
একটি বাতিঘরকে আমরা দূর থেকে দেখা আলো হিসেবে কল্পনা করি। অন্ধকার সমুদ্রে নাবিকের পথ চেনার উপায়, বন্দরের উপস্থিতির সংকেত। কিন্তু সেই বিশাল স্থাপনার স্মৃতি যদি পাওয়া যায় একটি ছোট আংটির গায়ে, তখন ইতিহাস দেখার দৃষ্টিও বদলে যায়।
মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার পূর্ব বন্দরের পানির নিচে এমন একটি ব্রোঞ্জের সিলমোহর-আংটি পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। গবেষক দল এর গায়ে প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর বা ফারোসের প্রতিকৃতি শনাক্ত করেছে। আবিষ্কারের ঘোষণা প্রকাশিত হয় ৭ অক্টোবর ২০২৬।
খবরটি আকর্ষণীয়, কারণ যে স্থাপনা আর দাঁড়িয়ে নেই, তার একটি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ টিকে আছে। তবে আংটিটি আমাদের যতটা দেখায়, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্নও তোলে। কে ব্যবহার করতেন? কোন কাজে? আর একটি নগরের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা কেন ব্যক্তির বহনযোগ্য সিলমোহরের চিহ্ন হয়ে উঠল?
প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষে পাওয়া সূত্র
আংটিটি পাওয়া গেছে ডুবে যাওয়া আন্তিরোদোস দ্বীপের প্রাসাদস্থলে। এটি প্রাচীন পোর্তুস মাগনুস বা বৃহৎ বন্দরের রাজকীয় এলাকার অংশ ছিল। গবেষক ফ্রাঙ্ক গদিওর নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় পানির নিচের প্রত্নতত্ত্ব প্রতিষ্ঠান IEASM সেখানে খনন চালাচ্ছে।
প্রকাশিত ঘোষণায় বলা হয়েছে, আংটির বাতিঘর-চিত্রের সঙ্গে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকের কিছু মুদ্রার চিত্ররীতির মিল আছে। বস্তুটি একই সময়ের মৃৎপাত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রত্নপ্রসঙ্গে পাওয়া গেছে। গবেষক দলের মতে, সে সময়ে এটি ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে; তৈরি হয়ে থাকতে পারে আরও আগে।
এই পার্থক্যটি জরুরি। কোনো বস্তু দ্বিতীয় শতকের উপকরণের সঙ্গে পাওয়া মানেই তার নির্মাণের নির্দিষ্ট বছর জানা নয়। নির্মাণ, ব্যবহার এবং শেষ পর্যন্ত মাটিতে বা পানির নিচে জমা হওয়ার সময় এক নাও হতে পারে।
গদিওর দল প্রাসাদে বাতিঘর-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কাজ চলার ব্যাখ্যা দিয়েছে। সেটি গবেষকদের ব্যাখ্যা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ; তবে ব্যবহারকারীর নাম বা পদ সরাসরি শনাক্ত হয়েছে—এ কথা বলা যাবে না। ‘ক্লিওপেট্রার আংটি’ বলারও ভিত্তি নেই।
আংটি যখন একটি নগরের পরিচয় বহন করে
বাতিঘরের গুরুত্ব শুধু তার উচ্চতা বা স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। একটি বন্দরনগর বাইরের মানুষের কাছে নিজেকে কীভাবে পরিচিত করে, সেই প্রশ্নও এখানে আছে।
আজ কোনো নগরের বিশেষ সেতু, মিনার বা ভবন তার পরিচয়ের সংক্ষিপ্ত চিহ্ন হয়ে ওঠে। প্রাচীন বাতিঘরের প্রতিকৃতিকেও নগর-পরিচয়ের সেই বৃহত্তর প্রশ্নে দেখা যায়। এটি আধুনিক তুলনা; আংটির ব্যবহার সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
আবিষ্কারের বিশেষত্বও সঠিকভাবে বোঝা প্রয়োজন। বাতিঘরের চিত্র এই প্রথম পাওয়া গেল, তা নয়। মুদ্রা ও অন্য প্রাচীন বস্তুতে এর প্রতিরূপ আগেই পরিচিত ছিল। নতুনত্ব হলো, গবেষক দল এটিকে বাতিঘরের চিত্রসংবলিত প্রথম পরিচিত ব্রোঞ্জের সিলমোহর-আংটি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
