
চারপাশে অনেক মানুষ। কর্মস্থলে কথাবার্তা হয়, ফোনে বার্তা আসে, সামাজিক মাধ্যমেও যোগাযোগ আছে। তবু একজন মানুষ অনুভব করতে পারেন, তাঁর কথা কোথাও পৌঁছায় না; নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখার মতো কাউকে পান না; সমাজে তাঁর উপস্থিতির কোনো অর্থ নেই।
এই অভিজ্ঞতাকে কেবল ব্যক্তিগত মনখারাপের ভাষায় বোঝা যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক চিন্তাবিদ হান্না আরেন্ট প্রশ্ন করেছিলেন, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও অভিন্ন জগৎ ক্ষয়ে গেলে ক্ষমতার ধরন কীভাবে বদলায়।
তাঁর দ্য অরিজিনস অব টোটালিটারিয়ানিজম-এর ‘আইডিওলজি অ্যান্ড টেরর’ অধ্যায়ে একাকিত্ব এমন এক অভিজ্ঞতা, যার রাজনৈতিক ব্যবহার সম্ভব। তবে ‘একাকী হলেই মানুষ স্বৈরতন্ত্র চায়’—এমন সরল সূত্র তাঁর আলোচনা থেকে তৈরি করা যায় না।
শিরোনামে কর্তৃত্ববাদ শব্দটি বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হলেও আরেন্টের নির্দিষ্ট অনুসন্ধান ছিল সর্বাত্মক শাসন বা টোটালিটারিয়ানিজম নিয়ে। সব দমনমূলক সরকার তাঁর সংজ্ঞায় একই ধরনের শাসন নয়। নাৎসি জার্মানি ও স্তালিনীয় শাসন নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণকে বর্তমানের যেকোনো অপছন্দের সরকারের ওপর সরাসরি বসিয়ে দিলে ধারণাটির নির্দিষ্টতা হারায়।
একা থাকা, বিচ্ছিন্ন থাকা ও একাকিত্ব
আরেন্টের আলোচনায় তিনটি অভিজ্ঞতা আলাদা। নির্জনতা বা solitude হলো এমন একা থাকা, যেখানে নিজের সঙ্গে চিন্তার সংলাপ সম্ভব। রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বা isolation হলো অন্যদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে না পারা। আর loneliness বা একাকিত্বে মানুষ গভীরভাবে অনুভব করতে পারেন যে তিনি কারও অন্তর্ভুক্ত নন, জগতে তাঁর স্বীকৃত জায়গা নেই।
অর্থাৎ ঘরে একা বই পড়া এবং সমাজের মধ্যে থেকেও সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত বোধ করা অভিন্ন নয়। নির্জনতা চিন্তার সুযোগ দিতে পারে; পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার অভিজ্ঞতা সেই ক্ষমতাকেই দুর্বল করতে পারে।
ধরা যাক, কেউ একটি নাগরিক উদ্যোগে কাজ করেন। দিনের শেষে একা থেকে নিজের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করেন, পরদিন সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তাঁর একা থাকা সম্পর্কের বিকল্প নয়; সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত চিন্তার সময়।
অন্যদিকে কেউ বহু মানুষের মধ্যে থেকেও অনুভব করতে পারেন, আপত্তি জানালে তাঁর পাশে কেউ দাঁড়াবে না। কোনো ঘটনা নিয়ে নিজের বিচার মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই। এখানে সমস্যা মানুষের সংখ্যা নয়; সম্পর্কের গুণ এবং যৌথ কাজের সম্ভাবনা।
সাম্প্রতিক দর্শন-গবেষণাও একাকিত্ব ও উগ্রপন্থার সম্পর্ককে একমুখী কারণ হিসেবে না দেখে সামাজিক পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক বয়ানের পারস্পরিক সম্পর্ক দিয়ে বোঝার প্রয়োজন দেখিয়েছে।
জনসমাগম হলেই যৌথ জগৎ তৈরি হয় না
একটি জনসভায় হাজার মানুষ থাকতে পারেন। তাঁরা একই স্লোগান দিতে পারেন। কিন্তু নিজের কথা বলার অধিকার, ভিন্নমত জানানোর নিরাপত্তা এবং অন্যের বক্তব্য শোনার সুযোগ না থাকলে সেই সমাবেশকে মুক্ত রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রমাণ বলা কঠিন।
দ্য হিউম্যান কন্ডিশন-এ আরেন্ট মানুষের বহুত্ব এবং জনপরিসরের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। অভিন্ন জগৎ মানে সবাই একই মত পোষণ করবেন, তা নয়। একই বিষয়কে ভিন্ন অবস্থান থেকে দেখা, তবু সেটিকে আলোচনার যৌথ বিষয় হিসেবে ধরে রাখা—এই সক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ।
