Trial Run

নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত হয় না, তবুও ‘আরটি পিসিআরে’ চলছে করোনা পরীক্ষা!

শুভ্র সরকার : বছরের শুরু থেকে বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। বাড়ছে মৃত্যু। গত শুক্রবার করোনা মহামারিতে প্রথমবারের মতো দেশে একদিনে শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। দেশ জুড়ে চলছে এখন লকডাউন। করোনার এই বিপর্যয়ের দায়ভার সরকার যেমন এড়াতে পারবে না, তেমনই সাধারণ মানুষের অসচেতনতাও গা ঝেড়ে ফেলতে পারবে না করোনায় বিপর্যস্ত এই পরিস্থিতিকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে দেশে করোনার নতুন ধরন বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণ হিসেবে করোনার পরিবর্তিত রূপ, যাকে ‘ইউকে স্ট্রেইন’ বলা হচ্ছে, যা বিদ্যমান করোনার ধরনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সংক্রামক ও ক্ষতিকারক। আর তার সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের নতুন ভ্যারিয়েন্ট। বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ ভাইরাসের অনেক জেনেটিক ভ্যারিয়েন্ট বা জিনগত ধরনের মধ্যে তিনটি যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রাজিলীয় ধরনকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আরটি পিসিআর: কোভিড নেগেটিভ হলেও স্বস্তি নেই

ভাইরোলজিস্টদের মতে, ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনে এই পরিবর্তন আসার কারণে তা নির্ণয় করতে প্রয়োজনীয় প্রাইমারের নকশা পরিবর্তন করতে হবে শীঘ্রই। কারণ, বর্তমানে ব্যবহৃত যে প্রাইমার রয়েছে, তা দ্বারা ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায় না। এর ফলে নতুন আক্রান্ত রোগীদের আরটি পিসিআর পরীক্ষার ফল নেতিবাচক (নেগেটিভ) হলেও বুকের এক্স-রে করে দেখা যায়, ফুসফুসের অনেকাংশই সংক্রমিত হয়েছে। এ কারণে এখন পিসিআর পরীক্ষায় কোভিড নেগেটিভ হলেই আর নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে চলমান আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন শনাক্তের সুযোগ বা সক্ষমতাও নেই। দেশে আরটি-পিসিআরে টু-জিন (দুইটি জিন) পরীক্ষা করা হচ্ছে। বর্তমানে যে আরটি-পিসিআর ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটাতে সবগুলো মিউটেশন বা পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমাদের যেভাবে পরীক্ষা হচ্ছে, সেভাবে নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম।

পিসিআর বলতে পলিমারেজ চেইন বিক্রিয়া বোঝায়, যা ভাইরাসের জিন বা জিনোম সম্প্রসারণের সঙ্গে জড়িত। সার্স-কোভিড-২ একটি আরএনএ ভাইরাস, যা ডিএনএতে বিপরীতভাবে প্রতিলিপি হয় এবং তারপরে প্রাইমার নামের রিএজেন্ট ব্যবহার করে প্রসারণ করা হয়। প্রাইমারগুলো নির্দিষ্ট জিনোম ক্রমের জন্য নির্দিষ্ট। যদি এই প্রাইমারের সঙ্গে সামঞ্জস্য অনুক্রমের কোনো রূপান্তর ঘটে, তবে আরটি পিসিআর পদ্ধতিটি কাজ করবে না।

যদিও ভাইরোলজিস্টরা জানান, পিসিআর পদ্ধতিটি এখনো নতুন স্ট্রেইনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তার জন্য পরিবর্তিত অনুক্রমের জন্য আমাদের নতুন প্রাইমারের নকশা করা দরকার। তবে নতুন স্ট্রেইনের জন্য আমাদের ‘থ্রি-জিন টার্গেট’ পিসিআরের মতো শক্তিশালী পদ্ধতি শুরু করতে হবে।

‘থ্রি-জিন’ পরীক্ষার বিকল্প নেই

কোভিড-১৯ টেস্টগুলোর যথার্থতা সম্পর্কিত বিশ্বব্যাপী তথ্যের পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, ভুল নেগেটিভ রেজাল্টের হার ২% থেকে ২৯% এর মধ্যে রয়েছে। এছাড়া, পিসিআর টেস্টিংয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা (কোভিড-১৯ সনাক্তকরণের জন্য একই ধরণের পরীক্ষা) প্রায় ২% এর মতো গড় ভুল পজিটিভ হার নির্দেশ করে। এছাড়া নতুন স্ট্রেইনের ক্ষেত্রে আরটি পিসিআরে করোনা শনাক্তের ক্ষেত্রে সংশয় প্রকৃত শনাক্তের সংখ্যা নিয়ে সংশয় তৈরি করছে। সেই সাথে ভয়াবহ হারে বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। মৃত্যুহার পার হয়ে গেছে একশ’র ঘর।

