Trial Run

ধর্মকে ঢাল বানিয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা 

বিশেষ প্রতিবেদক :  ‘সংখ্যালঘুবান্ধব’ আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে একনাগাড়ে প্রায় সাড়ে ১২ বছর ক্ষমতায় আছে। দেশে বরাবরই সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও এখন মূলত রাজনৈতিক অস্থির অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে এ ধরনের ঘটনা। বাংলাদেশ যতই তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র থেকে সরে যাচ্ছে, ততই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতন বাড়ছে৷ সম্প্রতি হেফাজত নেতা মাওলানা মামুনুল হকের সমালোচনা করে পোস্ট দেয়ার জেরে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় হিন্দু পল্লীতে হামলা চালানোর ঘটনায় আবারও তা সামনে এসেছে৷ সংখ্যালঘুদের ওপর অতীতের সব হামলার মতো এই হামলারও বিচার না হওয়ার আশঙ্কা জাগাচ্ছে সমাজের বাদবাকিদের অধিকাংশের সাবধানী প্রতিবাদ কিংবা সুকৌশলে ঘটনাকে হাল্কা করে দেয়ার চেষ্টা৷

ফেসবুকে কটূক্তির জেরে হামলা

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে কটূক্তির জেরে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে তার সমর্থকরা হামলা চালিয়েছে। এ সময় গ্রামের পাঁচটি মন্দিরসহ শতাধিক বাড়িতে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মাওলানা মামনুল হককে কটাক্ষ করে স্ট্যাটাস দেয়ার পর বুধবার সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে এই হামলা চালানো হয়। এতে ৮৮টি পরিবারের বসতঘর ও ৭টি পারিবারিক মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গ্রামবাসী জানান, মঙ্গলবার বিকেল থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা হতে পারে ধারণা করে রাতেই গ্রামের অনেক বাসিন্দা বাড়ি ছেড়ে চলে যান। বিষয়টি মঙ্গলবার রাতে পুলিশকে জানান গ্রামবাসী। পরে সকাল ৮টার দিকে দিরাই উপজেলার নাচনি, চণ্ডিপুর, সন্তোষপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের কয়েকশ’ মানুষ দা, রাম দা, লাঠি-সোটা নিয়ে ওই গ্রামে হামলা চালায়। খবর পেয়ে শাল্লা থানা পুলিশসহ ও দিরাই থেকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য বিশ্বরূপ দাস জানান, হাজার-দেড় হাজার লোক যখন সকালে লাঠি, রামদা নিয়ে আক্রমণের জন্য আসে তা নদীর এপার থেকেই দেখা যায়৷ তাদের দেখে গ্রামের লোকজন গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান৷ কিন্তু নারী ও শিশুদের একটি অংশ পালাতে পারেননি৷ হামলাকারীদের একটি অংশ সাঁকোর ওপারে অবস্থান করে আর আরেকটি অংশ গ্রামে ঢুকে বাড়ি ঘরে হামলা চালায়৷

তিনি জানান তারা দুইটি দলে ভাগ হয়ে বন্ধ ঘরে ঢুকে ভাঙচুর করে, আলামারি ভেঙে ফেলে, স্বর্ণালঙ্কার, মূল্যবান সামগ্রী ও টাকা পয়সা লুট করে৷ মোট ৮৮টি ঘরে হামলা চালিয়ে তারা লুটপাট করে৷ আর যে নারী ও শিশুরা পালাতে পারেনি তাদের মারধর করে৷ বিশেষ করে জুমন দাসের স্ত্রী ও স্থানীয় ইউপি চেয়াম্যানের স্ত্রীকে ব্যাপক মারপিট করে৷ ইউপি চেয়ারম্যানের স্ত্রী বাথরুমে ঢুকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে তাকে সেখান থেকে টেনে বের করে মারধর করা হয়৷ ৭-৮টা পারিবারিক মন্দির ছিলো সেগুলোও ভাঙচুর করা হয়৷ মন্দিরের প্রতিমাও তারা ভেঙে ফেলে৷

শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আল আমিন চৌধুরী বলেন, ‘শতাধিক ঘরবাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট হয়েছে। বিত্তশালীদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট হয়েছে বেশি।’

এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে কটাক্ষ করে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ায় নোয়াগাঁওয়ের আশপাশের গ্রামের মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। মঙ্গলবার রাতে স্ট্যাটাস দানকারী ঝুমন দাস ওরফে আপনকে আটক করা হয়। তারপরও সকালে মামুনুল হকের সমর্থকরা ওই গ্রামে হামলা চালায়, ভাংচুর করে।’

হামলা হতে পারে জেনেও ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ

সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হতে পারে আঁচ করে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিলেন গ্রামবাসী। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, হামলা হবে না তাদের গ্রামে। কিন্তু পরদিন নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের ওপর ঘটে ভয়াবহ হামলা। বাড়িঘর-মন্দির ভাঙচুরের সঙ্গে চলে লুটপাট।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা বলেছেন, পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা আন্তরিক হলে এই হামলা প্রতিরোধ করা যেত। আর পুলিশ বলছে, বিক্ষোভকারীরা হামলা করবে না বলে কথা দিয়েছিল।

সূত্র মতে, হামলার দিন বুধবার সকালে কাশিপুর গ্রামের মসজিদের মাইক থেকে নোয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে হামলা চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। সবাইকে সে গ্রামে একত্র হয়ে যাওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। এরপর আশপাশের গ্রামের লোকজন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন খবর পেয়ে আবারও পুলিশকে জানান নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দারা। একই সঙ্গে গ্রামের এক ব্যক্তি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। এরপর পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যান ঘটনাস্থলে যান। তখন নোয়াগাঁও গ্রামের পাশের দাড়াইন নদের তীরে কয়েক হাজার লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হয়েছেন। প্রশাসন, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরা তাদের একদিকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে একটি অংশ গ্রামে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়ে যান।

আক্রমণকারীদের উল্লাস

হামলা করে ফেরার সময় হামলাকারীরা ফেসবুক লাইভেও কথা বলেছে। পারভেজ আহমদ চৌধুরী নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে কিছু ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। তার একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কিছু অস্ত্রধারী হাঁটতে হাঁটতে বলছে, ‘মামনুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে কটূক্তি করার কারণে হিন্দুস্তানের যারা যারা আছে, তাদের ধরার জন্য আমরা একত্রিত হয়েছি। আশপাশের গ্রামের মানুষ একত্রিত হইয়া আমরা হামলা করতে আইছি। ঝুমনকে (ফেসবুকে মাওলানা মামুনুল হকের সমালোচনা করে স্ট্যাটাস দেওয়া যুবক) এসে আমরা পাইনি। পুলিশ আগেই তারে গ্রেপ্তার করছে। মামুনুল হক যে কী জিনিস তারা বোঝেনি। হিন্দুদের ভেতর আজ থেকে কম্পন তুলে দিয়ে গেলাম। বুঝিয়ে দিলাম মামুনুল হকের বিরুদ্ধে কিছু বললে, ডাইরেক্ট অ্যাকশন।’

লাইভেই একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘মামুনুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে কী করতে পারেন?’ উত্তরে আরেকজন বলছিল, ‘জীবন দিতে পারি।’ এই হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ ফেসবুকে ভাইরাল হলেও তাদের অনেকে গ্রেপ্তার হয়নি। 

জানা গেছে, হামলার সময় স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা দলের নীতি আদর্শের কথাও ভুলে গিয়েছিল। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজত কর্মী এক হয়ে মামুনুল হকের সমর্থক হয়ে যান।

ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি

নোয়াগাঁও গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, তাদের গ্রামের পার্শ্ববর্তী বরাম হাওরের মধ্যে শাল্লা অংশে গোসাইর বিল ও নিত্যার দাইর নামে দুটি জলমহাল রয়েছে। এ দুটি বিল ওয়াক্ফ এস্টেট থেকে ইজারা এনে কয়েক বছর ধরে মাছ আহরণ করছেন নাচনি গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শহিদুল ইসলাম ওরফে স্বাধীন এবং তার লোকজন। ইজারার নীতিমালার শর্ত না মেনে তারা পাম্প দিয়ে পানি সেচে মাছ ধরেন। এতে নোয়াগাঁওসহ আশপাশের গ্রামের কৃষকেরা বোরো আবাদে সেচ সংকটে পড়েন।

এ নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা হরিপদ চন্দ্র দাস ও জগদীশ চন্দ্র দাস শাল্লা থানায় শহিদুল ইসলাম এবং তার সহযোগী কেরামত আলী, মির্জা হোসেন, ফখর উদ্দিন ওরফে ফক্কন, আলাম উদ্দিনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু এরপরও বিলে সেচ বন্ধ না হলে গত ২৫ জানুয়ারি পুলিশের সিলেট রেঞ্জের ডিআইজির কাছে আরেকটি অভিযোগ দেওয়া হয়।

দিরাই উপজেলা প্রশাসন ওই দিনই গোসাইর জলমহাল থেকে দুটি সেচপাম্পসহ ফখর উদ্দিনকে আটক করে। পরে তাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দ করা দুটি সেচপাম্প নিলামে বিক্রি করা হয় ৩৫ হাজার টাকায়। এ নিয়ে শহিদুল ইসলাম ও তার সঙ্গীরা নানাভাবে নোয়াগাঁও গ্রামের লোকজনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। হামলার পর থেকে তাদের নাম মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে বুধবারের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় শহিদুল ইসলামকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

পুলিশি তৎপরতা

নোয়াগাঁও গ্রামের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শাল্লা থানায় দুটি মামলা হয়। একটি মামলা করে শাল্লা থানার পুলিশ। থানার উপপরিদর্শক আবদুল করিম বাদী হয়ে দায়ের করা ওই মামলায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। 

আরেকটি মামলা করেন নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার। ওই মামলায় ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ব্যক্তিকে আসামি করা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত শহিদুল ইসলাম ওই মামলার ১ নম্বর আসামি।

এখন অব্দি নোয়াগাঁওয়ে হামলার ঘটনায় ৩৩ জন গ্রেপ্তার হলেন। মামলার প্রধান আসামি শহিদুল ইসলাম ওরফে স্বাধীন মিয়াকে (৫০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত শুক্রবার রাত তিনটার দিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা শহর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে একটি স্কুলের পাশে তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন।

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার খালেদ উজ জামান গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় শহিদুল ইসলামের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে সুনামগঞ্জ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানান তিনি।

গ্রেপ্তার শহিদুল ইসলাম দিরাই উপজেলার সরমঙ্গল ইউনিয়নের নাসনি গ্রামের বাসিন্দা ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য।

মুসলমান হতে ৫০ হিন্দু বাড়িতে বেনামে চিঠি

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে হিন্দু থেকে মুসলিম হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার চরগোয়ালদহ ও মালাইনগর গ্রামে ৫০-এর অধিক হিন্দু বাড়িতে কারা যেন চিঠি পাঠিয়েছে। গতকাল শুক্রবার (১৯ মার্চ) রাতের আধারে ৫০টির বেশি হিন্দু বাড়িতে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে উড়ো চিঠি দিয়েছে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা।

রাতের বেলায় মাথায় হেলমেট পরে পরিচয় গোপন রেখে একই ধরনের চিঠির ঘটনায় ওই এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ জনকে আটক করা হয়েছে।

চর মালাইনগর গ্রামের দিপ্ত বালা নামে এক ব্যক্তি জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর পাঞ্জাবি পাজামা পরিহিত কয়েকজন ব্যক্তি হেলমেট পরা অবস্থায় বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাড়ির কর্তাদের নামে খামে ভরা ওই চিঠিগুলি বাড়ির সদস্যদের হাতে দিয়ে দ্রুত মোটরসাইকেলে এলাকা থেকে সরে পড়ে। ওই গ্রামের ৫০টির বেশি বাড়িতে পরপর চিঠিগুলি বিতরণ করা হয়। চিঠিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওইসকল ব্যক্তিকে ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত বিভিন্ন কথা লেখা ছিল। চিঠির সবশেষে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয় তাদের। এ ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

‘আওয়ামী লীগে কি সাম্প্রদায়িক লোকজন ঢুকে গেছে?

সুনামগঞ্জের শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে আ’লীগ ও স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস।

শাল্লার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতারা কেন কোনও প্রতিবাদ করছেন না উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে আওয়ামী লীগের মধ্যে কি সব সাম্প্রদায়িক লোকজন ঢুকে গেছে?’

ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস বলেন, ‘সুনামগঞ্জে হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে কিছু বাম সংগঠনের নেতা-কর্মী প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু, জেলা এবং উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা কোনো প্রতিবাদ করেনি, যা আমাদের ভাবায়। একইসঙ্গে প্রশাসনের তীক্ষ্ণ নীরাবতাও আমাদের বার বার ভাবায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে হামলা হতে পারে জানার পরও প্রশাসন কেন নীরব ছিল? আমরা কী ধরে নেব যে- এই প্রশাসনে সব সাম্প্রদায়িক লোকজন ঢুকে গেছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে সব সাম্প্রদায়িক লোকজন ঢুকে গেছে। আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকেও দেখলাম না এ বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে।’

তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাতে হয় যে, আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শের রাজনীতি করি, আমরা আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক পুরাতন সংগঠন। বঙ্গবন্ধু তার এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘আ’লীগও ভুল করতে পারে, কিন্তু আমার ছাত্রলীগ ভুল করতে পারে না। সে ধারাবাহিকতায় আমরা বলতে চাই, ছাত্রলীগ ভুল করবে না।’

সংখ্যালঘু নির্যাতনের পরিসংখ্যান

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সূত্র অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল ১,৪৭১ টি৷ ২০১৭ সালে তা কমে হয়েছিল ১,০০৪টি। ২০১৮ সালে আরও কমে যায়। ঘটেছিল ৮০৬টি সহিংসতার ঘটনা। 

কিন্তু ২০১৯ সালে সারাদেশে ৩১ হাজার ৫০৫ জন ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের শিকার হন। নয় হাজার ৫০৭ একর ভূমি জবরদখল করা হয়। ওই বছর সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, হত্যা, নির্যাতনসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১০৮টি হত্যা, ১১১টি হত্যার হুমকি, ৮৮ জনকে হত্যাচেষ্টা, নির্যাতনে ৪৮৪ জন আহত, ৭৬ জনকে অপহরণ, ৪২ জনকে ধর্ষণ, ১৮ জনকে গণধর্ষণ, ২৬ জন নিখোঁজ, ১৪৮ জনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ, ১৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা চাঁদাবাজি, ২৭৭টি মন্দির লুট, ৩৮৭টি বসতবাড়িতে হামলা, ৯২টি অগ্নিসংযোগ, ৭৯টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ৪৩৪টি পরিবারকে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ, ৬৪১ পরিবারকে দেশত্যাগের হুমকি, ৩৭৯টি পরিবারকে দেশত্যাগে বাধ্যকরণ, ১০৯ জনকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার, ৩৬ জনকে মিথ্যা রাজাকার বানানো ইত্যাদি।