একই স্থাপনা বিভিন্ন মাধ্যমে কীভাবে আঁকা হয়েছে, তার তুলনা গুরুত্বপূর্ণ। একটি ছোট সিলমোহরে শিল্পী সব জানালা, সিঁড়ি বা অনুপাত দেখাতে পারবেন না। কিছু বৈশিষ্ট্য বাদ যাবে, কিছু জোর দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তাই প্রতিকৃতি থেকে পরিচয় শনাক্ত করা এবং সেখান থেকে স্থাপত্যের নির্ভুল মাপ বের করা আলাদা কাজ।
আংটিটি বাতিঘরের অস্তিত্বের প্রথম প্রমাণ নয়। এটি পরিচিত স্থাপনাটির প্রতিরূপ, ব্যবহার ও অর্থ বোঝার প্রমাণভান্ডারে নতুন সংযোজন।
যে নগর পুরোটা হারিয়ে যায়নি
‘সমুদ্রের নিচে হারানো আলেকজান্দ্রিয়া’ কথাটি কল্পনাকে টানে। কিন্তু বর্তমান আলেকজান্দ্রিয়া একটি জীবন্ত নগর। পানির নিচে রয়েছে তার প্রাচীন উপকূল, বন্দর ও রাজকীয় এলাকার অংশ। পুরো নগর একদিনে অদৃশ্য হয়ে গেছে—এমন বর্ণনা বিভ্রান্তিকর।
IEASM-এর আলেকজান্দ্রিয়া প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৯২ সালে পানির নিচে অনুসন্ধান শুরু হয়। প্রাচীন বন্দরের মানচিত্র তৈরির কাজে স্থাপত্যের অবশেষ, উপকূলের বিন্যাস এবং পলি-ঢাকা প্রত্নস্থানের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাপ্ত ভূসংস্থান প্রাচীন লেখার ভিত্তিতে আগে কল্পনা করা বিন্যাসকে সংশোধনের সুযোগ দিয়েছে।
এখানে প্রত্নতত্ত্বের একটি বড় শক্তি কাজ করে। লিখিত ইতিহাসের বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা একমাত্র প্রমাণ নয়। বন্দর কোথায় ছিল, কোন স্থাপনা কোনটির পাশে, কোথায় নৌযান পৌঁছাতে পারত—ভৌত অবশেষ সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে পরীক্ষা করতে সাহায্য করে।
আন্তিরোদোসের এই আবিষ্কারকে বাতিঘরের নিজস্ব ধ্বংসাবশেষের খননের সঙ্গেও এক করে দেখা যাবে না। সংশ্লিষ্ট বৃহত্তর নগর এক হলেও অনুসন্ধানস্থল ও গবেষণার বিষয় পৃথক।
সমুদ্র কীভাবে ভূমির ওপর উঠে এল
প্রাচীন রাজকীয় এলাকার নিমজ্জনের গল্প একটি মাত্র বিপর্যয়ের দৃশ্যে শেষ করা যায় না। ধীর ভূমি অবনমন, সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন এবং ভূমিকম্প ও সুনামির মতো আকস্মিক ঘটনার সম্মিলিত ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। IEASM-এর ভূপ্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণও একাধিক প্রক্রিয়ার কথা বলে।
২০২১ সালে প্রকাশিত একটি ভূভৌত গবেষণায় প্রাচীন রাজবন্দরের পলি ও তলদেশের গঠন পরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মডেল দেওয়া হয়েছে। সেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন এবং ৩৬৫ খ্রিষ্টাব্দের সুনামির গুরুত্ব উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ২০১৩ সালের একটি গবেষণা দীর্ঘ সময়ের আকস্মিক ভূমি পরিবর্তন এবং তুলনামূলক ছোট সময়ের ধীর অবনমনকে আলাদা করে দেখার প্রয়োজন তুলে ধরে।
এই গবেষণাগুলো থেকে সতর্ক শিক্ষা হলো, উপকূলের পরিবর্তনের একাধিক সময়মাত্রা থাকে। একটি ভূমিকম্প দ্রুত ক্ষতি করতে পারে; আবার ভূমি ধীরে বসে যাওয়া ও সমুদ্রের তুলনামূলক উচ্চতা বদলানোর প্রভাব শতাব্দী ধরে জমতে পারে। তবে অতীতের এই প্রক্রিয়াকে আজকের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি অভিন্ন বলা যাবে না।
