হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় গত শুক্রবার যে ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একটি থানার ভেতরের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিই নয়, বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনের অবস্থান এবং আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতির জটিল সম্পর্কের একটি প্রতিচ্ছবি। নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে আটকের পর তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে থানায় গিয়ে পুলিশের ওপর চাপ, ওসির সঙ্গে প্রকাশ্য তর্ক, অতীতের সহিংস ঘটনার উল্লেখ এবং শেষ পর্যন্ত পুলিশ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে বিষয়টি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শায়েস্তাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি এনামুল হাসান ওরফে নয়ন। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শায়েস্তাগঞ্জ থানা-পুলিশ তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। অভিযোগ ছিল, তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন। নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটকের ঘটনা নতুন নয়, তবে এই আটককে ঘিরে যে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা হবিগঞ্জ জেলাতেও বিরল।
এনামুল হাসানকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁদের দাবি ছিল, এনামুল অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন এবং সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সেই বিবেচনায় তাঁকে কেবল অতীত রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আটক করা অন্যায়। এই দাবিকে সামনে রেখে শুক্রবার দুপুর থেকেই শায়েস্তাগঞ্জ থানার সামনে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। একপর্যায়ে তাঁরা থানা ঘেরাও করেন এবং এনামুলের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।
থানার ভেতরের পরিস্থিতিও দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দেওয়া মাহদী হাসানের নেতৃত্বে একদল নেতা-কর্মী থানার ওসি আবুল কালামের কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে তাঁদের মধ্যে তীব্র বাক্বিতণ্ডা শুরু হয়। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিওতে মাহদী হাসানকে ওসির উদ্দেশে কঠোর ভাষায় কথা বলতে শোনা যায়। তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁরাই সরকার গঠন করেছেন এবং পুলিশ প্রশাসন এখন তাঁদের অধীনেই কাজ করছে। আন্দোলনকারী হওয়ার পরও কেন তাঁদের লোকজনকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ভিডিওতে সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো বানিয়াচং থানায় আগুন দেওয়ার এবং এক পুলিশ সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যার প্রসঙ্গ। মাহদী হাসানকে বলতে শোনা যায়, বানিয়াচং থানা তাঁরা পুড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল—এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, প্রকাশ্যে এমন সহিংস ঘটনার উল্লেখ করা কি আইনের চোখে গুরুতর অপরাধ নয়? আবার কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক দম্ভ বা ক্ষমতার অপপ্রয়োগের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
এদিকে থানা ঘেরাও করে রাখা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের অবস্থানও ছিল বেশ চাপের মধ্যে। একদিকে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, অন্যদিকে শক্তিশালী আন্দোলনকারী গোষ্ঠীর চাপ—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে পুলিশকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিকেল তিনটার দিকে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলাম শায়েস্তাগঞ্জ থানায় পৌঁছান। তাঁর মধ্যস্থতায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে এনামুল হাসানকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে দেওয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়, এনামুল হাসানকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সে কারণে তাঁকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপারের বরাত দিয়ে শনিবার সকালে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও একই কথা বলা হয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যদি কোনো অপরাধের প্রমাণই না থাকে, তাহলে তাঁকে গভীর রাতে আটক করা হলো কেন এবং কেনই বা ১৫ ঘণ্টা থানায় রাখা হলো?
এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান গণমাধ্যমে বলেন, এনামুল হাসান অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। শুধু অতীত পরিচয়ের কারণে তাঁকে আটক করা পুলিশের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি আরও বলেন, তাঁদের আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী সারজিস আলমও একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাহলে কি তাকেও অপরাধী বলা হবে? মাহদীর বক্তব্যে স্পষ্ট, তাঁরা অতীত রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বর্তমান অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান।
অন্যদিকে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, পুলিশের কোনো অপরাধ এখানে ছিল না। আটক থেকে শুরু করে ছাড়ার পুরো ঘটনাই ভিডিও আকারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং জনগণ নিজের চোখে সব দেখেছে। তাঁর দাবি, পুলিশ আইন অনুযায়ী কাজ করেছে। কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে, আর অপরাধের প্রমাণ না থাকলে কাউকে আটক রাখা যায় না। পরে তিনি আরও বলেন, রাতে সময় বেশি হয়ে যাওয়ায় প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়নি। পরদিন তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের পর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এনামুল কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন, তাই তাঁকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ হবিগঞ্জের সাম্প্রতিক সহিংস ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বানিয়াচংয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা, থানায় আগুন দেওয়া, পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার মতো ঘটনার স্মৃতি এখনো এলাকাবাসীর মনে তাজা। সেই প্রেক্ষাপটে থানার ভেতরে দাঁড়িয়ে এমন সহিংস ঘটনার উল্লেখ করা নিছক উত্তেজনাকর বক্তব্য নয়, বরং তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে কেউ যদি প্রকাশ্যে অতীত সহিংসতার কথা বলে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা। থানার ভেতরের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে। ভিডিওটি দেখে অনেকেই পুলিশ প্রশাসনের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, আবার কেউ কেউ আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতির উগ্র রূপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। সামাজিক মাধ্যমে মতবিভাজন স্পষ্ট—একপক্ষ বলছে, রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে; অন্যপক্ষ বলছে, আইনের শাসন ভেঙে পড়ছে।
সব মিলিয়ে শায়েস্তাগঞ্জ থানার এই ঘটনা একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়। রাজনৈতিক পরিচয় কি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে? আন্দোলনের অংশগ্রহণ কি অতীত বা বর্তমান অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দিতে পারে? আর পুলিশ কি আদৌ স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারছে, নাকি বিভিন্ন চাপের মুখে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হচ্ছে? এনামুল হাসানের মুক্তি হয়তো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পরিসমাপ্তি, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যে বার্তা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসন, রাজনীতি ও নাগরিক নিরাপত্তার জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে।
আপনার মতামত জানানঃ