
১৯৫৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে মিসরের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি যখন বাস্তব যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে, লন্ডন ও প্যারিস তখনও অতীতের প্রভাবকে বর্তমানের ক্ষমতা বলে ধরে নিয়েছিল। তাদের যুদ্ধজাহাজ ছিল, বিমান ছিল, প্রশিক্ষিত সেনা ছিল। কিন্তু একটি অভিযান পরিচালনার সামর্থ্য এবং তার রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য যে এক নয়, সুয়েজ সংকট সেই ব্যবধান প্রকাশ করে দেয়।
ঘটনার কেন্দ্রে ছিল একটি জলপথ। কিন্তু বিরোধ শুধু জাহাজ চলাচল বা কোম্পানির মালিকানা নিয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রশ্ন ছিল, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নিজের ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কতটা; পুরোনো ঔপনিবেশিক শক্তি সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেবে কি না; আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বিশ্বে শেষ কথা বলার ক্ষমতা কার হাতে।
খালের ভেতর দিয়ে চলত বাণিজ্য, সঙ্গে আধিপত্য
১৮৬৯ সালের ১৭ নভেম্বর সুয়েজ খাল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়। ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করা এই পথ ইউরোপ ও এশিয়ার নৌযোগাযোগ বদলে দেয়। আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যাওয়ার দীর্ঘ পথ এড়িয়ে জাহাজ চলতে পারে। ফলে খালটি হয়ে ওঠে বাণিজ্য, সামরিক যোগাযোগ ও সাম্রাজ্যিক স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
খাল মিসরের ভূখণ্ডে হলেও তার কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় স্বার্থের বড় ভূমিকা ছিল। ১৮৭৫ সালে মিসরের শাসকের হাতে থাকা কোম্পানির শেয়ার ব্রিটেন কিনে নেয়। ১৮৮২ সালে ব্রিটিশ দখল মিসরের ওপর সরাসরি সামরিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। ফরাসি জাতীয় গ্রন্থাগারের ঐতিহাসিক বিবরণে এই মালিকানা ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের যোগসূত্র উঠে এসেছে।
এখানেই সুয়েজের রাজনৈতিক তাৎপর্য। একটি দেশের ভেতর দিয়ে যাওয়া সম্পদ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু সেই গুরুত্ব কি বিদেশি রাষ্ট্রকে তার ওপর স্থায়ী কর্তৃত্বের অধিকার দেয়? মিসরীয় জাতীয়তাবাদের কাছে খালের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার ছিল এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা।
নাসেরের ঘোষণা কেন এত বড় ধাক্কা
১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ ক্যানাল কোম্পানি জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, জাতীয়করণ করা হয়েছিল কোম্পানিকে; নতুন করে কোনো বিদেশি ভূখণ্ড দখল করা হয়নি। নাসের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাবও রেখেছিলেন।
আসোয়ান বাঁধ নির্মাণের অর্থায়ন নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ ছিল তাৎক্ষণিক পটভূমির একটি অংশ। খালের আয় উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা জাতীয়করণকে অর্থনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত করেছিল। অন্যদিকে ফ্রান্সের ক্ষোভের পেছনে আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামীদের প্রতি নাসেরের সমর্থনও কাজ করছিল।
ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে তাই এটি কেবল ব্যবসায়িক ক্ষতির প্রশ্ন ছিল না। জাতীয়করণ সফল হলে অন্য দেশও পুরোনো ক্ষমতার সম্পর্ক বদলানোর সাহস পেতে পারে। আর নাসেরের কাছে প্রশ্ন ছিল, রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়ার পরও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য বিদেশি অনুমোদন নিতে হবে কেন।
এই বিরোধে বাণিজ্যিক উদ্বেগ এবং ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব রক্ষার আকাঙ্ক্ষা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। খাল চালু রাখার প্রয়োজনকে সামনে রেখে কে খাল নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই বড় প্রশ্নটি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলতে থাকে।
গোপন পরিকল্পনা, প্রকাশ্য ‘শান্তিরক্ষা’
অক্টোবরে ফ্রান্সের সেভ্রেতে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিদের গোপন বৈঠকে আক্রমণের পরিকল্পনা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত ঐতিহাসিক নথির সম্পাদকীয় বিবরণ অনুযায়ী, পরিকল্পনা ছিল—ইসরায়েল সিনাই আক্রমণ করবে; এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্স উভয় পক্ষকে খাল থেকে সরে যাওয়ার আলটিমেটাম দেবে এবং মিসর তা প্রত্যাখ্যান করলে সামরিক অভিযান শুরু করবে।
অর্থাৎ যারা সংঘাতের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল, তারাই পরে নিজেদের বিচ্ছিন্নকারী বা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার শক্তি হিসেবে হাজির করতে চেয়েছিল। সুয়েজের নৈতিক ও কূটনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে ছিল এই অসংগতি।
২৯ অক্টোবর ইসরায়েল সিনাই আক্রমণ করে। ৩১ অক্টোবর ব্রিটিশ-ফরাসি বিমান হামলা শুরু হয়। ৫ নভেম্বর ছত্রীসেনা নামে এবং ৬ নভেম্বর সমুদ্রপথে অবতরণ ঘটে। অভিযান খাল অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
