিয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