বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে নতুন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত আইনে কোনো কনটেন্টকে অবৈধ বলে সরকারি নোটিশ দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেটি সরিয়ে ফেলতে হবে। আর ডিপফেক পর্নোগ্রাফি কিংবা শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত কনটেন্টের ক্ষেত্রে অভিযোগ বা নোটিশ পাওয়ার পর সময়সীমা হবে মাত্র ১২ ঘণ্টা। সরকারের যুক্তি, অনলাইনে অপরাধ, অপপ্রচার, মানহানি ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনের বিস্তৃত ক্ষমতা, অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং স্বাধীন নজরদারির অভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও ডিজিটাল অধিকার বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে তৈরি হতে যাওয়া আইনটি শেষ পর্যন্ত বৈধ মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক সমালোচনা ও ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
নেত্র নিউজের হাতে আসা একটি খসড়া নথির বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আইনের নাম ‘সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়ারি অ্যাক্ট, ২০২৬’। এটি বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে তৈরি প্রথম বিশেষায়িত আইন হতে যাচ্ছে। খসড়াটি কার্যকর হলে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নতুন দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। শুধু ব্যবহারকারীদের পোস্ট নিয়ন্ত্রণ নয়, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় কার্যালয় স্থাপন, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার ব্যবস্থাও প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার বিধান। খসড়ায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কিংবা জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত কনটেন্ট সরানোর নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া প্রচলিত কোনো আইন লঙ্ঘন করে, আদালত বা আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ ঘোষিত কিংবা জাতিগত সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে—এমন কনটেন্টও অপসারণের আওতায় আসবে। কপিরাইট লঙ্ঘন, পরিচয় জালিয়াতি, শিশুদের যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত উপাদান এবং প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি ঠেকাতেও প্ল্যাটফর্মগুলোকে যুক্তিসংগত পদক্ষেপ নিতে হবে।
শুনতে এসব বিধানের অনেকগুলোই যৌক্তিক মনে হতে পারে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দিয়ে হয়রানি, পরিচয় চুরি, শিশুদের যৌন শোষণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বাস্তব সমস্যা। ভুক্তভোগীদের দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি। কিন্তু সমস্যা তৈরি হচ্ছে ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’, ‘জনশৃঙ্খলা’ কিংবা ‘বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের’ মতো শব্দের বিস্তৃত ব্যাখ্যা নিয়ে। এসব শব্দের সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা না থাকলে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে বৈধ বক্তব্যও নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
খসড়ায় ব্যঙ্গাত্মক কিন্তু অশ্লীল নয়—এমন কনটেন্ট, গঠনমূলক রাজনৈতিক সমালোচনা, ভিন্নমত এবং রাষ্ট্রীয় নীতির যৌক্তিক বিশ্লেষণকে ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ছাড়ের ভাষা কতটা স্পষ্ট, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির গবেষক রিহাব মাহামুরের মতে, রাজনৈতিক সমালোচনা ও নীতির বিশ্লেষণকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দগুলো যথেষ্ট নির্দিষ্ট নয়। ফলে কোন বক্তব্য গঠনমূলক, কোনটি যৌক্তিক আর কোনটি নিষিদ্ধ—তা নির্ধারণের ক্ষমতা কার্যত কর্তৃপক্ষের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার ক্ষেত্রে যে স্পষ্টতা ও আইনগত নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন, খসড়ার ভাষা তা নিশ্চিত করতে পারছে না বলে তাঁর উদ্বেগ।
টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ প্রধান ফওজিয়া আফরোজও খসড়াটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, নথিটি এখনো অসম্পূর্ণ এবং এর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত। তবে প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে, অথচ স্বাধীন নজরদারির ব্যবস্থা স্পষ্ট নয়। তাঁর আশঙ্কা, এ ধরনের কাঠামোতে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খসড়ায় পাঁচটি নির্বাহী সংস্থা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আদালতকেও কনটেন্ট অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসি। সাধারণ ক্ষেত্রে নোটিশ পাওয়ার পর প্ল্যাটফর্মগুলোকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে শিশুদের যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত উপাদান কিংবা ডিপফেক পর্নোগ্রাফির মতো