পারমাণবিক অস্ত্রকে বহু রাষ্ট্রই নিরাপত্তা ও শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু এই শক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ, নীরব ও বৈশ্বিক মানবিক বিপর্যয়—যার শিকার হয়েছে কোটি কোটি মানুষ। নতুন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ সত্য: ১৯৪৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে পরিচালিত দুই হাজার চারশর বেশি পারমাণবিক পরীক্ষার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে অন্তত ৪০ লাখ মানুষ অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। ক্যানসার, হৃদ্রোগ, জেনেটিক ক্ষতি ও নানা দীর্ঘস্থায়ী অসুখে আক্রান্ত হয়ে এই মৃত্যু ঘটেছে, যার দায় কোনো দেশই আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
নরওয়েজিয়ান পিপলস এইড প্রকাশিত ৩০৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক পরীক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন ইতিহাস নয়; এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলিনার নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাগডালেনা স্টাওকোস্কির বক্তব্য এ বাস্তবতাকে আরও গভীর করে তোলে। তাঁর মতে, আজ পৃথিবীতে জীবিত প্রতিটি মানুষের শরীরেই বায়ুমণ্ডলীয় পারমাণবিক পরীক্ষার তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের চিহ্ন রয়েছে। অর্থাৎ পারমাণবিক পরীক্ষা শুধু পরীক্ষাস্থলের মানুষের জন্য নয়, গোটা মানবজাতির জন্যই একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে।
বায়ুমণ্ডলে বিস্ফোরিত পারমাণবিক বোমা থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় কণা বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। খাদ্য, পানি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এই কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক বিকিরণের সঙ্গে ক্যানসার, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক রয়েছে। শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যতের জন্যও এটি এক অন্ধকার সতর্কবার্তা। গবেষকদের আশঙ্কা, বায়ুমণ্ডলীয় পরীক্ষার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ভবিষ্যতে অন্তত আরও ২০ লাখ মানুষ ক্যানসারে এবং প্রায় একই সংখ্যক মানুষ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অকালে মারা যেতে পারেন।
এই স্বাস্থ্যঝুঁকি সবার জন্য সমান নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পারমাণবিক বিকিরণের কারণে পুরুষদের তুলনায় নারীদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৫২ শতাংশ বেশি। শিশু ও গর্ভস্থ ভ্রূণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তাদের কোষ বিভাজন দ্রুত হয় এবং বিকিরণের ক্ষতি তাদের শরীরে গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে এই ক্ষতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বংশগতভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফল ভোগ করে এমন মানুষও, যারা কখনো কোনো পারমাণবিক পরীক্ষার সময় বা স্থানের কাছাকাছিও ছিল না।
প্রতিবেদনটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর ভূমিকা নিয়েও কঠোর প্রশ্ন তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ব্রিটেন, পাকিস্তান, ভারত, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে পরীক্ষাস্থল ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার সুনির্দিষ্ট তথ্য আজও প্রকাশ করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের পারমাণবিক পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পুঁতে রাখা হলেও সেই স্থানগুলোর পূর্ণ বিবরণ গোপন রাখা হয়েছে।
ফলে স্থানীয় জনগণ জানেই না তারা ঠিক কত বড় ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।
কিরিবাতিতে ব্রিটিশ ও মার্কিন পারমাণবিক পরীক্ষার স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কিত বহু তথ্য আজও অপ্রকাশিত। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্যানসার ও নানা অজানা রোগের প্রকোপ বাড়লেও রাষ্ট্রীয়ভাবে সেসবের পূর্ণ স্বীকৃতি মেলেনি। একই ধরনের চিত্র দেখা যায় ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ায়। তাহিতির সংসদ সদস্য হিনামোয়ুরা ক্রস জানান, সেখানে ১৯৩টি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল, যার মধ্যে একটি ছিল হিরোশিমায় ফেলা বোমার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ শক্তিশালী। তাঁর ভাষায়, ওই অঞ্চলের মানুষকে দশকের পর দশক ধরে কার্যত গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—তাদের স্বাস্থ্য, জীবন ও ভবিষ্যৎকে তুচ্ছ করে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনটির গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত নভেম্বরে পুনরায় পারমাণবিক পরীক্ষা শুরু করার ইঙ্গিত দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক ইভানা হিউজ সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক পরীক্ষার পরিণতি তাৎক্ষণিক নয়; এটি বহু দশক, এমনকি শতাব্দীজুড়ে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। তাঁর মতে, নতুন করে পরীক্ষা শুরু করা মানে পুরোনো ক্ষতের ওপর আবারও বিষ ঢেলে দেওয়া।
প্রতিবেদনটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—দায় ও ন্যায্যতা। এত প্রাণহানি, এত দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির পরও কোনো পারমাণবিক শক্তিধর দেশ আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ বা ঝুঁকি–সংক্রান্ত শিক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়নি। ফলে বহু মানুষ আজও অন্ধকারে রয়েছে—তারা জানে না তাদের শরীরের অসুখের উৎস কোথায়, বা ভবিষ্যতে তাদের সন্তানদের কী অপেক্ষা করছে।
নরওয়েজিয়ান পিপলস এইডের প্রধান রেমন্ড জোহানসেন মনে করেন, এই প্রতিবেদন শুধু তথ্য প্রকাশের জন্য নয়, বরং একটি নৈতিক আহ্বান। তাঁর আশা, পারমাণবিক অস্ত্র ও পরীক্ষার ভয়াবহ মানবিক মূল্য সম্পর্কে বিশ্ববাসী আরও সচেতন হবে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার ও পরীক্ষা চিরতরে বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হবে। কারণ এই বিপর্যয় কোনো একটি দেশের নয়; এটি সীমান্ত মানে না, প্রজন্ম মানে না, সময় মানে না।
পারমাণবিক পরীক্ষা মানবসভ্যতার এক নির্মম বৈপরীত্যকে সামনে আনে। একদিকে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও শক্তির কথা বলে, অন্যদিকে সেই শক্তি অর্জনের পথে তারা ধ্বংস করে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ। ৪০ লাখ মৃত্যুর এই হিসাব কোনো চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; এটি কেবল দৃশ্যমান ক্ষতির একটি অংশ। অগণিত মানুষের অসুখ, যন্ত্রণা ও প্রজন্মগত ক্ষতি এই সংখ্যার আড়ালে চাপা পড়ে আছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন থেকে যায়—আর কত প্রাণের বিনিময়ে মানুষ বুঝবে যে পারমাণবিক শক্তি আসলে নিরাপত্তা নয়, বরং ধীরগতির বৈশ্বিক বিপর্যয়? ইতিহাসের এই রক্তাক্ত অধ্যায় থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যৎ হয়তো আরও নির্মম হবে। আর সেই ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন মানুষও, যারা আজ এই সিদ্ধান্তগুলোর কোনো অংশই নয়।
আপনার মতামত জানানঃ