সূত্র মতে, দুই সপ্তাহেই মৃত্যুর হার এক লাফে ৪৭ দশমিক পাঁচ শতাংশ বেড়েছে। এবছরের মার্চে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৩৮ জন। এপ্রিলের ১৫ তারিখ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৯৪১ জনের। গত বছরের ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল মাসের সঙ্গে এ বছরের একই সময়ের তুলনা করে দেখা গেছে, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে কেউ মারা যায়নি, মার্চে পাঁচজন আর এপ্রিলে ১৬৩ জন মারা গেছেন। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি, মার্চ এবং এপ্রিল  মাসে মারা গেছেন যথাক্রমে ২৮১, ৬৩৮ এবং ৯৪১ জন। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকে আইসোলেট করতে হবে। বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণের অঞ্চলভিত্তিক বিভাজন করে, কম সংক্রমিত এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। আর এই দ্রুত ও নির্ভুল শনাক্তের জন্য ‘থ্রি-জিন’ পরীক্ষার বিকল্প নেই।

অধ্যাপক ডা. একে আজাদ খান বলেন, নতুন স্ট্রেইন আগেরটার চেয়ে আরও দ্রুত ছড়ায়। কিন্তু, কতজন নতুন স্ট্রেইনে আক্রান্ত হচ্ছে, সেই পরিসংখ্যান আমাদের নেই। সেটা জানাটাও দরকার। জনসংখ্যা বিবেচনায় আমাদের দেশ তো ছোট না। আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভ্যাকসিন উৎপাদন খুব কঠিন কিছু তো না। সেই সক্ষমতাও আমাদের অর্জন করতে হবে। তারপর নতুন স্ট্রেইন শনাক্তে থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করা দরকার। যেসব স্ট্রেইন ইতোমধ্যে শনাক্ত হয়েছে, সঠিক রিঅ্যাজেন্টের মাধ্যমে পিসিআর পরীক্ষা করলে তো সেগুলো পাওয়া যাবে।

ভাইরোলজিস্টদের মতে, নতুন স্ট্রেইনের শনাক্তের জন্যে ‘থ্রি-জিন’ (তিনটি জিন এক সঙ্গে) পরীক্ষা করতে হবে। এই থ্রি-জিনের একটি জিন ‘এস-জিন’, যা স্পাইক প্রোটিনকে সনাক্ত করে। বাকি দুটো জিন হচ্ছে ওআরএফ-১এবি এবং এন-জিন। বাংলাদেশের আরটি পিসিআরে থ্রি জিন পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত করা যাবে না। এখন বাংলাদেশেকে জরুরি ভিত্তিতে থ্রি জিন পরীক্ষার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

প্রতি ১০০টি কোভিড-১৯ পরীক্ষার কমপক্ষে পাঁচটি সিকোয়েন্সিং করতে হবে। এটা করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন স্ট্রেইন শনাক্তে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনে প্রথমে থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর স্ক্রিনিং ও পরে ভাইরাসের সিকোয়েন্সিং করা হয়েছে। ‘থ্রি জিন’ আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় দেখা গেছে ‘যেসব নমুনায় এস-জিন নেগেটিভ আসছে এবং বাকি দুটো জিন পজিটিভ আসছে, সেসব নমুনা সিকোয়েন্সিং করে ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই নতুন স্ট্রেইন ভাইরাসটি পাওয়া যাচ্ছে।

জিনোম সিকোয়েন্স বা জিন–নকশা বের করে ভাইরাসের জেনোমিক ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করা সম্ভব। তবে একটি নমুনা থেকে নতুন স্ট্রেইনের জিনোম সিকোয়েন্স করতে ১০ দিনের মতো সময় লেগে যায়। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে করোনায় আক্রান্ত লাখ লাখ নমুনা থেকে জিনোম সিকোয়েন্সিং সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। নমুনা শনাক্তের পাশাপাশি যদি একসঙ্গে ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তবে এর বিস্তার রোধ করা সম্ভব।

ট্রিপল জিন সার্স কোভিড-২ পিসিআর কিট’ দিয়ে দ্রুত সময়ে নিরীক্ষণ সম্ভব। পরবর্তীকালো এসব রোগীর জিনোম সিকোয়েন্সও করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর পরীক্ষা নির্দিষ্টভাবে নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত করে। থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর পরীক্ষার জন্যে বাজারে স্বনামধন্য কোম্পানির কিটও অ্যাভেইলেভল আছে। যুক্তরাজ্যে নতুন ধরন যে এত শনাক্ত হয়েছে, এই থ্রি-জিন পরীক্ষার মাধ্যমেই হয়েছে। বাংলাদেশেও অনতিবিলম্বে এই কিট দিয়ে পরীক্ষা চালু করা দরকার। অন্যথায় কতজন ইউকে স্ট্রেইনে আক্রান্ত হয়েছেন, সেটা জানা যাবে না। প্রতিদিন হাজারো নমুনা জিনোম সিকোয়েন্সিং করার সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। সহজ উপায় হচ্ছে এই থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর পরীক্ষা।

এসডব্লিউ/২১১৫


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