কনটেন্টের ক্ষেত্রে ১২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এখানেই বড় প্রশ্ন হলো, কোনো কনটেন্ট সত্যিই অবৈধ কি না, তা নির্ধারণের আগে স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে কি না। ফওজিয়া আফরোজের বক্তব্য অনুযায়ী, খসড়ায় কনটেন্ট সরানোর আগে স্বাধীন পর্যালোচনার কোনো স্পষ্ট ব্যবস্থা নেই। এমনকি সরকার কী কারণে কোনো কনটেন্ট সরানোর নির্দেশ দিয়েছে, সেই নির্দেশের হিসাব বা তথ্য প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতাও যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। ফলে কোনো সাংবাদিক, নাগরিক, রাজনৈতিক কর্মী কিংবা সাধারণ ব্যবহারকারীর পোস্ট সরিয়ে দেওয়া হলে তিনি কীভাবে জানতে পারবেন সিদ্ধান্তটি কেন নেওয়া হলো, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক রিহাব মাহামুরের আশঙ্কা, খসড়ার একটি ধারা প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিজেদের ‘প্রকৃত জ্ঞান’ অথবা সরকারি নোটিশের ভিত্তিতে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত কনটেন্ট সরাতে বাধ্য করবে। কিন্তু অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কের সংজ্ঞা যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে প্ল্যাটফর্মগুলো ঝুঁকি এড়াতে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, কোনো পোস্ট সরাসরি আইন ভঙ্গ না করলেও সেটি নিয়ে অভিযোগ উঠলে প্ল্যাটফর্ম হয়তো দ্রুত সরিয়ে ফেলবে। এতে বৈধ বক্তব্যও সেন্সরশিপের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত আইনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা নিয়েও নতুন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সাধারণভাবে ব্যবহারকারীদের প্রকাশিত কনটেন্টের জন্য প্ল্যাটফর্মগুলোকে কিছু শর্তসাপেক্ষ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে। কিন্তু সরকারি নির্দেশ পাওয়ার পর অবৈধ কনটেন্ট সরানোসহ নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলে তারা সেই সুরক্ষা হারাতে পারে। অর্থাৎ, ব্যবহারকারীর প্রকাশিত বক্তব্যের দায় থেকে প্রতিষ্ঠানকে যে সুরক্ষা দেওয়া হয়, তা সরকারি নির্দেশ মেনে চলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থা প্ল্যাটফর্মগুলোকে আইনি ঝুঁকি এড়াতে বিতর্কিত বা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পোস্টও সরিয়ে ফেলতে উৎসাহিত করবে।
খসড়ায় অবশ্য ব্যবহারকারীদের কিছু অধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। কোনো কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা হলে ব্যবহারকারীকে তার কারণ জানাতে হবে। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ বা মডারেশনের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের ক্ষেত্রে লেবেল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার কথাও রয়েছে। কিন্তু কে এই লেবেল দেবে, কীভাবে এআই-নির্মিত কনটেন্ট শনাক্ত করা হবে কিংবা কেউ লেবেল সরিয়ে ফেললে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে খসড়ায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। ফলে বিধান থাকলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও জবাবদিহি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এই আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে স্থানীয় কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব। খসড়ায় যেসব প্ল্যাটফর্মের বাংলাদেশে নিবন্ধিত মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা অন্তত ১০ লাখ, তাদের ‘গুরুত্বপূর্ণ’ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে একটি লিয়াজোঁ অফিস বা স্থানীয় কার্যালয় স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ তৈরি করতে হবে—প্রধান কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নোডাল কর্মকর্তা এবং ব্যবহারকারীদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় অভিযোগ কর্মকর্তা।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এবং সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য একটি দল রাখার বাধ্যবাধকতাও প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট ব্যক্তিরা সরকার গঠিত ‘গ্রিভ্যান্স অ্যাপিলেট কমিটি’তে আপিল করতে পারবেন। অভিযোগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলেও এই কমিটিতে যাওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে এই কমিটির স্বাধীনতা, গঠনপ্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পরবর্তী প্রতিকারের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাংলাদেশের আইনটির সঙ্গে ভারতের ২০২১ সালের ‘ইনফরমেশন টেকনোলজি (ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইনস অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া এথিকস কোড) রুলস’-এর বেশ কিছু মিল রয়েছে। ভারতের নিয়মেও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের খসড়াতেও প্রায় একই ধরনের কাঠামো অনুসরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ভারতের