
সুদানের চলমান যুদ্ধ কেবল রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ নারীদের শরীর ও জীবনের ওপর নেমে আসা এক ভয়াবহ সহিংস বাস্তবতা। সংঘাতের এই অন্ধকার অধ্যায়ে নারীরা পরিণত হচ্ছেন সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে নির্মমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিকারে। ধর্ষণ, যৌনদাসত্ব, অপহরণ, পাচার ও জোরপূর্বক বিয়ের মতো অপরাধগুলো এখানে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং যুদ্ধেরই এক পরিকল্পিত কৌশল—যার লক্ষ্য একটি সমাজকে ভেঙে দেওয়া, তার ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করা।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়, তা দ্রুতই একটি পূর্ণমাত্রার মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়। লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, আর এক কোটিরও বেশি মানুষ ঘরছাড়া। এই বিশাল সংখ্যার আড়ালে চাপা পড়ে যায় অসংখ্য ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি—যেখানে নারীদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে ভয়াবহ হলেও সবচেয়ে কম উচ্চারিত। বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত শহরগুলোতে, কিংবা সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর পথে—সবখানেই নারীরা বহন করছেন যুদ্ধের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মূল্য।
সুদানের সমাজকল্যাণমন্ত্রী সুলাইমা ইশহাক আল-খলিফা, যিনি নিজে একজন মনোবিদ ও দীর্ঘদিনের নারী অধিকারকর্মী, এই সহিংসতাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এখানে বয়স, সামাজিক অবস্থান কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের কোনো বাছবিচার নেই। বৃদ্ধা নারী থেকে শুরু করে শিশু—সবাই একইভাবে ঝুঁকির মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনাগুলো ঘটছে পরিবারের সদস্যদের সামনে, যেন কেবল একজন নারীকে নয়, পুরো পরিবার ও সম্প্রদায়কেই অপমানিত করা যায়। এই প্রকাশ্যতা নিজেই একটি বার্তা—অপরাধীরা জানে, তাদের থামানোর কেউ নেই।
যৌন সহিংসতা এখানে আকস্মিক উন্মত্ততার ফল নয়, বরং একটি পরিকল্পিত অস্ত্র। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, নথিভুক্ত যৌন সহিংসতার বেশির ভাগ ঘটনাই ধর্ষণ, এবং এর বড় অংশের জন্য দায়ী আরএসএফ। অভিযোগ রয়েছে, এই বাহিনী জাতিগত নিধনের কৌশলের অংশ হিসেবে নারীদের শরীরকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ধর্ষণ শুধু শারীরিক ক্ষতই সৃষ্টি করে না, এটি সামাজিক বন্ধন ছিন্ন করে, ভয় ও কলঙ্ক ছড়িয়ে মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করে। যখন একটি এলাকায় নারীরা নিরাপদ থাকে না, তখন পুরো সম্প্রদায়ই টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়ে যায়।
এই সহিংসতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার ও পাচার। অনেক নারীকে অপহরণ করে আটকে রাখা হচ্ছে, আবার অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে পাচারকারী চক্রের হাতে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। সুদানের অরক্ষিত সীমান্ত ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেঙে পড়া এই অপরাধকে আরও সহজ করে তুলেছে। বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধাদের উপস্থিতির কথাও উঠে এসেছে—পশ্চিম আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এসব যোদ্ধা নাকি সংঘাতে অংশ নিয়ে নারীদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। এতে সহিংসতার মাত্রা শুধু বাড়ছেই না, এর দায় নির্ধারণ ও বিচার আরও জটিল হয়ে উঠছে।
যুদ্ধের এই বাস্তবতায় লজ্জা ও সামাজিক কলঙ্ক নারীদের জন্য দ্বিতীয় শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পরিবার ধর্ষণের ঘটনা গোপন রাখতে চায়, কারণ সমাজে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা এখনো প্রবল। ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ ঘটলে সেই চাপ আরও ভয়াবহ হয়। বহু ক্ষেত্রে পরিবারগুলো নির্যাতিত নারী বা কিশোরীকে জোর করে বিয়ে দিয়ে ‘সমস্যা সমাধান’ করতে চায়। এতে ভুক্তভোগীর মানসিক ক্ষত আরও গভীর হয়, আর সে আজীবনের জন্য একটি সহিংস অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাঁধা পড়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত দারফুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করেছে। গণধর্ষণ, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও জাতিগত সহিংসতার প্রমাণ সামনে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীরা নিজেদের অপরাধের ভিডিও ধারণ করে রাখছে—যা একদিকে তাদের নির্লজ্জতার প্রমাণ, অন্যদিকে এই বিশ্বাসেরও প্রতিফলন যে তারা শাস্তির ঊর্ধ্বে। দায়মুক্তির এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে বিচার প্রক্রিয়া কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সুদানের ইতিহাসে দারফুরের নাম নতুন করে ট্র্যাজেডির প্রতীক হয়ে ওঠেনি; ২০০০-এর দশকের শুরুতেও সেখানে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চলেছিল। তখনকার জানজাওয়িদ মিলিশিয়া আজকের আরএসএফের পূর্বসূরি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে কিছু বিচার হলেও তা ছিল সীমিত। বর্তমান সহিংসতার মাত্রা ও ব্যাপ্তি দেখে অনেকেই বলছেন, এবার পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর, কারণ প্রযুক্তি ও যোগাযোগের যুগে অপরাধের প্রমাণ যেমন বেশি পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি অপরাধীরাও আগের চেয়ে আরও সংগঠিত ও নির্দয়।
এই সবকিছুর মাঝেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই নারীরা কোথায় যাবেন? বাস্তুচ্যুত শিবিরে নিরাপত্তা নেই, শহরে ফেরার পথ বন্ধ, আর সীমান্ত পেরোলে অনিশ্চয়তা। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে মনোসামাজিক সহায়তা বিলাসিতা হিসেবে বিবেচিত হয়, অথচ ধর্ষণ ও সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য এটি বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। সুলাইমা ইশহাকের মতো মানুষরা রাষ্ট্রের ভেতর থেকে এই বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, কিন্তু একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থায় তাঁদের হাতও বাঁধা।
এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। যখন যৌন সহিংসতা যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না; এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনৈতিক হিসাব কিংবা শক্তির ভারসাম্যের আড়ালে এই নারীদের আর্তনাদ চাপা পড়ে গেলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। সহানুভূতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন চাপ, জবাবদিহি ও কার্যকর পদক্ষেপ।
সুদানের নারীরা আজ কেবল বেঁচে থাকার লড়াই লড়ছেন না, তাঁরা লড়ছেন তাদের মর্যাদা, স্মৃতি ও ভবিষ্যতের জন্য। প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা একটি ব্যক্তিগত জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও ক্ষয় করে। এই ক্ষয় যদি অব্যাহত থাকে, তবে যুদ্ধ শেষ হলেও ক্ষত থেকে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাই এই গল্প শুধু সুদানের নয়; এটি আমাদের সময়ের, আমাদের বিবেকের গল্প। আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাই, সেটাই নির্ধারণ করবে—এই নারীরা ইতিহাসে কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকবেন, নাকি ন্যায়বিচারের পথে একটি পরিবর্তনের সূচনা করবেন।
আপনার মতামত জানানঃ