হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর মানচিত্রে খুব বড় কোনো জলপথ নয়। কিন্তু এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভর করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করা এই প্রণালি প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী জাহাজের চলাচলের প্রধান রুট। তাই হরমুজ প্রণালিতে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার জবাবে ইরান শুধু হরমুজ প্রণালি নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের আরও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টি করার হুমকি দিয়েছে। এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাজার, শিপিং শিল্প এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বের সমুদ্রপথভিত্তিক জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি প্রতিদিন বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহন করে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং ইরানের মতো জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর অধিকাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই রুটে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার বহু দেশ সরাসরি অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও নৌ সক্ষমতা লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর জানিয়েছে, প্রয়োজনে তারা শুধু হরমুজ প্রণালি নয় বরং এই অঞ্চলের আরও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টি করবে। যদিও কোন কোন রুট সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হতে পারে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে বাব আল-মান্দাব প্রণালি, ওমান উপসাগর এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্যের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হলো বাব আল-মান্দাব প্রণালি। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী অধিকাংশ জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে সুয়েজ খালে প্রবেশ করে। যদি এই রুট অচল হয়ে যায়, তাহলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হবে। এতে যাত্রাপথ কয়েক হাজার কিলোমিটার বেড়ে যায়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং পণ্য সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব সৃষ্টি হয়।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর তৎপরতা। ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী অতীতেও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাব আল-মান্দাব প্রণালিও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশদ্বারে সংকট তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অভূতপূর্ব চাপে পড়বে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সুয়েজ খালের ওপর। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই খাল দিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহন করে। বাব আল-মান্দাবে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে গেলে সুয়েজ খালের ব্যবহারও কমে যাবে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে এবং শিল্পকারখানার কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
ওমান উপসাগরও বর্তমান সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগে অধিকাংশ জাহাজ এই উপসাগর অতিক্রম করে। সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, ড্রোনের উপস্থিতি এবং সামরিক টহল বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো নতুন করে নিরাপত্তা মূল্যায়ন শুরু করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিকল্প রুট বিবেচনা করছে। কেউ কেউ জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। এতে পরিবহন ব্যয় এবং সামুদ্রিক বীমার খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কারণ কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশও হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং পরিবহন খাত একযোগে চাপের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তার জ্বালানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যয়, কৃষি খাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্ব বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য এবং অন্যান্য রপ্তানিযোগ্য পণ্য ইউরোপে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগতে পারে। এতে রপ্তানিকারকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল দুটি দেশের সামরিক সংঘাত নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, এর অর্থনৈতিক মূল্যও তত বেশি হবে। তাই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইতিহাস বলছে, হরমুজ প্রণালি বহুবার উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত বিশ্বশক্তিগুলো এই পথ সচল রাখতে উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ এই জলপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তার ক্ষতি কোনো একক দেশের নয়, বরং পুরো বিশ্বের। বর্তমান সংকটও সেই বাস্তবতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ইরানের হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবস্থান এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় ভূমিকা মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আজ এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। এই অনিশ্চয়তার পরিণতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তার ঢেউ পৌঁছে যাবে বিশ্বের প্রতিটি অর্থনীতিতে, প্রতিটি বন্দরে এবং প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
আপনার মতামত জানানঃ