Trial Run

বিটকয়েন কেনাবেচার মাধ্যমে বিদেশে পাচার কোটি কোটি টাকা

ছবি: সংগৃহীত

ক্রিপ্টো কারেন্সি বিটকয়েনের ‍মাধ্যমে এক শ্রেনীর কালোর টাকার মালিক বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করছেন। একইসঙ্গে বিটকয়েন কেনা-বেচার মাধ্যমে কালো টাকার মালিকরা তাদের অবৈধ অর্থ সাদা করে নিচ্ছেন। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ এক বিটকয়েন ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের পর এসব তথ্য জানতে পেরেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (তেজগাঁও বিভাগ) গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, বিটকয়েন বাংলাদেশে অবৈধ। কিন্তু অনলাইনে বিটকয়েনে কেনাবেচার মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। আমরা এরকম বেশ কয়েকটি গ্রুপকে শনাক্ত করেছি। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব চক্রের ১০ জন সদস্যকে বিগত কিছুদিনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে মাস্টারমাইন্ডরা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর এই হোতারা দিয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তাদের মতে, দেশের অন্তত শতাধিক ব্যবসায়ী এই বিট কয়েনের সঙ্গে জড়িত।

গত শনিবার( ১৩ ফেব্রুয়ারি) গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশন সাতরাস্তা থেকে বিট কয়েন কেনাবেচা করার সময় মাহমুদুর রহমান জুয়েল (২৭) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। জুয়েল বিট কয়েন, ইথিরিয়াম, ইউএসডিটি কেনাবেচা করতো। তার ব্যবহৃত মোবাইলের দু’টি ডিভাইসে তিনটি অ্যাকাউন্ট পাওয়া যায়। ব্লক চেইন, বাইনান্স ও কয়েন বেইজ এই তিনটি অ্যাপের মাধ্যমে বিট কয়েন কেনাবেচা করতো। বিট কয়েন কেনাবেচার জন্য জুয়েল মালয়েশিয়া, দুবাই ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে একাধিকবার যাতায়াত করেছে। ২০১৬ সালের শেষের দিকে মালয়েশিয়া থাকাকালীন তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে প্রথম এই আইডিয়া পায়। তারপর থেকে পুরোপুরি এই অবৈধ বিট কয়েন কেনাবেচায় জড়িত হয়।

প্রাথমিকভাবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন, জুয়েল বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার করেছে। তার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে একবারে সর্বোচ্চ ২১ হাজার ডলার লেনদেন করেছে। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও যাদের কাছে কালো টাকা আছে তারাই তার কাছ থেকে বিট কয়েন সংগ্রহ করেন। পরে বিভিন্ন কেনাকাটার কাজে ও অর্থ পাচারের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। গ্রেপ্তার জুয়েল বিট কয়েন কেনার অর্থ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে এমএলএম পদ্ধতিতে টাকা নিয়েছিলেন। পরে লাভের টাকা থেকে তাদেরকে পরিশোধ করার কথা ছিল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিটকয়েন ভার্চুয়াল মুদ্রা। এটি ক্রিপটোকারেন্সি নামেও পরিচিত। বিট কয়েন ছাড়া টিআরওএক্স, এক্সআরপি, এডিএ নামে কিছু ক্রিপটোকারেন্সি এদেশে ব্যবহার হচ্ছে। অসাধু চক্রের সদস্যরা তিনটি অ্যাপসের মাধ্যমে লেনদেন করেন। অ্যাপসে গেলেই তারা ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্কে জানতে পারেন। অন্যান্য মুদ্রা লেনদেনে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে। কিন্তু বিট কয়েনে এমন কোনো কর্র্তৃপক্ষ নেই। বিশ্বের কিছু দেশে বিট কয়েন কেনাবেচা বৈধ থাকলেও ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ করে।

ডিবির তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদে এমএলএম ব্যবসার মাধ্যমে জুয়েল মানুষ থেকে অর্থ হাতিয়ে বিট কয়েন ব্যবসা শুরু করেন। ৭-৮ লাখ টাকা পুঁজিতে শুরু করলেও এখন তার ব্যবসা ৭০-৮০ লাখ টাকার। তবে অ্যাপসে জুয়েলের লেনদেন দেখে এ অঙ্ক কোটি টাকার ওপরে মনে হয়েছে। তিনি হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার করেছেন। জুয়েলের মুঠোফোন বিশ্লেষণ করেও বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। রনি নামে জুয়েলের এক সহযোগী রয়েছেন। পুলিশ তার বিষয়েও অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, কিছু ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও রাজনীতিকের সঙ্গে জুয়েলের বিট কয়েন কেনাবেচার তথ্য পাওয়া গেছে। অবৈধ টাকা দিয়ে বিট কয়েন কিনে তা ব্যবহার করে বাইরে থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র এনেছেন অনেক শিল্পপতি। এদের তালিকা করা হবে। জুয়েলের ব্যাংক হিসাবগুলোও খতিয়ে দেখা হবে।

সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গি অর্থায়নেও ব্যবহৃত হচ্ছে বিটকয়েন। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিটকয়েনের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করছে। এছাড়া অস্ত্র ও মাদকের বড় বড় চালানের পেমেন্টও করা হচ্ছে বিটকয়েনের মাধ্যমে। বাংলাদেশে জঙ্গি অর্থায়নেও বিটকয়েন ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের একটি টিম ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আউয়াল নেওয়াজ ওরফে সোহেল নেওয়াজ এবং ফজলে রাব্বী চৌধুরী নামে দুই জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছিল। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের এই সদস্যরা বিটকয়েনের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করছিল।

কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেফতার হওয়া দুই জঙ্গি ২০১৪ সাল থেকে বিটকয়েনের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে আসছিল। আগে প্রথাগত পদ্ধতি বা হুন্ডির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে জঙ্গি অর্থায়নের জন্য অর্থ আনা হতো। কিন্তু প্রথাগত পদ্ধতি বা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি গোয়েন্দারা নজরদারি করায় এখন পুরোপুরি ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থায়ন হচ্ছে।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (স্পেশ্যাল অ্যাকশন গ্রুপ) আহমেদুল ইসলাম বলেন, এখন জঙ্গি অর্থায়ন পুরাটাই বিটকয়েন বা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে হচ্ছে। এগুলোতে নজরদারি করা কঠিন বলে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো অর্থ লেনদেনের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছে। জঙ্গি প্রতিরোধে দীর্ঘ দিন কাজ করে আসা এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, অদূর ভবিষ্যতে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়ন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

এসডব্লিউ/এমএন/ এফএ/১৯১৯

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