Trial Run

 ঘুষ দিলে ফাইল ছাড়ে!

ছবি : যুগান্তর

সরকারি দপ্তর নিয়ে সাধারণ মানুষেরা একটা বিষয়ে জ্ঞাত আছেন যে, টেবিলের নীচ দিয়ে টাকা দিলে টেবিলের ওপর দিয়ে ফাইল আসে। কিন্তু মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম তাহমির ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। তিনি টেবিলের ওপর দিয়েই ঘুষ নেন, ফাইলও ছাড়েন। অর্থাৎ, বলা চলে, ঘুষ বাণিজ্যের জন্য তিনি চেম্বার খুলে বসেছেন আর সাইনবোর্ড হিসাবে ব্যবহার করছেন উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ।তার এই ঘুষ গ্রহণ রীতিমত চাঁদা গ্রহণের মতোই। সকলকে জানিয়েই তিনি ঘুষ গ্রহণ করে থাকেন। এব্যাপারে তিনি অবশ্য ছাত্রলীগের সাবেক ছাত্র নেতা হিসাবে নিজের ক্ষমতা আরো পোক্ত করে নেন। কেবল সাধারণদেরই যে তিনি ফাইল আটকে ঘুষ নেন, তা নয়। এমনকি  ঘুষ না পেয়ে ইউএনওর ফাইল আটকে রেকর্ড গড়ার ইতিহাসও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। লোকচক্ষুর সম্মুখে বুক সটান করে তিনি এহেন ঘুষ বাণিজ্য করে গেলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও যেন কেউ নেই। তার দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষকসহ পেনশনভোগীরা। নগদ টাকা ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইলই তিনি ছাড় দেন না। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেনশনের টাকা উত্তোলনেও তাকে দিতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় সরকারি কর্মকর্তারা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে বক্তব্য দেন। বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত হলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল হাকিমের রাজনগর উপজেলায় যোগদান করার মাত্র ৬ মাস চলছে। এ অল্প সময়েই তিনি আতঙ্ক হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন সরকারি অফিস ও পেনশনভোগীদের কাছে। বিভিন্ন অজুহাতে আটকে দেন ফাইল। টাকা নেয়ার জন্য ব্যাংকেই বসে থাকে তার লোক। মুজিববর্ষের গৃহনির্মাণের টাকা ছাড় নিতেও দুর্ভোগ পোহাতে হয় সংশ্লিষ্টদের। এতে সরকারি বিভিন্ন কাজ ব্যাহত হয়।

এ নিয়ে গত ২১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় আলোচনা হয়। উপজেলা প্রকৌশলী, কৃষি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা তার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন। মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকারের নেয়া বিভিন্ন প্রকল্প ব্যাহত হচ্ছে বলেও তারা উল্লেখ করেন। ওই সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ১৭ নভেম্বর সিলেট ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস বরাবর চিঠি পাঠান। চিঠিতে উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম তাহমির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের ও অন্যদের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলা হয়।

গত ২৪ নভেম্বর সিলেট কার্যালয়ের নিরীক্ষা ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (প্রশা) নূরুল হক উপজেলা প্রশাসনের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্তকালে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা লিখিত বক্তব্য দেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

তদন্তকালে উপজেলা ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তার বেতনবুকে কাজ করে দেয়ার জন্য ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন তিনি। টাকা দেয়ার পরও তিনি কাজ করতে অনীহা দেখান।

অপরদিকে উপজেলার গড়গাঁও গ্রামের সাবেক কারারক্ষী আব্দুল আহাদের পেনশনের কাজ অনলাইনে করে দেয়ার জন্য তার কাছে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ২৫ হাজার টাকা নিয়ে কাজ করলেও এখন ৫ হাজার টাকার জন্য চাপ দিচ্ছেন। তিনি এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সৈয়দ আব্দুল হাকিম মোবাইল ফোনে বলেন, আমি উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, তার কাছে জানতে পারবেন- বলেই ফোন রেখে দেন। পরে আবারও ফোন করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা পাল বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তির মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায়ও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত হলেও এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আমি জেলা প্রশাসককেও বিষয়টি অবগত করেছি।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম তাহমির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, তা এদেশে নতুন কিছু নয়। সরকারি দপ্তরের প্রত্যাহিক এক চিত্রই। চাকরির বাজারের একটা সাধারণ চিত্র হলো দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তা বাগিয়ে নেওয়া। এর ফলে সৃষ্ট দুর্নীতি অনিয়মেও তার দলীয় প্রভাবটা প্রভাবক হিসাবেই কাজ করে কোনো জবাবদিহিতার প্রশ্ন ছাড়াই। “ঘুষের বিনিময়ে ফাইল নেও” এটাও যে এবারই নতুন ঘটছে তাও নয়। তবে সরকারি পদক্ষেপের অভাবে এসবের দৌরাত্ম্য দিনদিন বেড়েই চলেছে বলে মনে করেন তারা। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রমাণিত ঘুষ গ্রহীতার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কঠিন শাস্তির বিধান কিংবা প্রয়োগ হলে হয়তো রাষ্ট্র থেকে এসব দুর্নীতি কিছুটা কমে আসবে। তবে সামাজিকভাবে ঘুষ গ্রহীতার গ্রহণযোগ্যতা বিনষ্ট করার রেওয়াজটা নেই বলে এবিষয়ে লোকজনেরও তেমন মাথা ব্যথা নেই। বরং অভিভাবকেরা সরকারি চাকরি বলতে বাড়তি আয়ের ব্যাপারটি মাথায় রেখেই সন্তানদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের কথা ভাবেন, এটা প্রচলিত কিন্তু ভয়ানক। এ থেকে আমাদের উত্তরণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

এসডব্লিউ/ডিজে/কেএইচ/ ১২৫৮ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