
পুজোর ভিড়ে একটি বইয়ের স্টল দেখতে সামান্য জায়গা। কয়েকটি টেবিল, বাঁশের কাঠামো, সাজানো বই আর পথচলতি পাঠকের সঙ্গে ছোট ছোট আলাপ। কিন্তু সেই জায়গাটুকু কে পাবে, কী বই রাখবে এবং কোন ভাষায় উৎসবের পরিচয় দেবে—এসব যখন রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্নটি আর বই বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে, জনপরিসরে মত প্রকাশের সুযোগ কি সবার জন্য সমান, নাকি ক্ষমতার অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল?
পশ্চিমবঙ্গে এবারের দুর্গাপুজোয় বামপন্থী দলগুলোর বইয়ের স্টলে হামলার একাধিক অভিযোগ সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। ১৮ অক্টোবরের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বর্ধমান শহরের জিটি রোডে শুক্রবার রাতে মুখোশধারীদের স্টল ভাঙচুরের অভিযোগের কথা আছে। সিপিআই(এম)-এর দাবি, আগে পুলিশকে নিরাপত্তার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দলীয় নির্দেশে এমন হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে দায়ীদের বিষয়ে পুলিশকে জানাতে বলেছেন। অভিযোগ ও অস্বীকৃতি—দুটিই এই ঘটনার সংবাদগত অংশ; তদন্তে দায় নির্ধারণ হওয়ার আগে একটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পরিণত করা চলে না।
১৭ অক্টোবরের এবিপি আনন্দের প্রতিবেদনে বীজপুর, পলতা, কুলপি, সিউড়ি ও মুরারইসহ কয়েকটি জায়গায় ভাঙচুর বা আগুন দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। সব জায়গায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, একই ব্যক্তিরা দায়ী বা সব অভিযোগ একই মাত্রায় প্রমাণিত—এমন সিদ্ধান্ত এই বিবরণ থেকে টানা যায় না। স্থানভেদে অভিযোগ, প্রমাণ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ আলাদা করে পরীক্ষা করা দরকার।
১৬ অক্টোবর অল্ট নিউজ ঢাকুরিয়ায় নির্মীয়মাণ বামপন্থী স্টল ভাঙচুর ও কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উৎসবের নামকরণ এবং স্টলের জায়গা দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কথাও সেখানে এসেছে। ফলে বিষয়টি কেবল বিচ্ছিন্ন সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্নে আটকে নেই; সাংস্কৃতিক পরিসরে কার উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য, সেই বিরোধও এর পটভূমিতে রয়েছে।
যাদবপুরের পরিস্থিতিতে আবার প্রশাসনিক অনুমতির বিরোধ সামনে এসেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টল সরাতে একটি যন্ত্র আনা হলে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুরসভার সংশ্লিষ্ট বিভাগের বক্তব্য ছিল, পুলিশের অনুমতি না থাকার কারণে ব্যবস্থা চাওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে আইসার রাজ্য সভাপতি ঋতম মাজির দাবি, প্রয়োজনীয় নথি ও অনুমতি তাঁদের ছিল। এখানে কোন অনুমতি প্রযোজ্য, কোন নথি জমা পড়েছিল এবং লিখিত নির্দেশ কী ছিল—সেসব যাচাই ছাড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপের বৈধতা বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেওয়া ঠিক হবে না।
বইয়ের স্টল কেন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ
বইয়ের স্টল শুধু বিক্রির জায়গা নয়; সংগঠনের সঙ্গে সমাজের যোগাযোগের একটি ছোট পরিসরও। সেখানে রাজনৈতিক সাহিত্য থাকতে পারে, আবার উপন্যাস, ইতিহাস বা বিজ্ঞানের বইও থাকতে পারে। কোনো পাঠক একটি বই কিনতে এসে ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। কোনো তরুণ প্রথমবার এমন লেখার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, যা তাঁর পরিচিত ধারণাকে প্রশ্ন করে। এই যোগাযোগের মূল্য বই বিক্রির অঙ্ক দিয়ে পুরোটা বোঝা যায় না।