২০২০ সালে আরও বেড়ে যায় নির্যাতনের ঘটনা। হত্যা, হামলা, জমি দখল, অপহরণ, ধর্মান্তর, ধর্ষণ, উচ্ছেদ, দেশত্যাগে বাধ্য করা সহ ৪০ হাজার ৭০৩টি ঘটনা ঘটেছে। হত্যার শিকার হয়েছে ১৪৯ জন, ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৩ জন, দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে দুই হাজার ১২৫ পরিবারকে। এক বছরে হত্যার শিকার হয়েছে ১৪৯ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৩ জন এবং দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে দুই হাজার ১২৫ পরিবারকে। ৩৭০টি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

করোনা মহামারিকালীন কিছু ঘটনা

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দুই মাসের বেশি সময় ধরে দেশে অঘোষিত লকডাউন চলছিল। বিভিন্ন সংবাদপত্র, থানায় দায়ের করা মামলা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সূত্রে জানা গেছে, লকডাউনের সময় দেশের ২৭টি জেলায় অন্তত ৩৬টি হামলা, নির্যাতন, অপহরণ ও উপাসনালয় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আর এসব ঘটনার সঙ্গে চিহ্নিত সন্ত্রাসীর পাশাপাশি স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের সম্পৃক্ত থাকারও প্রমাণ মিলেছে। 

গত এপ্রিল মাসে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা

১. গত ৪ এপ্রিল সন্ত্রাসীরা সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার নগরঘাটার মুদি ব্যবসায়ী সুবল চক্রবর্তীকে মারধর করে এবং কালেমা না পড়লে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেয়। এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

২. গত ২৪ এপ্রিল বাগেরহাট জেলার মোংলা থানার গোলেডাঙ্গা গ্রামের অনিল বালার পরিবারের ওপর হামলা চালায় পাশের বাঁশতলা গ্রামের একদল ভূমিদস্যু। এতে নারী-শিশুসহ সাতজন গুরুতর আহত হন। থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

৩. রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ঘাসি গ্রামের নিমাই সরকারের নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে অষ্টমী সরকারকে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন পাশের গ্রামের গোলাম মোস্তফা ও তার সহযোগীরা। গত বছর গোলাম মোস্তফা অষ্টমীকে অপহরণ করলে পুলিশ ওই দিনই তাকে উদ্ধার করে এবং অপহরণকারীকে কারাগারে পাঠায়। এরপর জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি আবার অষ্টমীকে উত্ত্যক্ত করতে থাকেন। অপমানে মেয়েটি ১৬ এপ্রিল গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।

৪. ২১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার শুক্লাদাস পাড়ায় ৩০টি সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর সন্ত্রাসীরা হামলা চালায় ও দেশত্যাগের হুমকি দেয়। এতে ১৫ জন আহত হন। এই হামলার পেছনে একজন প্রভাবশালী নেতার ইন্ধন থাকার অভিযোগ আছে।

৫. যশোর জেলার বেনাপোল পৌরসভার ছোট আঁচড়া এলাকার এক সংখ্যালঘু নারী ১৬ এপ্রিল রাতে প্রকৃতির ডাকে ঘরের বাইরে গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বাবু সরকার তার শ্লীলতাহানি করেন। পুলিশ বাবু সরকারকে আটক করলেও তিনি জামিনে বেরিয়ে এসে আক্রান্ত পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।

৬. গত ৭ এপ্রিল বিএনপি নেতা মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে ১০-১২ ব্যক্তি মাগুরা জেলার মহম্মদপুরে উপজেলার রাধানগর গ্রামের সুমন্ত চক্রবর্তীর পৈতৃক ভিটায় নির্মাণাধীন স্থাপনা হাতুড়ি ও শাবল দিয়ে গুঁড়িয়ে দেন। সুকান্তের শেষ সম্বল ৬০ শতাংশ জমির ১১ শতাংশ আগেই দখল করে নিয়েছেন মিজানুর। 

৭. কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার সাতানী হাইল্লা গ্রামের পরিতোষ কুমার সরকারকে ২১ এপ্রিল ইসলাম ধর্ম নিয়ে ফেসবুকে বিরূপ মন্তব্য করেছেন, এই গুজব রটিয়ে মারধর করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোকজন। কিন্তু পরিতোষ এ ধরনের কোনো স্ট্যাটাস দেননি। কারা তার ফেসবুকে এসব মন্তব্য করেছে, সেটি খুঁজে বের না করে তাকেই আটক করেছে পুলিশ। এই ঘটনা রামু, নাসিরনগর ও ভোলার কথা মনে করিয়ে দেয়।

নির্যাতনের ঘটনায় মামলার হার ‘২৫-৩০%’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা কাজল দেবনাথ বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় মামলার হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।

“নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়েরের হার ক্রমশ কমছে। এসব মামলায় বিচার পাওয়ার হার ৫ থেকে ৬ শতাংশ। নির্যাতনের ঘটনায় বিচার আমলে না নেওয়া, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও যথাযথ বিচার না পাওয়ায় অনেকেই মামলা করেন না।”

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, “এই ধরনের নির্যাতনের ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগও মামলা করে না। কারণ মামলা করলে তো আরেক ধরনের নির্যাতন। আসামিরা হুমকি দেবে, দেশছাড়া করবে। আইনের বিরাট পরিবর্তন দরকার। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পুলিশের সংখ্যা বাড়াতে হবে, সেই সঙ্গে তারা যেন গুরুত্ব দিয়ে বিষয়গুলো বিবেচনা করে সেটাও দেখতে হবে।”

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের গ্রেপ্তারেরও সমালোচনা করেন কাজল দেবনাথ। তিনি বলেন, “ধর্মীয় অবমামনা আইনটি যদি সব ধর্মের জন্য হয়, চারটি ধর্মের যে কোনো জায়গায় যে কোনো আচড় লাগলে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে একইভাবে রিঅ্যাক্ট করতে হবে।”

উগ্রবাদের উত্থানে ‘রাজনৈতিক ইন্ধন’

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, শাসক দলের পরিচিতি বা সমর্থন ছাড়া সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ খুবই কম৷ নেই বললেই চলে৷ তাই এই ধরনের অপরাধ যারা করে, তারা সব সময়ই রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকতে চায়৷ যেহেতু এই মূহূর্তে বাংলাদেশে শাসক দলের বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির তেমন কোনো অবস্থান নেই বললেই চলে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সরকারি দল বা সরকারি দলের মধ্যে ঢুকে দুষ্কৃতকারীরা বা ওই দলের নেতা-কর্মীরা এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে৷ এটা নীতিহীন রাজনীতির ফল৷’

ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী সংগঠনগুলোর আস্ফালনের পেছনে ‘রাজনৈতিক ইন্ধন’ রয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক মহল বিশেষের যে ইন্ধন আছে, এতে কোনো সন্দেহ নাই। জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধন হারিয়েছে, সুতরাং জামায়াতে ইসলামী এদের মাধ্যমে অপরাধ করার চেষ্টা করছে। বিএনপি আজকে বড় একটা খাদের গর্তের ভেতরে পড়ে গেছে, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য তারা নানা ইস্যু খুঁজছে। তারা নানা শক্তির উপর ভর করছে। তারা যদি এসব রাজনৈতিক অপশক্তির সাথে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নাই।

তিনি বলেন, ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কখনও কখনও কেউ জঙ্গিবাদের আশ্রয় নিয়ে নানা ঘটনা ঘটায়। এ মহল বিশেষ নতুন কিছু না। একাত্তরে এদের পূর্বসূরিরাই হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিলে গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে; আলবদর-আলশামস ও রাজাকার হয়েছে। এরা অন্ধকারের শক্তি। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ হল শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পক্ষে। সেই শক্তি যদি দাঁড়ায় তাহলে এদের অস্তিত্ব থাকবে?

