Trial Run

সরকার, পুলিশ, আদালত, সাগর-রুনি হত্যার বিচারে ব্যর্থ সবাই

কার কাছে বিচার দাবি করব, প্রশ্ন পরিবারের

গ্রাফিকস: মনসুর আলম।

হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় ৯ বছর হতে চললেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজ পর্যন্ত দাখিল করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। ২২ নভেম্বর ২০২০, আজ রোববার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা না দেয়ায় ঢাকা ম্যাট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজেশ চৌধুরী নতুন এ দিন নির্ধারণ করেন। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ ডিসেম্বর নতুন তারিখ ধার্য করেছেন। এ নিয়ে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ৭৬ বারের মতো পেছাল।

আলোচিত এ হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত আসামী করা হয়েছে রুনির বন্ধু তানভীর রহমানসহ ৮ জনকে। তারা হলেন, বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু ওরফে মাসুম মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ, পলাশ রুদ্র পাল ও আবু সাঈদ। আসামিদের মধ্যে ছয়জন বর্তমানে জেল-হাজতে রয়েছেন। রুনির বন্ধু তানভীর রহমানসহ দুজন জামিনে মুক্ত।

খুনের আলামত ও ধরণ বিশ্লেষণ করে বাহিনীগুলো ধারণা করেছিল, এর সঙ্গে পেশাদার খুনী জড়িত থাকতে পারে। তাছাড়া এ ঘটনার পেছনে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাত থাকার শঙ্কাও প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন সংবাদ ও বিশ্লেষণে। অনুমিত সেসব আসামীদের গ্রেফতারে তদন্ত সংস্থা র‍্যাব এখনো কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। আট বছর পরও এরকম আলোচিত মামলার আসামীরা ধরা না পড়ায় দেশজুড়ে জনগণের মধ্যে বিচারপ্রাপ্তির বিষয়ে হতাশা ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে।

সরকারপ্রধানের দেয়া প্রতিশ্রুতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, র‍্যাব-পুলিশ-ডিবি, নানা ঘাটের জল খেয়ে সাগর-রুনি মামলার তদন্ত এখনো অন্ধকারেই পথ হাতড়াচ্ছে। আদালতে নিয়ম করে নির্দিষ্ট বিরতিতে শুনানি হয়। অগ্রগতি জানতে চাওয়া ও পুনঃতারিখ নির্ধারণের বাইরে আদালত কিছু করেছে, তেমন নজির নেই। দৃশ্যত, এই মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এখন অবধি সরকার, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আদালত, সব পক্ষই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের অব পক্ষের উপর্যুপরি ব্যর্থতায় হতাশ নিহত সাগর-রুনির পরিবার। এদেশে আর বিচারপ্রাপ্তির সম্ভাবনা দেখছেন না তারা। জানতে চাইলে মামলার বাদী রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বলেন, হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে আর কত সময় লাগবে জানি না। কোথাও গেলে বিচার পাব, সেটাও বুঝতে পারছি না। সব জায়গায়ই তো গেলাম, কোনো সম্ভাবনা তো কোথাও দেখছি না। বিচার পাওয়ার আশায় আর কতদিন পথ চেয়ে বসে থাকতে হবে? মামলা তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। লোক দেখানো কাজকর্ম চলছে কিছু। তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার অগ্রগতির বিষয়ে কোনো কিছুই জানান না আমাদের। আমরা বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছি।

তদন্ত সংস্থা র‍্যাবসূত্রে জানা গেছে, সাগর-রুনি হত্যা মামলায় এ বছরের শুরুতে খানিকটা অগ্রগতি ঘটলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে আবার তা পিছিয়ে পড়েছে। সর্বশেষ অগ্রগতি হলো, ডিএনএ পরীক্ষায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাতনামা দুই পুরুষের নমুনা পাওয়া গেছে। তাদের চিহ্নিতের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে মামলার তদন্ত সংস্থা। ওই ল্যাবের ডিএনএ থেকে অপরাধী/জড়িত ব্যক্তির ছবি প্রস্তুতের সক্ষমতা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পূর্বের প্রতিষ্ঠানের গবেষণালব্ধ ফলাফল সমন্বয় করে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ছবি প্রস্তুতের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে ছবি প্রস্তুতের জন্য চার্জ হিসাবে মার্কিন ওই প্রতিষ্ঠানকে ১২০০ ডলার ফি পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে এই প্রক্রিয়ার গতি খুবই শ্লথ।

গত ৫ অক্টোবর ২০২০ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যা’ব ফোর্সেস সদর দফতরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খন্দকার মো. শফিকুল আলম আদালতে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন। তাতে মামলার অগ্রগতির এসব তথ্য জানিয়ে বলা হয়, ‘সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আইএফএস র‌্যাব কর্তৃপক্ষকে উল্লিখিত পরীক্ষার অগ্রগতির বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য ই-মেইল প্রেরণ করেছি। আইএফএস ল্যাব কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে এখনও কোনো মতামত প্রদান করেনি। ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের প্রচেষ্টাসহ মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।’

প্রসঙ্গত ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সারোয়ার ওরফে সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার রুনা ওরফে মেহেরুন রুনি দম্পতি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায় খুন হন। এরপর নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ওই থানার এক এসআই। চারদিন পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুই মাসেরও বেশি সময় তদন্ত করে রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয় ডিবি। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে একই বছরের ১৮ এপ্রিল হত্যা মামলাটির তদন্তভার র‍্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এখন পর্যন্ত এই মামলায় ৭৬ বার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছানো হয়েছে। যা কিনা বিচারের আশাকেই ম্লান করে দিয়েছে। কিন্তু সরকার বা আদালত, কেউই এই মামলার অগ্রগতি সাধনে কার্যকর কিছু করার চেষ্টা করছে কিনা তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমডি শামসুল আলম লিখেছেন, ‘এ সরকার ক্ষমতায় থাকতে সাগর রুনি হত্যার তদন্ত শেষ হবে না। বিচারও হবে না।’

এসডাব্লিউ/আরা/১৪৫০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares