
দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর বাংলাদেশ এক বিরল ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কেবল ক্ষমতার হাতবদলের মুহূর্ত নয়, বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ—যেখানে গণতন্ত্রকে আবার অর্থবহ, কার্যকর ও টেকসই করে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই সম্ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ। এই অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর ক্ষমতায় যাওয়ার আন্দোলন ছিল না; ছিল এমন একটি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যেখানে জনগণের সম্মতি, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি দীর্ঘদিন ধরে অবমূল্যায়িত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ ও সংস্কার কমিশনের কার্যক্রম গুরুত্ব পায়, কারণ এগুলোর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধ করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে পুনর্গঠন করা। তবে এই আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত ছিল আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন—দায়িত্বশীল, প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর বিরোধী দল ছাড়া সংসদ আদৌ কীভাবে তার সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করবে?
গণতন্ত্রকে প্রায়ই কেবল ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতা সীমিত করার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে গণতন্ত্র হলো ক্ষমতার প্রতিযোগিতাকে নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও নৈতিকতার ভেতরে আবদ্ধ রাখার একটি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় বিরোধী দল কোনো আনুষঙ্গিক বা গৌণ উপাদান নয়; বরং এটি গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতি ও কার্যকারিতা না থাকলে আইনসভা ধীরে ধীরে একটি অনুমোদনযন্ত্রে পরিণত হয়, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সংসদের বাইরে, আর সংসদ কেবল সিল মারা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে আমরা বারবার এই চিত্র দেখেছি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক দশকে সংসদ কার্যত একদলীয় চরিত্র ধারণ করেছে, যেখানে বিরোধী দল ছিল সংখ্যায় দুর্বল, রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক কিংবা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এর ফলে সংসদীয় বিতর্ক, নীতিগত ভিন্নমত ও বিকল্প চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। দায়িত্বশীল বিরোধী দল গড়ে তোলা কেবল বিরোধী দলগুলোর নিজস্ব দায় নয়; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা, শ্রদ্ধা ও জাতীয় স্বার্থে আপস-মীমাংসার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন সুস্পষ্ট, ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ও আইনি কাঠামো, যা বিরোধী দলের অধিকার ও দায়িত্বকে নির্ধারণ করবে। অন্যথায় সংসদের ভেতরের এই শূন্যতার অনিবার্য পরিণতি ঘটে সংসদের বাইরে—রাজপথে, সহিংসতায় ও রাজনৈতিক অচলাবস্থায়।
বাংলাদেশে বিরোধী দল সংসদের বাইরের পথ বেছে নেওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, সংসদে তাদের জন্য অর্থবহ ভূমিকা রাখার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সীমিত ও অনিশ্চিত। বিরোধী দলকে প্রায়ই নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকায় রাখা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের আগে তাদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা হয়নি, সংসদীয় কমিটিতে তাদের ভূমিকা অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণী ফোরামগুলোতে তাদের অবস্থান ছিল প্রান্তিক। অনেক ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে সরকারের ‘দয়া’ বা ‘সৌজন্যের’ ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই সংস্কৃতির শিকড় ঔপনিবেশিক আমলে নিহিত থাকলেও স্বাধীনতার পর তা ভাঙার বদলে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসহযোগের একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংস্কৃতি রয়েছে। বিরোধী দল যখন নিশ্চিত হয় যে সংসদে তাদের বক্তব্য শোনা হবে না, তাদের সংশোধনী প্রস্তাব গুরুত্বসহকারে বিবেচিত হবে না কিংবা সরকারের অন্যায়ের ওপর কার্যকর নজরদারি করার কোনো ক্ষমতা তাদের নেই, তখন তারা সংসদের বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক মঞ্চ খুঁজে নেয়। গণমাধ্যম ও রাজপথ হয়ে ওঠে তাদের প্রধান ক্ষেত্র। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাজপথ গণতন্ত্রের প্রধান অস্ত্র ছিল—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজপথ নিয়মিত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হয়ে উঠলে তা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই দুর্বল করে।
