বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একের পর এক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেই কি উচ্চশিক্ষার মান বাড়ে? নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে কি নিশ্চিত হচ্ছে পর্যাপ্ত শিক্ষক, গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আবাসন এবং মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম? নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতার আড়ালে উচ্চশিক্ষার মৌলিক প্রয়োজনগুলোই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে?
দেশ রূপান্তরের ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার এমনই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টির শিক্ষা কার্যক্রম চলছে ভাড়া করা ভবনে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অবকাঠামো, স্থায়ী ক্যাম্পাস এবং পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করার আগেই অনেক প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক সংকট, অপরিকল্পিত বিভাগ চালু, গবেষণার সীমাবদ্ধতা, জনবল নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন এবং বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ। সব মিলিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—আমরা কি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলছি, নাকি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও সংখ্যা বাড়াচ্ছি?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উচ্চতর জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ, কিছু শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত অবকাঠামো, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, পর্যাপ্ত বই ও গবেষণাসামগ্রী, শিক্ষার্থীদের আবাসন এবং স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ। কিন্তু এসব মৌলিক শর্ত পূরণের আগেই যখন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়, তখন প্রতিষ্ঠানটির নামের সঙ্গে যুক্ত মর্যাদা বাস্তব শিক্ষার অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত হয় না।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি এই সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দূরে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ১৫৩ কিলোমিটার এবং মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে। এর পাশাপাশি গোপালগঞ্জের কাছাকাছি শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও রয়েছে।
অর্থাৎ একটি সীমিত ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যেই একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিংবা হওয়ার পথে রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের সবগুলো পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো ও একাডেমিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভাড়া করা ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। নতুন করে প্রতিষ্ঠিত শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমও ভাড়া করা ভবনে শুরু হওয়ার কথা।
এখানে প্রশ্নটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস আছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সীমিত অর্থ, যোগ্য শিক্ষক এবং গবেষণা অবকাঠামোর মধ্যে একের পর এক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ফলে সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কতটা লাভবান হচ্ছে। একটি অঞ্চলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে সেখানে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, শিক্ষার্থীদের চাহিদা, প্রয়োজনীয় বিষয়, শিক্ষক সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বিবেচনা করা জরুরি। তা না হলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় পুরোনো সমস্যারই আরেকটি সংস্করণ হয়ে উঠতে পারে।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি দেড় দশক পেরিয়েও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জনে নানা সমস্যার মুখোমুখি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টির ৩৩টি বিভাগের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ২৪২ জন। তাঁদের মধ্যে ৩০ জন শিক্ষা ছুটিতে থাকায় কার্যকর শিক্ষকসংখ্যা আরও কমে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি বিভাগে শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন বা তারও কম। ফলে বিভাগগুলোর প্রয়োজনীয় পাঠদান, গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার ও আবাসন সুবিধার ঘাটতিও রয়েছে। ৩৩টি বিভাগের জন্য গড়ে দুটির বেশি শ্রেণিকক্ষ না থাকার তথ্যটি শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। একটি বিভাগে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস, ব্যবহারিক শিক্ষা, আলোচনা, পরীক্ষা এবং গবেষণার জন্য যে পরিমাণ জায়গা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই বাধাগ্রস্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স বাড়লেও যদি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষকসংখ্যা নিশ্চিত না হয়, তবে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার মান থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
এই বাস্তবতায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়। আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার ও আবাসনের সংকটে ভুগছে, তখন একই অঞ্চলে আরও নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা উচিত কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ উচ্চশিক্ষার জন্য বরাদ্দ অর্থ সীমাহীন নয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ, ভবন নির্মাণ, প্রশাসনিক কাঠামো গঠন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার একটি অংশ বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি জনবল নিয়োগের বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনটিতে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম উপাচার্য হিসেবে ২০১৮ সালে নিয়োগ পান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রহমান খান। তাঁর মেয়াদ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১০৮ জন শিক্ষক, ৭৯ জন কর্মকর্তা এবং ২৫০ জন কর্মচারী নিয়োগের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২০০।
শিক্ষার্থীর তুলনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা এত বেশি হওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কর্মী প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রয়োজন নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও সম্ভাব্য শিক্ষার্থীসংখ্যা, একাডেমিক কার্যক্রমের পরিধি এবং দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা বিবেচনা করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও গবেষণার প্রয়োজন পূরণ হওয়ার আগেই প্রশাসনিক জনবল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের প্রাধান্য পাওয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। পাশাপাশি ইউজিসির এক পরিচালকের বরাত দিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক সুপারিশে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি, নিয়োগের যোগ্যতার মানদণ্ড এবং স্বাধীন তদন্তের ভিত্তিতে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলো যে প্রশ্ন সামনে আনে, তা হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ কি যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক তদবির সেখানে ভূমিকা রাখছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক নিয়োগ নয়। