Trial Run

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন, গ্যাঁড়াকলে আওয়ামী লীগ

ছবি: ওয়েবসাইট, আওয়ামী লীগ।

গ্যাঁড়াকলে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন তৃণমূলের রাজনীতিকে সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন দলটির কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা। দাবি উঠেছে, তৃণমূলের নির্বাচন আগের নিয়মে অর্থাৎ নির্দলীয়ই হোক।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা অনেকেই মনে করছেন, এই পদ্ধতিতে নির্বাচন করায় সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অকর্মন্য হয়ে পড়ছে। সাংগঠনিক শক্তির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের পদ্ধতি। প্রতীক দিয়ে জয় নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে মনে করে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক মনোনয়নপ্রত্যাশীরা এখন আর এলাকায় রাজনীতি করেন না, তারা বরং টাকার থলি নিয়ে প্রভাবশালী নেতাদের কাছে ঘুরেফিরে মনোনয়ন নেওয়ার চেষ্টা করেন। কর্মীদের মূল্যায়ন তারা বোঝেন না। ফলে কর্মীরা হতাশায় রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছে।

তবে আওয়ামী লীগ নেতারা দলীয় কর্মীদের ঝিমিয়ে যাওয়ার চেয়েও এই নির্বাচন পদ্ধতির আরেকটি কুফল নিয়ে বেশি চিন্তিত। প্রতীক পেলেই জয় নিশ্চিত, এমন বোধ থেকে ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী ও অপরাধীরা অর্থ ব্যয়ের প্রতিযোগিতায় নামছে এবং মনোনয়নও আদায় করে নিচ্ছে। ত্যাগী নেতাকর্মীরা তাদের মতো লবিং ও প্রচার করে সামনে আসতে পারছে না। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতিনিধিত্ব চলে যাচ্ছে উঁড়ে এসে জুড়ে বসা এই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের হাতে।

তৃণমূলে দলবদলের রাজনীতি খুবই স্বাভাবিক। এটা বন্ধ করা রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন প্রভাবশালীরা সবাই ‘নৌকা’ মার্কার প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। এই সুযোগে দলবদলকারী নেতারা আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছেন। দলের দুর্নাম হয় এমন কাজগুলোও তাদের দ্বারাই বেশি হচ্ছে বলে অভিযোগ। অনুপ্রবেশকারীদের নিয়েই আওয়ামী লীগ বেশি চিন্তিত। দলীয় প্রধান থেকে শুরু করে অনেক কেন্দ্রীয় নেতাই বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন।

রাজনীতি না করেও বাইরের লোক এসে মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছে দেখে রাজনীতির প্রতি খেয়াল নেই তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত হওয়ায় এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য রাখতে চান না কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতারা। তবে অনেকেই স্বীকার করছেন যে, এই পদ্ধতির কারণে রাজনৈতিকভাবে তাদের মাশুল দিতে হচ্ছে।

শুরু থেকেই স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি ডেকে আনছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করে আমাদের তৃণমূল পর্যন্ত মারামারি পৌঁছে গেছে। এর ফলে মনোনয়ন বাণিজ্য এমন পর্যায়ে গেছে যে, জেলা পরিষদ নির্বাচনেও এমন কোনো ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না যে অর্থ ছাড়া ভোট দিয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি কলুষিত হয়ে গেছে। এতে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বহুবার বলেছি। আমাদের কোনো মতামতই সরকার আমলে নেয়নি। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই সরকার এই আইন পরিবর্তন করেছে। কিন্তু সেটা ছিল তাদের ভুল হিসাব।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মারফত জানা যায়, ২০১৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি। বিনা ভোটেই সরকার গঠনের সুযোগ পায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু তারা নির্বাচন করে এবং জাতীয় পার্টিকে বিরোধীদল বানিয়ে ক্ষমতায় বসে। বিএনপি তখন জাতীয় নির্বাচন না করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন করছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনও যদি বিএনপি বর্জন করে তাহলে তাদের দলীয় অস্তিত্ত্বই হুমকির মুখে পড়বে, এমন অনুমান থেকেই কৌশল নির্ধারণ করে আওয়ামী লীগ। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নিয়ম চালু করে তারা চেয়েছিল বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার। কিন্তু যখন তার দেখল বিএনপি তবু নির্বাচনে আসছে তখন কৌশল নেয়া হয় ভোটের বিশাল পার্থক্য নিশ্চিত করে বিএনপিকে অকার্যকর হিসেবে তুলে ধরতে। সেক্ষেত্রে সাফল্য এলেও এখন দেখা যাচ্ছে বাইরে থেকে ঢুকে পড়া লোকদের নিয়ে অস্থির আওয়ামী লীগ।

