Trial Run

মনগড়া জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয় মিন্নি

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়া নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। গত বুধবার দেওয়া ওই রায়ে আদালত বলেছে, মিন্নি যে তার স্বামীকে হত্যার ‘ষড়যন্ত্রে’ যুক্ত ছিলেন প্রসিকিউশন তা ‘প্রমাণ করতে পেরেছে’। তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলছেন, তার মেয়েকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র পুলিশের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে। আর বরগুনার পুলিশ পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে মিন্নিকে রিমান্ডে নিয়ে চোখ বেঁধে নির্যাতন করে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে। এমনকি পুলিশের সরবরাহ করা মনগড়া লিখিত বক্তব্য সংশ্লিষ্ট আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মিন্নির জবানবন্দি হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন বলেও অভিযোগ করেছেন মোজাম্মেল। আর এর সবকিছু তিনি মেয়ের দেওয়া বর্ণনা থেকে জানতে পেরেছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

মোজাম্মেল হোসেন কিশোর গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিন্নিকে রিমান্ডের নামে পুলিশ লাইনে নিয়ে চোখ বেঁধে নির্যাতন করেছিল পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান এবং তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন মিন্নির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে।’ তিনি বলেন, ‘মিন্নিকে উচ্চ আদালত থেকে জামিন দিয়ে বিচারক জামিনে থাকাকালীন গণমাধ্যমে কোনো ধরনের কথা না বলার যে শর্ত দিয়েছিল, সেই কারণেই এসব বিষয় আমরা গণমাধ্যমে বলতে পারিনি। কীভাবে আমার মেয়েকে নির্যাতন করা হয়েছে, জামিনের পূর্বে আদালতে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছে, আদালতে মিন্নি কী বলেছে, এসব বক্তব্যই মিন্নি আমাদেরকে বলেছে। কিন্তু আমরা আইনের প্রতি সম্মান জানিয়ে এতদিন কিছুই বলিনি।’

শুধুমাত্র পুলিশের ‘মিথ্যা’ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মিন্নিকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে দাবি করে তার বাবা বলেন, ‘আসামি শনাক্তকরণের কথা বলে আমার মেয়েকে বাড়ি থেকে নিয়ে যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান। এ সময় মিন্নিকে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। চোখ বেঁধে শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে পেটানো হয়, অশালীন ভাষায় গালি দেওয়া হয়। পানি পান করতে চাইলে পানি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।’ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান ও তদন্তকারী কর্মকর্তা ছাড়াও সাদা পোশাকের কয়েকজন মিন্নিকে নির্যাতন করেছে বলে মিন্নির বরাত দিয়ে জানান মোজাম্মেল।

মেয়ের বরাতে নির্যাতনের অভিযোগ বাবার

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ পুলিশের মতো করে একটি মনগড়া লিখিত বক্তব্য মিন্নিকে দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়ায়। সেই বক্তব্য ম্যাজিস্ট্রেট লিপিবদ্ধ করে তাতে মিন্নির স্বাক্ষর নেয়। আর আবার রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে মিন্নিকে লিখিত ওই বক্তব্য ম্যাজিস্ট্রেটকে দিতে বাধ্য করায় পুলিশ।’ সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট মিন্নির কোনো বক্তব্য আমলে নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন মোজাম্মেল। মিন্নি মনগড়া জবানবন্দি না দিলে তখন তার বাবা, মা ও ভাইকে ধরে এনে পুলিশ নির্যাতনের ভয় দেখিয়েছিল উল্লেখ করে মোজাম্মেল বলেন, ‘এসব কারণে মিন্নি আমাদের ভালোর কথা চিন্তা করে পুলিশের কথা মেনে নিতে বাধ্য হয়।’

মিন্নিকে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বরগুনার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার-ডিএসবি, বরিশাল) মো. শাহজাহান হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত ইতিমধ্যে এই মামলার রায় ঘোষণা করেছে। তাই এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

অন্যদিকে মিন্নির বাবার করা অভিযোগের বিষয়ে জানতে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি।

গত বছরের ২৬ জুন বরগুনা জেলা শহরের কলেজ রোডে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাতকে। ওই ঘটনার একটি রোমহর্ষক ভিডিও ক্লিপ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, দুই যুবক রামদা হাতে রিফাতকে একের পর এক আঘাত করে চলেছে। আর স্ত্রী মিন্নি স্বামী রিফাতকে বাঁচাতে হামলাকারীদের নিবৃত্ত করতে ‘প্রাণপণ’ চেষ্টা করছেন। ঘটনাস্থল থেকে মুমূর্ষু স্বামীকে হাসপাতালেও নিয়ে যান মিন্নি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন বিকেলেই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান রিফাত। ওই ঘটনায় ‘জীবনের ঝুঁকি’ নিয়ে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র ‘সাহসী স্ত্রী’ হিসেবে প্রশংসিত হন মিন্নি।

রিফাতের ওপর হামলার পরদিন তার বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় মিন্নিকে এক নম্বর সাক্ষী করা হয়। রিফাত হত্যার পর বরগুনা শহরে ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ দৌরাত্ম্যের বিষয়টি প্রকাশ পায়। তাদের নেপথ্যে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে রিফাত হত্যার কারণ নিয়ে নানারকমের আলোচনা শুরু হয়। এরই মধ্যে গত বছর ২ জুলাই মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এর পরপরই মিন্নির শ্বশুর আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ হত্যাকাণ্ডে তার পুত্রবধূ মিন্নির জড়িত থাকার অভিযোগ তুললে আলোচনা নতুন মোড় নেয়। ১৬ জুলাই মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে সেদিন রাতে তাকে রিফাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন আদালতে হাজির করা হলে বিচারক মিন্নিকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান। কিন্তু মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী সেদিন আদালতে দাঁড়াননি। স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনীতিকের নির্দেশনার কারণে কোনো আইনজীবী মিন্নির পক্ষে সেদিন আদালতে ছিলেন না বলে অভিযোগ ওঠে। পাঁচ দিনের রিমান্ডের তৃতীয় দিনেই মিন্নিকে আদালতে হাজির করে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিন্নি বিচারকের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অবশ্য তার আগের দিনই পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘মিন্নি হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং হত্যা পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে মিন্নির যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।’

তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর তখন অভিযোগ করেন, ‘নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে’ মিন্নিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের হাত আছে বলেও তিনি দাবি করেন। এভাবেই সাক্ষী থেকে আসামি বনে যান মিন্নি। পরে ২৯ আগস্ট হাইকোর্ট মিন্নির জামিন মঞ্জুর করে। তবে শর্ত দেওয়া হয়, জামিনে থাকা অবস্থায় তিনি তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের জিম্মায় থাকবেন। আর এ সময়ে মিন্নি গণমাধ্যমের সামনে কোনো কথা বলতে পারবেন না। মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী আসলামের জিম্মায় জামিনে ছিলেন মিন্নি। মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে আবারও কারাগারে পাঠানো হয় মিন্নিকে। রায় ঘোষণার পর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে আমার মেয়েকে সাক্ষী থেকে আসামি করা হয়েছে। সারা দেশের মানুষ দেখেছে আমার মেয়ে মিন্নি কীভাবে তার স্বামী রিফাত শরীফকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন। মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই মিন্নিকে এখানে আসামি করা হয়েছিল। আজ রায়ের মাধ্যমে সেই প্রভাবশালী মহলেরই জয় হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •