আধুনিক যুদ্ধের মানচিত্রে এমন এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, যার শব্দ আমরা শুনি না, কিন্তু যার প্রভাব গভীরভাবে অনুভব করি। এই বিপ্লবের নাম ড্রোন প্রযুক্তি। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি দেশ—ইরান—যে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও যুদ্ধের প্রচলিত নিয়মকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে সক্ষম হয়েছে। আজকের বিশ্বে শক্তির ধারণা আর শুধু ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা পরমাণু অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; বরং ছোট, তুলনামূলক সস্তা কিন্তু কৌশলগতভাবে কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তিই হয়ে উঠেছে নতুন ক্ষমতার প্রতীক।
এই গল্পের শুরুটা একেবারেই সহজ ছিল না। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যখন ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে, তখন তাদের সামরিক সক্ষমতা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে যায়। বিপ্লবের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ইরান উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র পেত, যেমন এফ-চৌদ্দ টমক্যাট—যা তখন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক যুদ্ধবিমান ছিল। কিন্তু বিপ্লবের পর সেই সরবরাহ হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। আমেরিকান প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা দেশ ছেড়ে চলে যান, যন্ত্রাংশ আসা বন্ধ হয়ে যায়, আর আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে।
এই সংকটের মধ্যেই ইরানকে নতুনভাবে ভাবতে হয়। তারা বুঝতে পারে, প্রযুক্তিতে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তারা বেছে নেয় ভিন্ন পথ—নিজস্ব উদ্ভাবন, কম খরচে প্রযুক্তি উন্নয়ন, এবং বিকল্প কৌশল। এই চিন্তাভাবনাই পরবর্তীতে ড্রোন প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধ এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। দীর্ঘ আট বছরের এই যুদ্ধে ইরান এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, যেখানে তাদের কাছে আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি ছিল প্রকট।
যুদ্ধের শুরুতে ইরাক আকাশপথে আধিপত্য বজায় রাখে। তারা উন্নত গোয়েন্দা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের অবস্থান শনাক্ত করত। এর বিপরীতে ইরানের কাছে সেই সক্ষমতা ছিল না। তখনই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—যদি বড় যুদ্ধবিমান পাঠানো সম্ভব না হয়, তাহলে কি ছোট, দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করা যায় না? এই চিন্তা থেকেই শুরু হয় ড্রোন উন্নয়নের প্রথম ধাপ।
ইসফাহান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাধারণ কর্মশালায় কিছু তরুণ শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলী এই ধারণা বাস্তবে রূপ দিতে কাজ শুরু করেন। তাদের হাতে ছিল সীমিত সম্পদ, কিন্তু ছিল অদম্য ইচ্ছাশক্তি। তারা যেসব প্রাথমিক ড্রোন তৈরি করেছিল, তা দেখতে অনেকটা খেলনার মতো ছিল। জ্বালানি ট্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল চিকিৎসায় ব্যবহৃত ব্যাগ, আর পাখাগুলোও ছিল হাতে তৈরি। প্রথমদিকে সামরিক কর্মকর্তারা এই প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেননি, কেউ কেউ উপহাসও করেছিলেন।
কিন্তু ইতিহাস অনেক সময় এমন জায়গা থেকেই তৈরি হয়, যেখানে কেউ আশা করে না। ১৯৮৩ সালে সেই ‘খেলনা ড্রোন’ প্রথমবারের মতো সফলভাবে শত্রুপক্ষের অবস্থানের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে ছবি সংগ্রহ করে ফিরে আসে। এই ছোট্ট সাফল্যই এক বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। ধীরে ধীরে এই প্রকল্প সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আসে, এবং শুরু হয় পরিকল্পিত ড্রোন কর্মসূচি।
এই উন্নয়নের পেছনে শুধু প্রযুক্তি নয়, কৌশলগত চিন্তাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান বুঝতে পারে, আধুনিক যুদ্ধ শুধু শক্তির নয়, অর্থনীতিরও লড়াই। একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে যেখানে লাখ লাখ ডলার খরচ হয়, সেখানে একটি ড্রোন তৈরি করা যায় অনেক কম খরচে। হয়তো একটি ড্রোন এককভাবে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নির্ভুল নয়, কিন্তু যদি একসঙ্গে শতাধিক ড্রোন পাঠানো যায়, তাহলে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে বাধ্য।
এই ধারণা থেকেই ‘সংখ্যার শক্তি’ কৌশলটি তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১০০টি ড্রোন তৈরি করতে যদি কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হয়, তাহলে সেগুলো ধ্বংস করতে প্রতিপক্ষকে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়। এই অর্থনৈতিক বৈষম্যই ড্রোনকে একটি কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করেছে। এটি শুধু সামরিক নয়, কৌশলগত অর্থনৈতিক চাপও সৃষ্টি করে।
ড্রোনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এগুলো শনাক্ত করা কঠিন। এগুলো কম উচ্চতায় উড়ে, ধীরগতিতে চলে এবং একসঙ্গে অনেকগুলো পাঠানো হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় সব ড্রোন প্রতিহত করা সম্ভব হয় না। এই কৌশলটি বাস্তবে কতটা কার্যকর, তার একটি বড় উদাহরণ হলো আবকাইক-খুরাইস হামলা। সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় এই হামলায় বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, অথচ ব্যবহৃত ড্রোনের খরচ ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বিস্তার। ইরান শুধু নিজেই ড্রোন তৈরি করেনি, বরং তা বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠীর মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি—এই গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত ড্রোনের পেছনেও ইরানের প্রযুক্তিগত প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে ড্রোন শুধু একটি দেশের অস্ত্র নয়, বরং একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক কৌশলে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। এই যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ ১৩৬ ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে দেখানো হয়, কীভাবে একটি তুলনামূলক সস্তা প্রযুক্তি বড় শক্তিগুলোকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কিয়েভের আকাশে এই ড্রোনের উপস্থিতি শুধু সামরিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও সৃষ্টি করে।
ড্রোন প্রযুক্তি আসলে যুদ্ধের একটি নতুন দর্শন তৈরি করেছে। আগে যেখানে যুদ্ধ মানে ছিল বড় অস্ত্র, ভারী সরঞ্জাম এবং বিপুল ব্যয়, এখন সেখানে ছোট, সস্তা এবং দ্রুত উৎপাদনযোগ্য প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখছে। এটি এক ধরনের ‘অসম যুদ্ধ’ কৌশল, যেখানে দুর্বল পক্ষও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি ক্ষমতার ধারণাকেও বদলে দিয়েছে। এখন আর শুধু সামরিক শক্তি নয়, উদ্ভাবন, কৌশল এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশ যদি সীমিত সম্পদ নিয়েও সঠিক কৌশল গ্রহণ করতে পারে, তাহলে সে বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—ইরান তার একটি বড় উদাহরণ।
তবে এই বাস্তবতা যেমন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে। ড্রোন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা মানে হলো, এটি শুধু রাষ্ট্র নয়, বিভিন্ন গোষ্ঠী বা অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির হাতেও চলে যেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ আরও জটিল এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ড্রোন প্রযুক্তি শুধু একটি অস্ত্র নয়; এটি একটি ধারণা, একটি কৌশল, যা আধুনিক যুদ্ধের চেহারা পাল্টে দিয়েছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সীমাবদ্ধতা কখনো কখনো উদ্ভাবনের জন্ম দেয়, আর সেই উদ্ভাবনই একসময় বিশ্বকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
আপনার মতামত জানানঃ