দলীয় স্টল যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, সেটিও স্বীকার করা প্রয়োজন। সংগঠন পরিচিতি বাড়াতে, সমর্থক সংগ্রহ করতে বা নিজেদের মতাদর্শ প্রচার করতে চাইবে। কিন্তু একটি উদ্যোগ রাজনৈতিক বলেই তার শান্তিপূর্ণ উপস্থিতি অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, একই ধরনের কার্যক্রমের জন্য সব পক্ষকে সমান নিয়ম মানতে হচ্ছে কি না এবং মতাদর্শের বদলে বাস্তব আচরণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হচ্ছে কি না।
স্টলের সাহিত্য অপছন্দ হলে তার সমালোচনা, পাল্টা বই প্রকাশ বা আলোচনার আয়োজন করা যায়। পাঠককে কেন সেই বক্তব্য ভুল মনে হয়, তার যুক্তি দেওয়া যায়। ভাঙচুর বা ভয় দেখানো বিতর্কের এই পথগুলো সংকুচিত করে। তাতে সাময়িকভাবে একটি স্টল সরানো সম্ভব হলেও মতের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত হয় না; প্রমাণিত হয় প্রতিপক্ষের উপস্থিতি সহ্য করার অনীহা।
তবে নির্দিষ্ট হামলার দায় নির্ধারণের প্রশ্ন আর মতপ্রকাশের নীতিগত সুরক্ষা এক জিনিস নয়। কোনো দল অভিযোগ অস্বীকার করলে তদন্তের প্রয়োজন শেষ হয় না। আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অভিযোগ তুললেই অভিযুক্ত দলের দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। ছবি-ভিডিওর সত্যতা, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, অভিযোগের নথি ও অন্যান্য প্রমাণ মিলিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। নীতিগত অবস্থান দৃঢ় রাখা এবং তথ্যগত সিদ্ধান্তে সতর্ক থাকা একই সঙ্গে সম্ভব।
নিরাপত্তার নিয়ম, না বাছাই করে বাধা?
উৎসবের সময়ে চলাচলের পথ, অগ্নিনিরাপত্তা, ভিড়ের চাপ ও জরুরি সেবার প্রবেশাধিকার গুরুত্বপূর্ণ। বইয়ের স্টলসহ অস্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রেও যুক্তিসংগত নিরাপত্তাবিধি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কিন্তু সেই বিধি বিশ্বাসযোগ্য হয় তখনই, যখন আবেদনপদ্ধতি আগে থেকে জানা থাকে, অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের কারণ লিখিত থাকে এবং তুলনীয় পরিস্থিতিতে নিয়মের প্রয়োগ এক হয়।
অতএব কোনো স্টল সরানোর প্রশ্ন উঠলে প্রশাসনের ব্যাখ্যা নির্দিষ্ট হওয়া দরকার। সমস্যা কি অবস্থান, আয়তন, পথ আটকে থাকা, নাকি প্রয়োজনীয় অনুমতির ঘাটতি? সমস্যাটি সংশোধনের সুযোগ আছে কি? কাছাকাছি অন্য স্টল একই শর্ত মানছে কি? এসবের উত্তর প্রকাশিত হলে নাগরিক বুঝতে পারেন ব্যবস্থা নিরাপত্তার জন্য, নাকি নিয়মের আড়ালে রাজনৈতিক বাছাই হচ্ছে।
এই প্রশ্ন প্রশাসনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগাম রায় নয়। বরং নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান করার উপায়। রাজনৈতিক উত্তেজনার পরিবেশে শুধু কর্তৃপক্ষের দাবি অথবা শুধু আয়োজকের বক্তব্য আস্থার সংকট মেটাতে পারে না। নথি ও সিদ্ধান্তের যুক্তি প্রকাশ সেই সংকট কমাতে সাহায্য করে। নিয়ম সবার জন্য হলে তার প্রয়োগের ব্যাখ্যাও সবার সামনে থাকা উচিত।
কোনো স্থানে উত্তেজনা তৈরি হলে সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করা প্রয়োজন হতে পারে। তবে সম্ভাব্য হামলার মুখে বারবার আক্রান্ত পক্ষকেই সরিয়ে দেওয়া হলে একটি বিপজ্জনক প্রণোদনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে: বাধা সৃষ্টি করলেই প্রতিপক্ষের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব। তাই সাময়িক নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে হুমকির উৎস শনাক্ত করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নিরাপদে কার্যক্রম পুনরারম্ভের পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
