নিউইয়র্কের একটি পোস্ট অফিসের গুদামে পড়ে থাকা বাংলাদেশের হাজারো পোস্টাল ব্যালট পেপারের খবরটি শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটি বা ডাকবিভাগের গাফিলতির গল্প নয়; এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ এবং একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভঙ্গুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য পাঠানো এই ব্যালট পেপারগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালেও নির্ধারিত ভোটারের হাতে না গিয়ে মাসের পর মাস স্টোরেজে পড়ে ছিল—এমন তথ্য সামনে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবে কতটা নিরাপদ ও কার্যকর।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগকে তাদের সাংবিধানিক অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে আসছেন। সরাসরি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়—দূরত্ব, কর্মব্যস্ততা, অভিবাসন-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালটই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই ভরসার জায়গায় যখন হাজারো ব্যালট পেপার গুদামে আটকে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আস্থার সংকট তৈরি হয়।
ঘটনাটি নজরে আসে একজন বাংলাদেশি আমেরিকান পোস্টাল কর্মীর মাধ্যমে। নিয়মিত কাজের এক পর্যায়ে তিনি লক্ষ্য করেন, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো বিপুল সংখ্যক ডাক স্টোরেজে জমে আছে এবং সেগুলোকে ‘বিলির অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের ডাক নির্দিষ্ট সময় পরে গার্বেজ হিসেবে বাতিল করা হয়। কৌতূহল ও দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আনেন এবং ব্যালট পেপারগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। এখান থেকেই শুরু হয় একটি জরুরি প্রশাসনিক তৎপরতা।
বিষয়টি জানানো হয় নিউইয়র্কে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট এবং ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসকে। একই সঙ্গে যুক্ত হয় ইউএস পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট ও বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন। জরুরি ভিত্তিতে একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রশ্ন ওঠে—কেন এই ব্যালটগুলো যথাসময়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছাল না, কোথায় ত্রুটি হয়েছে এবং এর দায়িত্ব কার।
নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ডাক বিতরণ মূলত জিপ কোডের ভিত্তিতে হয়ে থাকে। কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয়েছে কিছু ব্যালটের ঠিকানায় পিও বক্স উল্লেখ থাকার কারণে। এই ধরনের ঠিকানায় পাঠানো চিঠি অনেক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় পড়ে না এবং সেগুলো স্টোরেজে জমা থাকে। সময়মতো বিষয়টি নজরে না এলে সেগুলো বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল।
এই ব্যাখ্যা প্রশাসনিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট পাঠানোর ক্ষেত্রে এমন মৌলিক বিষয় কীভাবে উপেক্ষিত হলো। প্রবাসী ভোটারদের ঠিকানা যাচাই, ডাক ব্যবস্থার নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের অভাব কি এখানে স্পষ্ট নয়? অনেক প্রবাসীর মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রবাসী ভোটব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, ভোটাধিকার শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনের সময় উৎসাহের সঙ্গে নিবন্ধন, ব্যালট পাঠানো—এসবের পর যদি শেষ ধাপে এসে সেই ব্যালটই ভোটারের হাতে না পৌঁছায়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অনেকে মনে করছেন, এতে শুধু ব্যক্তিগত ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হয় না, বরং নির্বাচনের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতার ওপরও প্রভাব পড়ে।
এ ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। প্রবাসী কমিউনিটিতে ক্ষোভ, হতাশা এবং উদ্বেগ—সবকিছুই দেখা যায়। কেউ কেউ বলছেন, তাদের ভোট আদৌ গণনায় এসেছে কি না, সেটি নিয়েই এখন সংশয়। আবার অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হবে।
জরুরি বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে যে, সুপারিশ অনুযায়ী ব্যালটগুলো সঠিকভাবে বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রবাসী ভোটাররা সময়মতো তা হাতে পাবেন। তবে এই আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ নির্বাচন একটি সময়সীমাবদ্ধ প্রক্রিয়া—ব্যালট যদি দেরিতে পৌঁছায়, তাহলে ভোট দেওয়ার সুযোগ বাস্তবিক অর্থেই হারিয়ে যায়।
এই ঘটনায় একটি ইতিবাচক দিকও আছে। একজন সচেতন পোস্টাল কর্মীর দায়িত্ববোধ এবং দ্রুত যোগাযোগের ফলে বিষয়টি অন্তত সামনে এসেছে। না হলে নীরবে হাজারো ব্যালট বাতিল হয়ে যেত, যা হয়তো কখনোই প্রকাশ্যে আসত না। এটি দেখায়, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সততা ও সচেতনতারও কতটা গুরুত্ব রয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সমাধান চাইলে কেবল ব্যক্তি বা তাৎক্ষণিক বৈঠকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রবাসী ভোটব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি, বিকল্প ভোটিং পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক ডাক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় জরুরি। অনেক দেশ ইতোমধ্যে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন ভোটিংয়ের দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল ভোটিং ব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় কি আসেনি—এই প্রশ্নও উঠছে।
নিউইয়র্কের পোস্ট অফিসের গুদামে পড়ে থাকা এই ব্যালট পেপারগুলো যেন একটি সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিন ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি ধাপের সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। প্রবাসী নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু তাদের একটি ব্যালট পাঠানো নয়, বরং সেই ব্যালট নিরাপদে, সময়মতো এবং কার্যকরভাবে তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত আশা করা যায়, এই ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার বদলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এটিকে শিক্ষা হিসেবে নেবে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। নিউইয়র্কের একটি গুদামে আটকে থাকা ব্যালট পেপারের গল্প যেন ভবিষ্যতে আর কখনো না ফিরে আসে—এটাই এখন প্রবাসী ও দেশবাসী সবার প্রত্যাশা।
আপনার মতামত জানানঃ