পানির নিচে থাকা বস্তু তাই শুধু কোনো মানুষের হারানো সম্পদ নয়। সেটি ভূদৃশ্যের বদলে যাওয়া ইতিহাসের মধ্যেও অবস্থান করে।
উদ্ধার করার চেয়েও বড় কাজ: সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা
ছোট একটি বস্তু হাতে তোলার মুহূর্ত সংবাদে জায়গা পায়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের বড় অংশ থাকে বস্তুটির চারপাশে।
কোন স্তরে এটি পাওয়া গেল, পাশে কী ছিল, ভবনের কোন অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত—এসব তথ্য হারালে ব্যাখ্যার শক্তি কমে যায়। আংটিটির সময়কাল নিয়ে মৃৎপাত্রের প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণও সেটিই।
গদিওর দলের প্রকাশিত পদ্ধতিতে প্রাচীন নথি পর্যালোচনা, ভূভৌত জরিপ, পরীক্ষামূলক খনন, ছবি, মানচিত্র ও ত্রিমাত্রিক নথিবদ্ধকরণের ধারাবাহিকতা আছে। প্রয়োজনমতো উদ্ধার করা বস্তুতে সংরক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণও করা হয়।
পানির নিচে দীর্ঘদিন থাকা ধাতু পৃষ্ঠে তুললেই নিরাপদ হয়ে যায় না। ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ ও উপযুক্ত সংরক্ষণ জরুরি। ফলে ‘উদ্ধার’ গবেষণার সমাপ্তি নয়; অনেক ক্ষেত্রে নতুন কাজের শুরু।
সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্বকে তাই শুধু গুপ্তধন খোঁজার অভিযান হিসেবে দেখলে ইতিহাসের আসল কাজটি আড়ালে পড়ে। মূল্যবান বস্তু পাওয়া আনন্দের; কিন্তু তার সঙ্গে অন্য বস্তু, স্থাপনা ও সময়ের সম্পর্ক উদ্ধার করাই জ্ঞান তৈরি করে।
একটি চিহ্ন থেকে সম্পূর্ণ বাতিঘর?
ফারোসের অবশেষ নিয়ে আলাদা গবেষণা চালাচ্ছে Centre d’Études Alexandrines বা CEAlex। তাদের ফারোস প্রকল্পে স্থাপত্যের খণ্ড, প্রাচীন বর্ণনা ও চিত্রপ্রমাণ মিলিয়ে ডিজিটাল পুনর্গঠনের কাজ চলছে। ২০২৫ সালের অভিযানে বড় স্থাপত্যখণ্ড তুলে নথিবদ্ধ ও বিশ্লেষণের কথাও প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
আংটির ক্ষুদ্র চিত্র এবং বিশাল পাথরখণ্ড তাই ভিন্ন ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। একটি বলে, মানুষ স্থাপনাটিকে কীভাবে দেখত বা চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করত। অন্যটি নির্মাণকৌশল, মাপ ও উপাদান বোঝায়। দুটিকে মিলিয়ে বিচার করা যায়; একটিকে অন্যটির বিকল্প বানানো যায় না।
এখনো প্রকাশিত ঘোষণা থেকে আমরা ব্যবহারকারীর নিশ্চিত পরিচয় বা নির্মাণের নির্দিষ্ট বছর জানি না। ভবিষ্যতের বিশ্লেষণ ব্যাখ্যা আরও দৃঢ় করতে পারে, সংশোধনও করতে পারে। এই অনিশ্চয়তা আবিষ্কারের গুরুত্ব কমায় না; বরং কোথায় প্রমাণ আছে, কোথায় প্রশ্ন বাকি, তা পরিষ্কার করে।
আংটিটির আকর্ষণ এখানেই। একটি বিশাল বাতিঘর নিজের স্থাপত্যের বাইরে মানুষের ব্যবহারের জগতে প্রবেশ করেছিল। তার চিহ্ন ছোট হয়ে টিকে গেছে, যখন নগরের ভূদৃশ্যই বদলে গেছে।
সমুদ্রের নিচ থেকে পাওয়া এই বস্তু পুরো আলেকজান্দ্রিয়াকে ফিরিয়ে আনে না। কিন্তু হারানো স্থাপনা, মানুষের কাজ এবং নগরের দীর্ঘ জীবনের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র সংযোগ ফিরিয়ে দেয়। ইতিহাস অনেক সময় এমনই—সম্পূর্ণ দরজা খুলে দেয় না, ছোট একটি ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকাতে শেখায়।
আপনার মতামত জানানঃ