মানুষকে হত্যা করে তার অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা—এমন অভিযোগ কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্যই স্বাভাবিক হতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের বহুল আলোচিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে আসছে এমন কিছু বর্ণনা, যা শুধু নৃশংসতার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নিরাপত্তা বাহিনী ও জবাবদিহির সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এক সাবেক র্যাব কর্মকর্তার জবানবন্দিতে বর্ণিত হয়েছে, কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সরকারের সমালোচক হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের হত্যা করে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের একটি সাংকেতিক নাম ছিল ‘গল্ফ অপারেশন’।
মানবজমিনের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক র্যাব কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামলার একমাত্র আসামি সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক ও র্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। প্রতিবেদনে প্রকাশিত সাক্ষ্য ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মামলায় উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য, যা গুমের অভিযোগের ধরন, সম্ভাব্য পরিকল্পনা এবং আলামত গোপনের বিষয়গুলো নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—এগুলো আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য, প্রসিকিউশনের বক্তব্য ও অভিযোগের বর্ণনা। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা আদালতের বিচার ও চূড়ান্ত রায়ের বিষয়। কোনো সাক্ষীর বক্তব্যকে এককভাবে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। একইভাবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেজর সাব্বির তার জবানবন্দিতে ২০১০ সালের মে মাসে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলামসহ চারজনকে হত্যার কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সরকারের সমালোচক হিসেবে চিহ্নিত অন্তত ১৫ জনকে গুলি করে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। মরদেহ যেন ভেসে উঠতে না পারে, সে জন্য পেট চিরে সিমেন্ট ভর্তি বস্তা বেঁধে দেওয়া হতো বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এই বর্ণনা শুধু হত্যার অভিযোগ নয়; এর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পিতভাবে মরদেহ গোপন করার একটি পদ্ধতির দাবি। কোনো হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ উদ্ধার, পরিচয় শনাক্তকরণ, ময়নাতদন্ত এবং পরিবারের কাছে হস্তান্তর—এসব প্রক্রিয়া বিচার ও মানবাধিকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মরদেহই যদি এমনভাবে সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে তা আর কখনো পাওয়া না যায়, তাহলে একটি পরিবারের জন্য অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও শোকের কোনো শেষ থাকে না। নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনেরা তখন জানতেও পারেন না, তাদের প্রিয় মানুষটি কোথায়, কীভাবে মারা গেছেন, কিংবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না।
‘গল্ফ অপারেশন’ নামটি এই অভিযোগের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিয়াউল আহসান সামরিক সাংকেতিক ভাষায় এই ধরনের হত্যাকাণ্ডকে ‘গল্ফ’ বলে উল্লেখ করতেন। গল্ফ খেলায় বলকে গর্তে ফেলে দেওয়া হয়। সেই ধারণার সঙ্গে মিল রেখে মানুষ হত্যা করে নদীর গভীরে ডুবিয়ে চিরতরে গুম করে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে এই নামে ডাকা হতো বলে সাক্ষ্যতে দাবি করা হয়েছে।
একটি সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার নতুন কিছু নয়। কিন্তু কোনো সাংকেতিক নাম যদি হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ গোপনের মতো গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। সেই নামের ব্যবহার, নির্দেশদাতা কে ছিলেন, কারা এতে অংশ নিয়েছিলেন, কোথায় এবং কীভাবে অভিযান পরিচালিত হতো—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি। কারণ একটি হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল, নাকি বৃহত্তর কোনো কাঠামোর অংশ ছিল, তা নির্ধারণে এমন তথ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবেদনে বর্ণিত হয়েছে বরগুনার পাথরঘাটার চরদোয়ানী এলাকার কথা। সাক্ষীর বক্তব্য অনুযায়ী, জিয়াউল আহসান নিজস্ব বিশ্বস্ত দল ও ভিকটিমদের নিয়ে সেখানে যেতেন। ভিকটিমদের এমনভাবে ঢেকে রাখা হতো, যাতে তারা পুরুষ না নারী, তা বোঝার উপায় না থাকে বলে আদালতে জানানো হয়। এরপর তাদের ট্রলারে তোলা হতো। মাথায় বা কানের পাশে বালিশ চেপে ধরে গুলি করা হতো বলে সাক্ষ্যতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মরদেহে সিমেন্ট ভর্তি বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো বলে দাবি করা হয়।