উৎসবের নাম নিয়েও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। কেউ দুর্গাপুজোর ধর্মীয় তাৎপর্যকে সামনে রাখবেন, কেউ বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনের অর্থকে বেশি গুরুত্ব দেবেন। এই ভিন্নতা নিয়ে বিতর্ক করা স্বাভাবিক। কিন্তু উৎসবকে বর্ণনার একটি নির্দিষ্ট ভাষার প্রতি আনুগত্য জনপরিসরে উপস্থিতির শর্ত হয়ে উঠলে আলোচনা সংকুচিত হয়। উৎসবের ধর্মীয় মর্যাদা এবং শান্তিপূর্ণ মতভেদের সহাবস্থানকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই।
বর্তমান অভিযোগের আলোচনায় অতীতের অভিজ্ঞতাও প্রাসঙ্গিক। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে এক প্রবীণ সিপিআই(এম) নেতার বক্তব্য রয়েছে যে তৃণমূলের শাসনকালেও তাঁদের স্টল আক্রান্ত হয়েছিল, যদিও তাঁর দাবি অনুযায়ী বর্তমান ব্যাপ্তি বেশি। এটি সংশ্লিষ্ট নেতার মূল্যায়ন, তুলনামূলক ঘটনার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নয়। অতীতের অভিযোগকে বর্তমানের দায় এড়ানোর যুক্তি করা যায় না; বরং সব সময়ের জন্য একই মানদণ্ড দাবি করার কারণ হিসেবে দেখা উচিত।
বিরোধী দল যখন প্রতিপক্ষের ওপর হামলার নিন্দা করে, তখন তার অবস্থান ইতিবাচক। সেই অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে যদি নিজের শাসনকাল বা নিজের সমর্থকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেও একই মানদণ্ড বজায় থাকে। ক্ষমতাসীন পক্ষের দায়িত্ব আরও প্রত্যক্ষ: তদন্তের পরিবেশ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দলীয় অস্বীকৃতির পাশাপাশি দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপই আস্থা তৈরির কার্যকর পথ।
পাঠকের দিক থেকেও ক্ষতিটি বিবেচনা করা দরকার। একটি স্টল নিয়ে বারবার হুমকি বা বিরোধ তৈরি হলে সংগঠক ভবিষ্যতে আয়োজন এড়িয়ে যেতে পারেন, বিক্রেতা কিছু বই রাখতে দ্বিধা করতে পারেন, পাঠক সেখানে দাঁড়াতেই অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। এগুলো এই ঘটনায় পরিমাপ করা ফল নয়; ভয়ভিত্তিক পরিবেশের সম্ভাব্য প্রভাব। ফলে শুধু ভাঙা কাঠামোর মূল্য ধরে ক্ষতি হিসাব করলে জনপরিসর সংকুচিত হওয়ার দিকটি বাদ পড়ে যায়।
একই সঙ্গে দায়িত্বশীল সংবাদচর্চা জরুরি। যাচাই ছাড়া ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, পুরোনো ছবি বা অজানা পরিচয়ের ব্যক্তির আচরণকে কোনো দলের প্রমাণিত নির্দেশ হিসেবে দেখালে উত্তেজনা বাড়ে। আবার অভিযোগকে দলীয় প্রচার বলে উড়িয়ে দিলেও ভুক্তভোগীর কথা চাপা পড়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনের কাজ হলো কী জানা গেছে, কার দাবি কী, কী নথি পাওয়া গেছে এবং কী এখনো নিশ্চিত নয়—এই সীমাগুলো পরিষ্কার রাখা।
পশ্চিমবঙ্গে ভিন্নমতের জায়গা কতটা নিরাপদ, তার পূর্ণ উত্তর শুধু কয়েকটি অভিযোগ থেকে পাওয়া যায় না। তবে অভিযোগগুলো নিরাপত্তা ও সমান সুযোগের পরীক্ষা সামনে এনেছে। সেই পরীক্ষার ফল বোঝা যাবে তদন্তের অগ্রগতি, প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ, অনুমতির নিয়মে স্বচ্ছতা এবং শান্তিপূর্ণ বই বিক্রি চালানোর বাস্তব সুযোগ দিয়ে।
একটি সমাজের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস বোঝা যায় অপছন্দের বই সামনে থাকলে সে কী করে। যুক্তি দিয়ে বিরোধিতা করে, নাকি বইটি রাখার জায়গাই কেড়ে নিতে চায়? পুজোর বইয়ের স্টল ঘিরে বর্তমান বিতর্কে সবচেয়ে জরুরি দাবি তাই নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শের জয় নয়। দাবি হলো, পাঠক নিজের পছন্দে বই দেখবেন, বিক্রেতা সমান নিয়মে কাজ করবেন এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে প্রমাণ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায়।
আপনার মতামত জানানঃ