অন্যদিকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, “ধর্মের নামে উগ্রবাদ, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ ঘৃন্য বিষয়। বাংলাদেশের মাটিতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। সকলের সহযোগিতায় ধর্মীয় উগ্রবাদ, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদকে প্রতিহত করা হবে।”

বিচারহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে সহিংসতা

সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা থামাতে হলে প্রয়োজন আইনের যথার্থ প্রয়োগ। দেশে ঘটনা এ ধরনের ঘটনার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও রাজনীতি হয়, কিন্তু বিচার হয় না৷ ফলে থামছে না নির্যাতনের ঘটনাও৷ নেপথ্যে ক্ষমতাসীনরা জড়িত থাকায় তাদেরকে আইনের আওতায় আনা যায় না।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্ত এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘১৯৯০ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় মামলারই সুযোগ দেয়া হয়নি৷ শাহাবুদ্দিন কমিশন তদন্ত করে কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছিল ঠিকই, তবে এখনও সে মামলার বিচার হয়নি৷ আমার জানা মতে, মাত্র তিনটি ঘটনার বিচার হয়েছে– গোপলা মুহুরী হত্যা, জ্ঞানজ্যোতি মহাথেরো হত্যা এবং পূর্ণিমার ওপর নির্যাতনের ঘটনা৷”

তিনি বলেন, ‘‘নাসিরনগরের রসরাজ আর রামুর উত্তম বড়ুয়া আটকের ঘটনাই প্রমাণ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বিচারের নমুনা৷ যারা নির্যাতনের শিকার তাদেরই আবার কারাগারে পাঠানো হয়৷ সংখ্যালঘু নির্যাতনের সঙ্গে যখন ক্ষমতাসীনরা জড়িত থাকেন, তখন বিচার পওয়ার প্রশ্নই ওঠে না৷”

রানা দাসগুপ্ত মনে করেন, ‘‘প্রচলিত আইনে সংখ্যালঘুরা বিচার পাবে না৷ এ জন্য আলাদা আইন ও ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে৷”

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান এ বিষয়ে বলেন, ‘‘সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের বিচার হয় না – এটা সত্য৷ এর পেছনে আছে রাজনৈতিক কারণ৷ রাষ্ট্র বা সরকার তাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না৷ সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে, সেক্ষেত্রে পুলিশ বেশ তৎপর থাকে৷ এই অবস্থার সহসা পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না।”

হিন্দু মহাজোটের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রিপন দে বলেন, ‘‘শুধু সুনামগঞ্জ নয়, তার আগেও যে কয়টি বড় ধরনের হামলা হয়েছে পুলিশ আগে পরিকল্পনার কথা জানলেও নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি৷ আর গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনইবা কী করেন?’’

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে রামুতে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলার ঘটনা ঘটে৷ প্রায় নয় বছর পার হলেও কোন বিচার এখনও হয়নি৷ এই ঘটনায় মোট ১৯টি মামলা হয়েছিল৷ একটি মামলার চার্জশিট হলেও বিচার শুরু হয়নি৷ যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো তারা সবাই জামিনে আছেন৷ আর যে উত্তম বড়ুয়ার নামে ফেসবুক পোস্টের অজুহাতে রামু, উখিয়া এবং টেকনাফে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল তিনি জামিন পেলেও এখন নিখোঁজ রয়েছেন৷ যদিও তদন্তে তার ফেসবুক পোস্টের কোনো প্রমাণ মেলেনি৷ ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু বসতিতে হামলার তদন্ত প্রায় পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি৷ ওই সময় যাদের আটক করা হয়েছিল তারাও জামিনে মুক্ত৷ অন্যদিকে লেখাপড়া না জানা যে রসরাজের ফেসবুক পোস্টের ধর্মীয় অবমাননার কথা তুলে হামলা হয়েছিল তাকেই উল্টো দীর্ঘদিন জেলে থাকতে হয়েছে৷ এখন জামিন পেলেও আতঙ্কে তার দিন কাটছে৷

এসডব্লিউ/এসএস/২০০৮ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, যেটি ছোট বা বড় হোক,  আপনাদের প্রতিটি সহযোগীতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগীতা করুন।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 376
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    376
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