অভিজ্ঞতা অবশ্য এ ধরনের ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ভারতের সরকারি সংস্থাগুলো ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ইউটিউবের কাছে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার কনটেন্ট ব্লক করার নির্দেশ পাঠিয়েছে বলে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৬৮ সেকেন্ডে একটি নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে দ্য হিন্দুর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন সাইবার অপরাধ সমন্বয়কারী সংস্থার এক বছরে এক্সকে পাঠানো অপসারণের নোটিশের প্রায় ৩০ শতাংশই মন্ত্রী বা সরকারি সংস্থাসংক্রান্ত পোস্ট নিয়ে ছিল। এসব পরিসংখ্যান দেখায়, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বিস্তৃত হলে তা কেবল অপরাধমূলক উপাদান সরানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বাংলাদেশে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন সাইবার নিরাপত্তা আইনেও পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। নেত্র নিউজ এর আগে জানিয়েছিল, প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে যাচাই না করা তথ্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের সম্ভাব্য পরিবর্তন একসঙ্গে কার্যকর হলে অনলাইন বক্তব্যের ওপর নিয়ন্ত্রণের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
খসড়াটি তৈরির দায়িত্ব তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ এ ধরনের আইন প্রণয়নে সাধারণত তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ বা আইসিটি বিভাগের ভূমিকা থাকার কথা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিটি বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা খসড়াটি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং মন্ত্রণালয়ে আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী আবদুল মোমেন জানিয়েছেন, আইনটি প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এটি কবে চূড়ান্ত হবে বা কবে কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি। কর্মকর্তারা তখনো খসড়াটি পর্যালোচনা করছিলেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বৈঠকের পরিকল্পনা ছিল। বিটিআরসির কর্মকর্তা তারেক হাসান সিদ্দিকীও প্রস্তাবটির বিষয়ে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন।
খসড়াটির প্রাথমিক সংস্করণ তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ। তাঁর ভাষ্য, অনলাইনে অবৈধ কনটেন্ট, মানহানি ও ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, কনটেন্ট তদারকির দায়িত্ব তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকতে পারে, যেমন চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্র সনদসংক্রান্ত বিষয়গুলো এই মন্ত্রণালয় দেখভাল করে। তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন হলো, কনটেন্ট তদারকির দায়িত্ব থাকলেই কি নির্বাহী বিভাগকে স্বাধীন পর্যালোচনা ছাড়াই বক্তব্য সরানোর ক্ষমতা দেওয়া উচিত?
ফওজিয়া আফরোজের মতে, সরকারের উচিত খসড়াটি পুনর্বিবেচনা করা এবং আইন চূড়ান্ত করার আগে অর্থবহ জনপরামর্শের আয়োজন করা। স্বাধীন বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক এবং ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু বিনোদন বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের জায়গা নয়; এটি সংবাদ প্রকাশ, রাজনৈতিক বিতর্ক, নাগরিক প্রতিবাদ, ব্যবসা, শিক্ষা এবং জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
অনলাইনে অপরাধ দমন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিশুদের সুরক্ষা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি বন্ধ এবং প্রতারণা প্রতিরোধে কার্যকর আইন থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপরাধ ও মতপ্রকাশের পার্থক্য স্পষ্ট করতে হবে। রাষ্ট্রের সমালোচনা, নীতির বিরোধিতা কিংবা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলাকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে কনটেন্ট সরানোর নির্দেশের কারণ প্রকাশ, স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনা, আপিলের কার্যকর সুযোগ এবং সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আইন এখনো খসড়া পর্যায়ে। ফলে এর চূড়ান্ত রূপ কী হবে, তা নিশ্চিত নয়। তবে যে প্রশ্নগুলো ইতিমধ্যে সামনে এসেছে, সেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কনটেন্ট সরানোর বিধান হয়তো ক্ষতিকর উপাদান দ্রুত নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু যথাযথ সুরক্ষা না থাকলে একই বিধান নাগরিকের কণ্ঠরোধের ঝুঁকিও তৈরি করবে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থাও অপরিহার্য। শেষ পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অনলাইন নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো নয়, বরং দুটিকে একসঙ্গে সুরক্ষিত রাখাই হওয়া উচিত যেকোনো নতুন আইনের প্রধান লক্ষ্য।
আপনার মতামত জানানঃ