বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে প্রবৃদ্ধির নানা সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখালেও এর আড়ালে যে এক ভয়াবহ আর্থিক রক্তক্ষরণ চলেছে, তার একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে Global Financial Integrity (জিএফআই)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্ক শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের অর্থনীতির গভীরে লুকিয়ে থাকা এক জটিল সমস্যার প্রতিফলন।
প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে—এই তথ্যটি একদিকে যেমন বিস্ময়কর, অন্যদিকে তেমনি উদ্বেগজনক। কারণ এই অর্থ কোনো বৈধ বিনিয়োগ বা আনুষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যাচ্ছে না; বরং বাণিজ্যের কৌশলী কারসাজির মাধ্যমে তা বিদেশে পাচার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সবচেয়ে পরিচিত এই কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং’, অর্থাৎ পণ্যের মূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে কম বা বেশি দেখানো। আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে (ওভার-ইনভয়েসিং) দেশ থেকে অতিরিক্ত ডলার বের করে নেওয়া হয়, আবার রপ্তানির ক্ষেত্রে আয় কম দেখিয়ে (আন্ডার-ইনভয়েসিং) প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে না এনে বিদেশেই রেখে দেওয়া হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই সূক্ষ্মভাবে পরিচালিত হয় যে, সাধারণ পর্যবেক্ষণে তা ধরা কঠিন। কিন্তু জিএফআই বাণিজ্য তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশই এই ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশই প্রকৃত অর্থে স্বচ্ছ নয়। এটি শুধু অর্থ পাচারের পথই তৈরি করছে না, বরং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অর্থ পাচারের একটি বড় অংশ ঘটছে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির মতো বড় খাতগুলো এই প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস, সেটিই যদি অর্থ পাচারের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে তা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাচার হওয়া অর্থের প্রায় ৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে গেছে। অর্থাৎ, শুধু দেশীয় দুর্বলতা নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত ফাঁকফোকরও এই পাচারকে সহজ করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা জোরদার করলেই কি যথেষ্ট, নাকি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জরুরি?
অর্থ পাচারের এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। প্রথমত, এটি দেশের কর রাজস্বে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করছে। যখন পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করা হয়, তখন সরকার সঠিকভাবে শুল্ক ও কর আদায় করতে পারে না। ফলে রাষ্ট্রের আয় কমে যায়, যা সরাসরি জনসেবা ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যখন ডলার বৈধ পথে দেশে আসে না বা অবৈধভাবে বাইরে চলে যায়, তখন দেশের রিজার্ভ কমে যায়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তৃতীয়ত, এটি অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ এই ধরনের পাচার সাধারণত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আর্থিক খাতের বড় খেলোয়াড় এবং প্রশাসনিক ক্ষমতাসীনদের একটি অংশের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। ফলে একদিকে সাধারণ মানুষ কর দিয়ে রাষ্ট্রের বোঝা বহন করে, অন্যদিকে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী অবৈধভাবে সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নেয়।
এর আগে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি শ্বেতপত্রেও আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। সেই হিসাবে বার্ষিক পাচারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এই দুটি প্রতিবেদনের তথ্য একসাথে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, অর্থ পাচার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে তুলনা করলেও দেখা যায়, এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের একার নয়। চীনে এক দশকে প্রায় ৬.৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ডে ১.১৮ ট্রিলিয়ন এবং ভারতে ১.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় এর ওপর প্রভাব অনেক বেশি গভীর। একটি ছোট অর্থনীতির জন্য এই ধরনের অর্থ পাচার উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জিএফআই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শুল্ক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারলে অন্তত কিছুটা হলেও এই অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, শুধু নীতিগত সুপারিশই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এই তিনটি বিষয় যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। একইসঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা, বাণিজ্য তথ্যের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের এই প্রবণতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক নীরব কিন্তু মারাত্মক হুমকি। এটি দৃশ্যমান কোনো সংকটের মতো নয়, কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর এবং ক্ষতিকর। উন্নয়ন, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে এই সমস্যাকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই বিপুল অর্থপাচারের ধারা থামাতে আমরা কতটা আন্তরিক এবং প্রস্তুত?
আপনার মতামত জানানঃ