কিন্তু সামরিক অগ্রগতি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারেনি। মিসরের জন্য আক্রমণটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। আর ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে তাদের গোপন সহযোগিতার ব্যবধান আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় কঠিন করে দেয়।
ট্যাংকের সামনে নয়, আর্থিক নির্ভরতার কাছেও থামতে হয়
সুয়েজের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা। ওয়াশিংটন নিজের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের অভিযানকে সমর্থন দেয়নি। আইজেনহাওয়ার প্রশাসন আশঙ্কা করেছিল, আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত হলে আরব বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সোভিয়েত প্রভাব বাড়বে। একই সময়ে হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত হস্তক্ষেপের নিন্দা করে মিসরে মিত্রদের আক্রমণ সমর্থন করাও কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর ছিল।
ব্রিটেনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা এই বিরোধকে কার্যকর চাপে রূপ দেয়। পাউন্ডের ওপর চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন এবং আর্থিক সহায়তার প্রশ্ন লন্ডনের সিদ্ধান্তের পরিসর সংকুচিত করে। আইএমএফের ইতিহাসবিদ জেমস এম. বটনের গবেষণা দেখায়, সুয়েজ সামরিক-কূটনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি স্টার্লিংয়ের আস্থাসংকটও ছিল।
এই জায়গায় সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার সীমা প্রকাশ পায়। কোনো রাষ্ট্র দূরদেশে সৈন্য নামাতে পারে; কিন্তু তার মুদ্রা, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন যদি চাপের মুখে পড়ে, অভিযান চালিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতাও সীমিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের শক্তির পেছনে অর্থনীতির ভিত্তি কতটা জরুরি, সুয়েজ তা দেখিয়ে দেয়।
সোভিয়েত হুমকি ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছিল। তবে ব্রিটিশ-ফরাসি পিছু হটার ব্যাখ্যায় শুধু একটি হুমকি বা একটি সিদ্ধান্তকে কারণ বানালে আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপের সম্মিলিত প্রভাব আড়ালে পড়ে।
জাতিসংঘের ভূমিকা এবং বিজয়ের সীমা
নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ভেটো অচলাবস্থা তৈরি করলে বিষয়টি সাধারণ পরিষদের জরুরি বিশেষ অধিবেশনে যায়। সেখান থেকে যুদ্ধবিরতি ও সেনা প্রত্যাহারের কূটনৈতিক উদ্যোগ এগোয়। সুয়েজ সংকটের প্রেক্ষাপটেই প্রথম সশস্ত্র জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী, UNEF, গড়ে ওঠে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এর আগেই শুরু হয়েছিল; ১৯৫৬ সালের নতুনত্ব ছিল এই ধরনের সশস্ত্র বাহিনী।
৬ নভেম্বর যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া হয়। ব্রিটিশ ও ফরাসি সেনা প্রত্যাহার শেষ হয় ২২ ডিসেম্বর ১৯৫৬; ইসরায়েলি প্রত্যাহার সম্পন্ন হয় ৮ মার্চ ১৯৫৭। জাতিসংঘের নথিতে এই ধাপগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত আছে।
নাসের ক্ষমতায় থাকেন এবং তাঁর আঞ্চলিক মর্যাদা বাড়ে। মিসরের জন্য ফলাফল রাজনৈতিক সাফল্য হলেও যুদ্ধের ধ্বংস ও মানুষের ক্ষয়ক্ষতি মুছে যায়নি। পোর্ট সাঈদের ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও বাসিন্দাদের দুর্দশার দলিল সেই মূল্য মনে করিয়ে দেয়।
ব্রিটেনের জন্য সুয়েজ ছিল মর্যাদার বড় আঘাত। অ্যান্থনি ইডেন ১৯৫৭ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন; সংকট তাঁর অবস্থান দুর্বল করার একটি বড় কারণ ছিল। তবে একটি ঘটনাতেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। বরং সুয়েজ দেখিয়ে দেয়, পুরোনো সাম্রাজ্যিক স্বাধীনতায় বড় সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কতটা সংকুচিত হয়েছে।
ইউরোপীয় প্রভাব কমলেও মধ্যপ্রাচ্য বহিঃশক্তির প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত হয়নি। সুয়েজ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজের ভূমিকা বাড়াতে চেয়েছিল; ১৯৫৭ সালের আইজেনহাওয়ার মতবাদে তার প্রতিফলন দেখা যায়। ফলে এই ইতিহাস শুধু আধিপত্যের অবসানের নয়, আধিপত্যের ধরন ও কেন্দ্র বদলে যাওয়ারও ইতিহাস।
সুয়েজের স্থায়ী শিক্ষা তাই একাধিক। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো একটি দেশের সার্বভৌমত্বের কেন্দ্র হতে পারে। সামরিক সাফল্য রাজনৈতিক বৈধতার বিকল্প হতে পারে না। আর অর্থনৈতিক নির্ভরতা এমন সীমা তৈরি করতে পারে, যা যুদ্ধজাহাজ দিয়েও অতিক্রম করা যায় না।
একটি খাল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অস্ত্র কেড়ে নেয়নি। সেটি প্রকাশ করে দিয়েছিল, অস্ত্র থাকা আর নিজের ইচ্ছামতো বিশ্বকে চালাতে পারা এক কথা নয়।
সংক্ষিপ্ত ঘটনাক্রম
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ১৭ নভেম্বর ১৮৬৯ | সুয়েজ খালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন |
| ২৬ জুলাই ১৯৫৬ | নাসেরের সুয়েজ ক্যানাল কোম্পানি জাতীয়করণের ঘোষণা |
| ২৯ অক্টোবর ১৯৫৬ | সিনাইয়ে ইসরায়েলি আক্রমণ |
| ৩১ অক্টোবর ১৯৫৬ | ব্রিটিশ-ফরাসি বিমান হামলা শুরু |
| ৫–৬ নভেম্বর ১৯৫৬ | ছত্রীসেনা ও সমুদ্রপথে অবতরণ |
| ৬ নভেম্বর ১৯৫৬ | যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া |
| ২২ ডিসেম্বর ১৯৫৬ | ব্রিটিশ-ফরাসি সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন |
| ৮ মার্চ ১৯৫৭ | ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন |
আপনার মতামত জানানঃ