একটি পাড়ার খেলার মাঠ নিয়ে মতবিরোধের কথা ভাবা যায়। কেউ সেখানে ভবন চান, কেউ মাঠ রাখতে চান। তাঁরা যদি তথ্য জানতে পারেন, সভা করতে পারেন এবং সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করতে পারেন, তবে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও একটি রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকে।
কিন্তু সিদ্ধান্ত আগেই হয়ে গেলে, প্রশ্নকে শত্রুতা মনে করা হলে এবং আলোচনা কেবল অনুমোদন আদায়ের আনুষ্ঠানিকতা হলে সেই সম্পর্ক ক্ষয়ে যায়। মানুষ তখন জনসমক্ষে উপস্থিত থেকেও রাজনৈতিকভাবে অকার্যকর বোধ করতে পারেন।
এই উদাহরণ আরেন্টের নিজের নয়। তাঁর জনপরিসরের ধারণা দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে বোঝা যায়, তার একটি প্রয়োগ।
বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নেয় যে নিশ্চয়তা
যখন বাস্তব জীবন অনিশ্চিত এবং অন্যের ওপর আস্থা দুর্বল, তখন সব সমস্যার একটিমাত্র ব্যাখ্যা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। একটি শত্রুগোষ্ঠীই সব দুর্দশার কারণ; একজন নেতাই সব সমস্যার সমাধান; প্রশ্ন করা মানেই শত্রুর পক্ষে যাওয়া।
আরেন্টের সর্বাত্মক শাসন-বিশ্লেষণে মতাদর্শের বিশেষ বিপদ হলো অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যার দাবি করা। নতুন তথ্য দিয়ে ধারণা পরীক্ষা করার বদলে আগে স্থির করা ধারণা দিয়ে প্রতিটি ঘটনাকে সাজানো হয়।
এখানে ‘মতাদর্শ’ বলতে যেকোনো রাজনৈতিক বিশ্বাস বোঝানো হচ্ছে না। সমতা, স্বাধীনতা বা সামাজিক ন্যায় নিয়ে প্রতিশ্রুতি থাকলেই চিন্তা বন্ধ হয়ে যায় না। সমস্যা তৈরি হয় যখন কোনো ব্যাখ্যা নিজেকে সংশোধনের সব দরজা বন্ধ করে।
গবেষক জোয়ি রথ আরেন্টকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখান, সর্বগ্রাসী ব্যাখ্যা মানুষের উপলব্ধি ও বাস্তবতার সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই পাঠে একাকিত্ব শুধু অনুভূতি নয়; অন্যদের সঙ্গে ভাগ করা বাস্তব জগৎ হারানোর অভিজ্ঞতাও।
একজন মানুষ কোনো গোষ্ঠীতে অর্থ ও স্বীকৃতি পেতে পারেন। কিন্তু সেই স্বীকৃতির মূল্য যদি হয় স্বাধীন বিচার ছেড়ে দেওয়া, তবে সম্পর্কটি তাঁকে মুক্ত না-ও করতে পারে। ‘আমাদের সঙ্গে থাকলেই তুমি কেউ’—এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ‘আমাদের প্রশ্ন করলে তুমি কেউ নও’ যুক্ত হলে অন্তর্ভুক্তি আনুগত্যের শর্তে পরিণত হয়।
সত্য নিয়ে মতভেদ, নাকি ঘটনার অস্তিত্বই অস্বীকার?
কোনো ঘটনা থেকে কোন নীতি গ্রহণ করা উচিত, তা নিয়ে মতভেদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে কি না, তার প্রমাণই যদি দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়, তখন আলোচনার ভিত্তি দুর্বল হয়।
‘ট্রুথ অ্যান্ড পলিটিকস’ প্রবন্ধে আরেন্ট ঘটনা-সংক্রান্ত সত্য এবং মতামতের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেন। কোনো তথ্য অস্বস্তিকর বলেই সেটিকে কেবল আরেকটি ‘মত’ বানিয়ে দেওয়া নিরীহ অবস্থান নয়; এটি রাজনৈতিক মিথ্যার কৌশল হতে পারে।
ধরা যাক, কোনো সরকারি প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। ব্যয় বাড়ার কারণ গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু নথিতে থাকা অঙ্ক স্বীকার করাই যদি দলদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে যুক্তি দিয়ে মতভেদ মেটানোর ক্ষেত্র সংকুচিত হয়।
এখানে একাকিত্বের সঙ্গে সত্যের সম্পর্ক বোঝা যায়। নির্ভরযোগ্য মানুষ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও যাচাইয়ের পদ্ধতি না থাকলে নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখা কঠিন হয়। তখন পরিচিত গোষ্ঠীর নিশ্চয়তাই বাস্তবতা বিচার করার একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে মতভেদ দূর করাই সমাধান নয়। বরং একই তথ্য মেনে ভিন্ন ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক পছন্দ প্রকাশের সুযোগ বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন।
আজকের অনলাইন জীবনে কতটা প্রযোজ্য?