জানা গেছে, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুযোগ নেয়াসহ বিভিন্নভাবে সারা দেশে অন্য দল থেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের একটি তালিকা এখন রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে। সেখানে তাদের নাম, কোন দল থেকে অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং দলের কারা অনুপ্রবেশকারীদের সহযোগিতা করেছেন তার বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। তবে শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে, এমন কোনো ইঙ্গিত মেলেনি।

এদিকে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন তৃণমূলে দলকে সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারাও। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ২০১৫ সালে যখন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন থেকেই বিএনপি এর বিরোধিতা করে আসছে। কিন্তু সরকার ও ইসি আমাদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেয়নি। প্রথমে এর বিরোধিতা করলেও তৃণমূল যাতে হাতছাড়া না হয় সেজন্য দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসছে বিএনপি। তবে এখন সরকার যদি মনে করে এটা পরিবর্তন করা দরকার তাহলে ভালো হবে। আমরা মনে করব সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন উন্মুক্তভাবে হওয়ার বিধান বাতিল করে বর্তমান সরকার দলীয় প্রতীকে তা সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন শুরু করে ক্ষমতাসীনরা। এরপর পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পর্যন্ত দলীয় প্রতীক দিয়ে হয়।

টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলাম জোয়াহের জানান, প্রতীক দিয়ে নির্বাচন যখন থেকে শুরু হয়, তখন থেকে তৃণমূলের রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যখন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা তার বাইরে যাওয়ার ধৃষ্টতা দেখাতে পারি না। এ নিয়ে সিদ্ধান্ত জাতীয় নেতারাই নেবেন।

দলটির সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেন, রাজনৈতিক কোনো অবদান না থাকার পরও অনেকেই মনোনয়ন পেয়ে যাওয়ার কারণে রাজনীতি করা নেতারা হতাশায় ঘরে উঠে গেছেন। প্রতীকে নির্বাচন হওয়ার আইন চালু হওয়ার পর থেকে তৃণমূলের রাজনীতিতে দুর্নীতিও বেড়েছে। দলীয় নেতারা দলীয় রাজনীতির চেয়ে টাকা আয়ের পেছনেই বেশি ছোটেন। কারণ তারা ভালো করেই জানেন টাকা থাকলে নেতাও হওয়া য়ায় এবং জনপ্রতিনিধিও। তৃণমূলে রাজনীতিতে সংগঠনের জন্য সময় না দিয়ে টাকার পেছনে ছোটার এটাও অন্যতম কারণ।

কেন্দ্রীয় কমিটির অপর এক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় বিভিন্ন স্তরে জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রায় ২৮ ভাগ অনুপ্রবেশকারী এখন আওয়ামী লীগে। এদের ভালো কাজগুলো যেমন আওয়ামী লীগের কাঁধে আসে, তেমনি খারাপ কর্মের দায়ও আওয়ামী লীগের ওপর বর্তায়। দলীয় প্রতীকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন হওয়ায় এ ক্ষতিগুলো হয়েছে। এসব ব্যাপারগুলো ঠিক করতে হলে বিকল্প ভাবতে হবে দলকে।

মিই/আরা/১৭২০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares