Trial Run

 পদত্যাগের ঘোষণা প্রত্যাহার করে নিলেন হেফাজতের নায়েবে আমির

হেফাজতের নায়েবে আমির আব্দুল আউয়াল

হেফাজতে ইসলামীর ডাকে বিগত হরতালে কর্মীদের সহিংসতায় ক্ষুব্ধ হয়ে হেফাজতে ইসলামের পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আব্দুল আউয়াল। এবার সেই ঘোষণা প্রত্যাহার করে নিলেন তিনি। তিনি পদ ছাড়ছেন না। আজ বুধবার (৩১ মার্চ) নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি এলাকায় রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে হেফাজতের চার সদস্যের এক প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে বিকালে সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক।

মামুনুল হক জানান, হেফাজতের আমীর জুনায়েদ বাবুনগরীর নির্দেশে তারা মাওলানা আবদুল আউয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নারায়ণগঞ্জে এসেছেন। সম্প্রতি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নায়েবে আমীর আব্দুল আউয়ালের ভুল বোঝাবুঝি ও মান অভিমান সৃষ্টি হয়েছিল। সবার অনুরোধে সবকিছু ভুলে গিয়ে আবদুল আউয়াল তার পদত্যাগের ঘোষণা প্রত্যাহার করেছেন। আগের পদে বহাল থেকেই তিনি হেফাজতের পরবর্তী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন।

রোববারের হরতালে নারায়ণগঞ্জে নাশকতা মেনে নিতে না পেরে নায়েবে আমিরের পদ থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দেয়া হেফাজত নেতাকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারে রাজি করার কথা জানিয়েছিলেন সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক।

মাওলানা আবদুল আউয়ালের হেফাজত থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে তোলপাড়ের মধ্যে আজ বুধবার মামুনুল ছুটে যান তাকে সংগঠনে ফিরতে রাজি করাতে।

আবদুল আউয়াল তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে হরতালে নাশকতার কথা উল্লেখ করলেও মামুনুল সহিংসতার কথা বেমালুম অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, কোনো ধরনের সন্ত্রাসের সঙ্গে তাদের নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা নেই।

হরতালে সহিংসতা প্রসঙ্গে মামুনুল বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম কোনো অরাজকতা বা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নয়। হেফাজতের নেতা–কর্মীরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছিল। তাদের অবস্থানে কোথাও কোনো ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি। যে সহিংসতা হয়েছে আমরা তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

সাংবাদিকদের মারধরের প্রশ্নের জবাবে মামুনুল বলেন, হেফাজত জড়িত থাকতে পারে না। কোথাও কেথাও ভুল–বোঝাবুঝি হয়ে থাকতে পারে। কারণ, হেফাজতে ইসলাম গণমাধ্যমকর্মীদের সম্মান করে। তবে হেফাজতের মাঠপর্যায়ের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে ভুল–বোঝাবুঝি হতে পারে, অথবা চলাচলে ভুল হতে পারে। কিন্তু হেফাজতের কোনো দায়িত্বশীল নেতা সাংবাদিকদের মারধর করেননি।

রোববার হেফাজতের হরতালে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রামের পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডব চালিয়েছে হেফাজতের কর্মীরা। সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, যানবাহনে নির্বিচারে ভাংচুর, আগুনের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনাও হচ্ছে।

এর মধ্যে মামুনুলের নেতৃত্বে হেফাজতের প্রতিনিধি দল বিকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি জামে মসজিদে বৈঠকে বসে মাওলানা আবদুল আউয়ালে সঙ্গে।

ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা শেষে মামুনুল হক বলেন, ‘আমাদের মধ্যে আলোচনা শেষে দলের নায়েবে আমির আবদুল আউয়াল পদত্যাগের ঘোষণা প্রত্যাহার করেছেন।…আগের মত হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর ও নারায়ণগঞ্জে সভাপতি দায়িত্ব পালন করবেন। একই সাথে মাঠে ময়দানে থেকে তিনি আগের মতো নেতৃত্ব দেবেন।’

জানা গেছে, হেফাজতের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল মাওলানা আব্দুল আউয়ালের সঙ্গে বৈঠক করতে দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে ডিআইটি মসজিদে এসে উপস্থিত হন। আসরের নামাজ শেষে বিকাল সাড়ে ৫টায় গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফিং করেন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। এ সময় প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি জুনায়েদ আল হাবীব, যুগ্ম মহাসচিব ফজলুল করীম কাসেমী এবং যুগ্ম মহাসচিব মুফতি নাসির উদ্দিন মনির। সঙ্গে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর কমিটির নেতৃবৃন্দ।

এর আগে গত সোমবার শবে বরাতের রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বয়ানে নানা ক্ষোভের বিষয় তুলে ধরে হেফাজতের পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন মাওলানা আবদুল আউয়াল। এ সময় মাওলানা আব্দুল আউয়াল দলীয় নেতা-কর্মীরা তার নির্দেশনা মানছেন না বলেও অভিযোগ তোলেন।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় মিছিল বের করতে চাইলে অ্যাকশনে যাবে। তাদের উপরের নির্দেশেনা রয়েছে। প্রয়োজনে গুলি করবে। তখন আমি সবার জানমালের স্বার্থে মসজিদের গেটের বাইরে যেতে বারণ করি। কারণ আমাদের তো অস্ত্র নাই। কিন্তু মহানগরের অতি উৎসাহী নেতারা মিছিল করতে চেয়েছিল। যদি সেদিন মিছিল করতে গিয়ে আমাদের ওপর গুলি ছোঁড়া হতো, কেউ লাশ হতো তখন তো এই আবদুল আউয়ালকে দোষারোপ করা হতো। মসজিদে গুলি ছুঁড়লে ঝাঁজরা হয়ে যেত। তখন আপনারাই বলতেন কেন লাশ হলো মানুষ। এ কেমন নেতৃত্ব। এসব নেতৃত্ব আমরা মানি না। তখন মেয়র আইভীসহ অনেকেই সুযোগ নিতেন আমাকে সরিয়ে দিতে। মামলা হয়েছে। যদি আমরা মিছিল করার চিন্ত করতাম তাহলে সব মামলার আসামি হতাম আমিসহ সবাই।

তিনি বলেন, এ কারণে আমাদের লোকজনও অনেকেই ক্ষুব্ধ। তারা আজকে (সোমবার) ডিআইটি মসজিদে বাদ আসর দোয়া না করে দেওভোগে করেছে। কারণ আমাকে তো বাদ দিয়েই দিছে। তাই আমি আর দল করব না। ভবিষ্যতে আর নেতৃত্ব দেব না। মসজিদ মাদ্রাসা নিয়েই থাকব। আমার এখন বার্ধক্য বয়স, তাই আমি ভবিষ্যতে আর নেতৃত্বে থাকব না। আমি আমার জিম্মাদারি ছেড়ে দিলাম। আমি হেফাজত ইসলামের নেতৃত্বে আর থাকব না। আমার আমীর পদ দরকার নাই। আমার পক্ষ থেকে আর কোন দিন ঘোষণা আসবে না। তোমরা যারা অতি উৎসাহী আছ, তোমরা বাবা হেফাজত ইসলাম করো।’

পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে ফেসবুকে ‘শায়েখ মাওলানা আবদুল আউয়াল সাহেব সমর্থক’ নামের একটি পেইজে তার পদত্যাগ সংক্রান্তএমন বক্তব্যের একটি ভিডিওচিত্র আপলোড দেওয়া হয়। ৪ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে আবদুল আউয়াল হেফাজতে ইসলাম দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। পরে তার বক্তব্যের এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হেফাজতের মধ্যকার নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দলের ঘা এখনো শুকোয়নি। তাই এই বিভাজন। একদল চাইছে মাঠে থাকতে অন্যদল চাইছে অসহিংসতা। হেফাজতে ইসলামে ঐক্যমত ও আদর্শের বালাই নেই বলে দলটির নেতৃত্বে এমন বিশৃঙ্খলা দেখা যায় বলে জানান বিশ্লেষকরা।

তারা বলেন, দেশের সবকটা রাজনৈতিক দলই স্বার্থের রাজনীতি করে। ফলে আদর্শের বাইরে গিয়ে তারা স্বার্থোদ্ধারে মরিয়া। হেফাজত ইসলামও তেমনি একটি দল।

তারা বলেন, একদল চাইছে ধর্মের স্বার্থে রাজনীতি করতে অন্যদল চাইছে রাজনীতির স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করতে। ফলে আদর্শগত দিক থেকে দলটিতে এই ফাটল। ক্ষমতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা দলটি ইতিমধ্যে ধর্মের সংস্পর্শ থেকেও দূরে সরে গেছে। আওয়ামী লীগের সংস্পর্শে কিংবা প্রশ্রয়ে এসে তারাও ক্ষমতার রাজনীতিতে নেমেছে। তাদের এই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কুফল গত কয়েকদিনের ব্যাপক জ্বালাও পোড়াও তাণ্ডব দেখে ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মন থেকেও ইতিমধ্যে উঠে গেছে দলটি। মোদীবিরোধী আন্দোলনে নেমে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন প্রতিকৃতিতে আগুন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংগীতাঙ্গনে ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক তাণ্ডবে বিরক্ত ধর্মপ্রাণ দেশবাসী। তারা ধর্মের নামে দেশে এই ব্যাপক অগ্নি নির্যাতন মেনে নিতে পারেনি।

বিশ্লেষকরা বলেন, হেফাজত ইসলাম কেবলি একটি রাজনৈতিক দল। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মত ধর্মকে ব্যবহার করলেও ধর্ম নিয়ে তাদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই যতটা আছে ক্ষমতার্জন নিয়ে, দেশবাসী ইতিমধ্যে তা উপলব্ধি করেছে। হেফাজত ইসলামের দলের নেতৃত্বস্থানীয় অনেক নেতাও তা বুঝতে শুরু করেছেন। সেখান থেকেই নায়েবে আমিরের পদত্যাগের ঘোষণা আসে।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/২১৩৬ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগীতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগীতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 178
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    178
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