বিশ্বের পরিণত ও স্থিতিশীল গণতন্ত্রগুলো দেখিয়েছে যে দায়িত্বশীল বিরোধী দল আপনা-আপনি গড়ে ওঠে না; এটি গড়ে ওঠে সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে। সেখানে বিরোধী দলের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত, সংরক্ষিত ও নিয়মিত চর্চিত হয়। উদাহরণ হিসেবে ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির কথা বলা যায়, যেখানে বিরোধী দল কেবল সমালোচনার সুযোগই পায় না, বরং ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’র মাধ্যমে বিকল্প সরকার গঠনের অনুশীলন করে। ছায়া মন্ত্রীরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজের পেশাদার পর্যালোচনা করেন, নিয়মিত প্রশ্ন তোলেন এবং নীতিগত বিকল্প হাজির করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর সময় সরকারকে সরাসরি সংসদের মুখোমুখি হতে বাধ্য করে, আর বিরোধী দলের দিন-এর মতো ব্যবস্থা বিরোধীদের উত্থাপিত বিষয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটির সুযোগ নিশ্চিত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক জবাবদিহির কাঠামো। জন হিসাব–সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব প্রধান বিরোধী দলের হাতে থাকা সরকারের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী উপায়। একই সঙ্গে এটি বিরোধী দলকে জাতীয় স্বার্থে দায়িত্বশীল ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করে। গুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদে উত্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো, বিরোধী সদস্যদের বিস্তারিত পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনার একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া বিরোধিতার সংস্কৃতিকে ধ্বংসাত্মক অবস্থান থেকে গঠনমূলক ধারায় রূপান্তরিত করে।
বাংলাদেশে এই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদীয় পরিবেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কেবল বিরোধী দলকে কিছু কমিটিতে সদস্যপদ দেওয়া যথেষ্ট নয়। জনগুরুত্বপূর্ণ কিছু কমিটির নেতৃত্ব নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী বিরোধী দলের কাছে ন্যস্ত করা যেতে পারে। তবে এই অধিকারের সঙ্গে দায়িত্বের বিষয়টি অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। বিরোধী দলকে সংসদীয় নিয়মকানুন ও শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে, কমিটির কাজে পেশাদারত্ব বজায় রাখতে হবে এবং জাতীয় স্বার্থ ও গোপনীয়তা রক্ষা করে গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিতে হবে।
প্রতিটি সংসদীয় অধিবেশনে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর বিরোধী দলের পূর্ণাঙ্গ, অনবরুদ্ধ সমালোচনার জন্য নির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত সময় সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এই সময়ে সরকারি দলের কোনো বাধা বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভয় দেখানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব হবে বিরোধী দলের সমালোচনার প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবন করে যুক্তিগ্রাহ্য ও লিখিত জবাব দেওয়া এবং যুক্তিসংগত প্রস্তাবগুলো সততার সঙ্গে বিবেচনা করা। জাতীয় গুরুত্বের বিষয়ে—যেমন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধন, যুদ্ধ বা শান্তি–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা—বিরোধী দলের সঙ্গে বাধ্যতামূলক, সময়োচিত ও আস্থাভিত্তিক আলোচনার আইনি ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কার আলোচনায় শুধু ক্ষমতার ভারসাম্য বা নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বললে তা অর্ধসত্য থেকে যায়। সমান গুরুত্ব দিয়ে বলতে হবে দায়িত্বের ভারসাম্য ও সংসদীয় সংস্কৃতির রূপান্তরের কথা। একটি কার্যকর সংসদ ও টেকসই গণতন্ত্রের জন্য সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই উপলব্ধি করতে হবে যে তারা একে অপরের প্রতিপক্ষ হলেও রাষ্ট্রের অংশীদার। তাদের চূড়ান্ত জবাবদিহি একই জায়গায়—সার্বভৌম জনগণের কাছে।
বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি কেবল রাস্তায় বিক্ষোভের তীব্রতায় নয়, বরং সংসদে তারা কতটা গভীর ও তথ্যভিত্তিক যুক্তি হাজির করতে পারে তার ওপর নির্ভর করে। জাতীয় সমস্যার জন্য তাদের প্রস্তাবিত বিকল্প নীতি কতটা বাস্তবসম্মত এবং জাতীয় সংকটকালে তারা কতটা দায়িত্বশীল আচরণ করতে পারে—এসবের মাধ্যমেই একটি বিরোধী দলের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। একইভাবে দায়িত্বশীল সরকার বিরোধী দলকে গঠনমূলক বিকল্পের প্রস্তাবক হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করতে পারে, ভয় নয় বরং আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
কার্যকর সংসদ মানে শক্তিশালী সরকার ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের সহাবস্থান। একটিকে দুর্বল করে অন্যটিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা গণতন্ত্র নয়; বরং তা নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদ জন্ম দেয়। এই পারস্পরিকতা যদি বাস্তবে রূপ পায়, সংসদ যদি রাজনৈতিক বিতর্ক, জবাবদিহি ও বিকল্প চিন্তার কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে ২০২৬-এর নির্বাচন কেবল আরেকটি নির্বাচন নয়—তা হবে বাংলাদেশের প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণের সূচনা।
আপনার মতামত জানানঃ