আরেন্ট সামাজিক মাধ্যমের বর্তমান যুগ দেখেননি। তাই অ্যালগরিদম বা অনলাইন গোষ্ঠী নিয়ে তাঁর নামে বক্তব্য দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু তাঁর ধারণা দিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।
কোনো অনলাইন পরিসরে বারবার একই বক্তব্য দেখা, ভিন্নমতকে মানুষ হিসেবে না দেখে বিপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা এবং নিজের গোষ্ঠীর অনুমোদন হারানোর ভয়—এসব কি স্বাধীন বিচারের জায়গা বাড়ায়, নাকি সংকুচিত করে?
আবার অনলাইন যোগাযোগ নিঃসঙ্গ মানুষকে সহযোগিতা, বন্ধুত্ব ও নাগরিক উদ্যোগের সুযোগও দিতে পারে। মাধ্যমটিকে এক কথায় মুক্তির পথ বা কর্তৃত্ববাদের যন্ত্র বলা তাই যথেষ্ট নয়।
দেখতে হবে, সেখানে মানুষ প্রশ্ন করতে পারছেন কি না, ভুল সংশোধনের সুযোগ আছে কি না এবং যোগাযোগ বাস্তব সহযোগিতায় পৌঁছাচ্ছে কি না। আরেন্টের ধারণা থেকে এই প্রশ্নগুলো নেওয়া যায়; এগুলো তাঁর প্রযুক্তিবিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
প্রতিরোধ শুধু বন্ধুত্বের পরামর্শ নয়
একাকিত্বের রাজনৈতিক বিপদ শুনে সমাধান হিসেবে শুধু ‘মানুষের সঙ্গে মিশুন’ বলা অপর্যাপ্ত। ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব মূল্যবান, কিন্তু মানুষ একসঙ্গে কাজ করার স্বাধীনতা না পেলে সম্পর্কের রাজনৈতিক শক্তি সীমিত থাকে।
এই বিশ্লেষণ থেকে নাগরিক সংগঠন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, পাঠচক্র, শ্রমিক সংগঠন এবং স্থানীয় আলোচনার পরিসরের গুরুত্ব বোঝা যায়। এগুলো কোনো প্রস্তুত আরেন্টীয় নীতিতালিকা নয়; মানুষের যৌথ কাজ ও বহুত্বকে গুরুত্ব দিলে বর্তমানের জন্য যে দিকগুলো বিবেচনায় আসে।
একইভাবে নিজের সঙ্গে চিন্তা করার অবকাশও জরুরি। সারাক্ষণ গোষ্ঠীর স্লোগান শুনতে থাকলে বিবেকবান থাকা নিশ্চিত হয় না। কখনো থেমে জানতে হয়, আমি যে কথাটি সমর্থন করছি, তা বিশ্বাস করার কারণ কী? আমার পাশে থাকা মানুষটি অন্যায় করলে একই বিচার করব কি?
আরেন্টের চিন্তা এভাবেই সামাজিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত বিচারকে পাশাপাশি রাখে। অন্যের সঙ্গ প্রয়োজন, কিন্তু নিজের চিন্তাকে অন্যের হাতে সম্পূর্ণ সমর্পণ করা সেই সঙ্গের লক্ষ্য নয়।
সবশেষে একটি সীমা মনে রাখা প্রয়োজন। একাকিত্ব অনুভব করা কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নয়; একাকী মানুষকে সম্ভাব্য স্বৈরতন্ত্রের সমর্থক ভাবাও অন্যায়। ইতিহাসে কর্তৃত্বের উত্থান বুঝতে প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, সহিংসতা ও ক্ষমতার সিদ্ধান্তও বিবেচনা করতে হয়।
আরেন্ট আমাদের শেখান, রাজনীতির সংকট অনেক সময় মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের সংকট হিসেবেও শুরু হয়। নিজের কথা অর্থপূর্ণ মনে না হওয়া, অন্যের ওপর আস্থা হারানো এবং একসঙ্গে কিছু বদলানোর ক্ষমতা নেই বলে মনে হওয়া—এসব অভিজ্ঞতা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তাই স্বাধীনতা রক্ষার কাজ শুধু ক্ষমতার শীর্ষে কে আছেন, তা দেখায় শেষ হয় না। মানুষের মধ্যে এমন পরিসর বাঁচিয়ে রাখাও তার অংশ, যেখানে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা কথা বলতে, সত্য যাচাই করতে এবং একসঙ্গে নতুন কিছু শুরু করতে পারেন।
আপনার মতামত জানানঃ