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন, গবেষণায় নেতৃত্ব দেন, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পেশাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অপর্যাপ্ত যোগ্যতার শিক্ষক নিয়োগের ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, গবেষণার মান কমে যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ছাড়া ২২০ জনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা চলার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। তবে একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে এমন অভিযোগ উঠলে তার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো এক রকম নয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও গবেষণা পরিচালিত হয়, আবার কিছু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ ও নার্সিং প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রম তদারকি করা। ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীসংখ্যা বিচার করা যায় না। কিন্তু যে ধরনের প্রতিষ্ঠানই হোক, তার দায়িত্ব ও প্রয়োজনের সঙ্গে জনবল, ব্যয় এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। এই সামঞ্জস্য নিশ্চিত না হলে জনস্বার্থে বরাদ্দ করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে যোগ্য শিক্ষক তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের মতে, মানসম্মতভাবে পরিচালনার মতো যোগ্য শিক্ষক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যেখানে আট হাজার যোগ্য শিক্ষক প্রয়োজন হতে পারে, সেখানে দেড় শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বক্তব্য উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ নিয়ে একটি মৌলিক বাস্তবতা সামনে আনে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে কয়েক বছর সময় নিয়ে ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু দক্ষ শিক্ষক, অভিজ্ঞ গবেষক এবং উচ্চমানের একাডেমিক নেতৃত্ব রাতারাতি তৈরি করা যায় না। একজন ভালো শিক্ষক হতে প্রয়োজন দীর্ঘ অধ্যয়ন, গবেষণার অভিজ্ঞতা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং নিয়মিত জ্ঞানচর্চা। একইভাবে একটি শক্তিশালী গবেষণা পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রয়োজন ধারাবাহিক অর্থায়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণার স্বাধীনতা।
যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি থাকলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রতিযোগিতায় পড়ে। এতে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেও শিক্ষক চলে যাওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। আবার দ্রুত বিভাগ চালু করার প্রয়োজন মেটাতে অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ বা কম যোগ্য প্রার্থী নিয়োগের ঝুঁকি বাড়ে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ে না। শিক্ষার্থীরা সনদ অর্জন করলেও তাঁদের জ্ঞান, গবেষণার দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম খান নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একাধিক ধাপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাবে প্রাথমিক যাচাইয়ের পর লিখিত পরীক্ষা, শিক্ষার্থীদের সামনে ডেমো ক্লাস এবং সর্বশেষ পর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের বোর্ডের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা রয়েছে। লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়নকারী যেন নিজেরাই উত্তরপত্র মূল্যায়ন না করেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়োগপ্রক্রিয়াকে ব্যক্তিগত পছন্দ, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থেকে মুক্ত রাখা। তবে শুধু লিখিত পরীক্ষা বা ডেমো ক্লাস চালু করলেই সব সমস্যা দূর হবে না। নিয়োগের প্রতিটি ধাপে সুস্পষ্ট মানদণ্ড, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, ফলাফল প্রকাশ এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রার্থীর গবেষণার মান, প্রকাশনার বিশ্বাসযোগ্যতা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং পাঠদানের সক্ষমতাও গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে স্থানীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর যুক্তি থাকতে পারে। রাজধানী বা বড় শহরের বাইরে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যাতে কম খরচে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, সে সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু স্থানীয় চাহিদা পূরণের নামে যদি প্রয়োজনীয় শিক্ষক, অর্থায়ন ও অবকাঠামো ছাড়াই প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়, তাহলে সেই উদ্দেশ্য বাস্তবে পূরণ হওয়ার বদলে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে তাই কয়েকটি বিষয় যাচাই করা অপরিহার্য। ওই অঞ্চলে কতজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আগ্রহী, কোন বিষয়ে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই চাহিদা কতটা পূরণ করতে পারছে, প্রয়োজনীয় শিক্ষক কোথা থেকে আসবেন, গবেষণার জন্য অর্থ কীভাবে বরাদ্দ হবে এবং আগামী ১০ থেকে ২০ বছরে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও একাডেমিক সক্ষমতা কীভাবে বজায় থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আগে খুঁজতে হবে। পাশাপাশি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিদ্যমান কলেজকে উন্নত করা, আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা বিশেষায়িত গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা বেশি কার্যকর হবে কি না, তাও বিবেচনায় নিতে হবে।
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষকসমাজ এবং শিক্ষার্থীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গবেষণার ফলাফল, স্নাতকদের কর্মসংস্থান, পাঠদানের মান এবং অবকাঠামোর ব্যবহার নিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে, সেগুলোর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে রাজনৈতিক সাফল্য বা প্রশাসনিক অর্জনের প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা। একটি জেলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে আনন্দের বিষয় হতে পারে। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকেন, শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগার অপর্যাপ্ত হয়, গ্রন্থাগারে প্রয়োজনীয় বই না থাকে এবং শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে শুধু নামের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি। এই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ, সৃজনশীল ও গবেষণামুখী করে গড়ে তুলতে পারলে দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় যদি শিক্ষার মান, গবেষণা এবং যোগ্য শিক্ষক তৈরির বিষয়গুলো পিছিয়ে পড়ে, তাহলে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো কঠিন হয়ে উঠবে।
দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সামনে এখন তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কতটি হবে, তা নয়। বরং বর্তমানে চালু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কতটি মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছে, কতটি কার্যকর গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে এবং কতটি শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করছে, সেই হিসাব করা প্রয়োজন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট দূর করা, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণ করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিয়ে উচ্চশিক্ষার সাফল্য মাপা যায় না। সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা কী শিখছেন, শিক্ষকরা কীভাবে জ্ঞান সৃষ্টি করছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের জন্য কতটা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে, তার ওপর। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে না পারলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা হয়তো বাড়তেই থাকবে, কিন্তু মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সংকট কাটবে না। উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ রক্ষায় তাই প্রয়োজন আরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা নয়, বরং বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকার অর্থে পূর্ণাঙ্গ, কার্যকর ও মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দৃঢ় অঙ্গীকার।
আপনার মতামত জানানঃ