ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যেন আবারও পরিচিত এক উত্তেজনাপূর্ণ চেহারা নিচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগেই ডিম হামলা, হাতাহাতি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, কার্যালয় ভাঙচুর, ব্যানার পোড়ানো—এমন একের পর এক ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ভোটের মাঠে কথার লড়াই কি ধীরে ধীরে সংঘাতে রূপ নিচ্ছে? নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন নয়, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—সহিংস ঘটনার বিস্তার, শীর্ষ নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তে থাকা শঙ্কা।
নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা করেছিলেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা। সেই আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয় যখন আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর কয়েক দিন আগেই দুর্বৃত্তের গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি নিহত হন। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবেই নয়, বরং আসন্ন নির্বাচনের নিরাপত্তা ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। এরপর একের পর এক জেলার খবর সেই শঙ্কাকে বাস্তব রূপ দিতে শুরু করে। সাংবাদিক, পুলিশ ও গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১০টি জেলায় নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় ঢাকা-৮ আসনের জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম হামলার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি অভিযোগ করেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকরাই এই হামলার সঙ্গে জড়িত। যদিও বিএনপি পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করা হয়, জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী উসকানিমূলক ও অশালীন বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছেন। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুধু ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শেরপুরে ‘নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে’ চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও সংঘর্ষের খবর আসে। বিষয়টি যতটা তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে, বাস্তবে তা দেখিয়ে দেয় কতটা সহজে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, যেখানে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসনকে হস্তক্ষেপ করতে হয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।
চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী আমবাগান এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় স্লোগান দেওয়া নিয়ে শুরু হওয়া উত্তেজনা পরদিন ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ তোলে। সিরাজগঞ্জ সদর আসনে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন, ভোলার বোরহানউদ্দিনে আহত হন প্রায় ২৫ জন, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা ও চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়ও একই ধরনের সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। নাটোর, নড়াইল ও ময়মনসিংহেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনাগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—সংঘর্ষের বেশিরভাগই ঘটছে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোটের সমর্থকদের মধ্যে। এতে করে নির্বাচনের মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি মাঠের সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। ভোটের প্রচারণায় কথার লড়াই স্বাভাবিক হলেও যখন সেই লড়াইয়ের ভাষা হুমকি, বিশোদগার কিংবা অতীতের ক্ষত উসকে দেওয়ার দিকে যায়, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের শঙ্কাও তত বাড়ছে—এই সংঘাত ভোটের ওপর কী প্রভাব ফেলবে? ভোটারদের উপস্থিতি কমবে কি না, তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন কি না, কিংবা পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসছে। ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে, যা ভোটার উপস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। অতীতে ‘দোষারোপের রাজনীতিতে না ফেরার’ প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রচারণার শুরু থেকেই একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ চালাচ্ছেন বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা। কেউ কেউ অতীতের ঘটনা টেনে এনে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন, যা সমর্থকদের মধ্যেও আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—তারা কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সহিংসতার ঘটনাগুলো মোকাবিলা করতে পারছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম মনে করেন, ছোট ছোট ঘটনাগুলোকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। তার মতে, নিরাপত্তা ও নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একা নির্বাচন সুষ্ঠু করতে পারে না; রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে তিনি শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে সংযমের ওপর জোর দেন, কারণ অনেক ক্ষেত্রে সেই বক্তব্যে উসকানির আবহ তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান তুলনামূলকভাবে বলেন, এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, তবে শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, যদি আক্রমণাত্মক প্রচারণা ও ছোটখাটো সহিংস ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, নতুন ধারার রাজনীতির কথা শোনা গেলেও বাস্তবে প্রচারণার ধরন অনেকটাই অতীতের মতোই রয়ে গেছে—২০০১, ২০০৮ বা ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের স্মৃতি যেন আবার ফিরে আসছে।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক মাঠে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সহনশীলতার ঘাটতিরও প্রতিফলন। এখনো সময় আছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার—যদি রাজনৈতিক দলগুলো সংযত ভাষা ব্যবহার করে, সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং নির্বাচন কমিশন দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়। নইলে কথার লড়াই যে সংঘাতে গড়াতে পারে, তার আলামত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর সেই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হতে পারেন সাধারণ ভোটাররাই।
আপনার মতামত জানানঃ