এই বর্ণনার প্রতিটি অংশ তদন্তের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। অভিযানের স্থান, ব্যবহৃত ট্রলার, ট্রলারচালক, অস্ত্র, গুলি, মরদেহের অবস্থান, নদীর স্রোত এবং সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য—সবকিছুই প্রমাণের অংশ হতে পারে। বিশেষ করে নদীতে মরদেহ ফেলার অভিযোগের ক্ষেত্রে স্থানীয় জেলে, মাঝি, নদীপথের কর্মী এবং আশপাশের মানুষের সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনো মরদেহ ভেসে উঠেছিল কি না, কোথায় পাওয়া গিয়েছিল, সেটির ময়নাতদন্ত হয়েছিল কি না—এসব তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলামকে হত্যার অভিযোগ এই মামলার সবচেয়ে গুরুতর দাবিগুলোর একটি। ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের কেউ যদি পরবর্তী সময়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকে, তাহলে তা বিচারপ্রক্রিয়া ও সত্য উদ্ঘাটনের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে নজরুল ইসলামসহ চারজনের হত্যার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আদালতের সামনে উপস্থাপিত দলিল, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নদী থেকে নজরুলের মরদেহ ভেসে ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে আর কোনো বাড়াবাড়ি বা তদন্ত না করে সংশ্লিষ্টদের শুধু ফলোআপ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সাক্ষী দাবি করেছেন। এই বক্তব্য সত্য হলে তা তদন্ত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কোনো মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর যথাযথ তদন্ত না হলে শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারই বাধাগ্রস্ত হয় না; ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রেও দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে।
অভিযানের ট্রলারচালক আলকাস মাঝিকে ঘিরেও জবানবন্দিতে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ এসেছে। সাক্ষীর বক্তব্য অনুযায়ী, আলকাস প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সময় ট্রলার চালাতেন। পরে স্থানীয় বাজারে বিষয়টি প্রকাশ করতে শুরু করলে তিনি নজরে আসেন। তাকে ‘এলিমিনেট’ করার দায়িত্ব সাব্বিরকে দেওয়া হয়েছিল বলে সাক্ষ্যতে দাবি করা হয়। সাব্বির এতে অপারগতা প্রকাশ করলে জিয়াউল আহসান নিজেই বিষয়টি দেখবেন বলে জানান। এর কিছুদিন পর জিয়াউলের ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আলকাস আর ফিরে আসেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনাটি প্রমাণিত হলে তা হতে পারে একটি সম্ভাব্য সাক্ষীকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় রয়েছে। আলকাস মাঝি নিখোঁজ হয়েছেন—এমন তথ্য এবং তাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করা হয়েছে—এই দুই দাবির মধ্যে পার্থক্য আছে। নিখোঁজ হওয়ার তথ্যের সঙ্গে হত্যার প্রমাণ যুক্ত করতে হলে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, ফোন রেকর্ড, যাতায়াতের তথ্য, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শী, মরদেহ বা অন্যান্য ফরেনসিক আলামত প্রয়োজন হতে পারে। পরিস্থিতিগত সাক্ষ্যও আদালতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে তার গ্রহণযোগ্যতা ও শক্তি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট প্রমাণের ওপর।
জবানবন্দিতে কথিত ‘সাজানো বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ড আড়াল করতে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক তৈরি করা হতো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিককে অপারেশনস্থলে নিয়ে গিয়ে তাদের ব্রিফ করা হতো এবং পরে সেই অনুযায়ী সংবাদ প্রচারিত হতো। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।
একটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় সাংবাদিকদের উপস্থিতি নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। সাংবাদিকরা কোনো অভিযানে উপস্থিত থাকতে পারেন সংবাদ সংগ্রহের জন্য। কিন্তু যদি কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম জেনে-বুঝে সাজানো ঘটনার প্রচারে সহযোগিতা করে থাকে, তাহলে তার দায় নির্ধারণে প্রমাণ, জ্ঞান ও উদ্দেশ্য—সবকিছুই যাচাই করা প্রয়োজন। প্রসিকিউশন যে ‘অ্যাবেটমেন্ট’ বা অপরাধে সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা বলেছে, সেটি আদালতে প্রমাণের বিষয়। কোনো গণমাধ্যম বা সাংবাদিককে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা ন্যায়সংগত হবে না।
মেজর সাব্বিরের বক্তব্যে উঠে এসেছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও অসহায়ত্বের কথাও। তিনি দাবি করেছেন, এমন হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তৎকালীন ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের কাছে প্রতিকার চেয়েছিলেন। কিন্তু অধিনায়ক জানিয়েছিলেন, তার কিছুই করার নেই। জবানবন্দিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সঙ্গে জিয়াউল আহসানের সরাসরি যোগসাজশ ও একক কর্তৃত্বের অভিযোগও এসেছে।
এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণে কমান্ড চেইন, লিখিত বা মৌখিক নির্দেশ, যোগাযোগের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি। কোনো বাহিনীর সদস্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কতটা জানতেন, কী নির্দেশ দিয়েছিলেন, অপরাধ ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সামগ্রিক দায় নির্ধারণ করা কঠিন। আবার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত হয়ে যায় না। প্রত্যেক ব্যক্তির দায় পৃথক প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত।
এই মামলায় মেজর সাব্বিরের নিজের চাকরি থেকে পদত্যাগের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। তিনি গভীর অনুশোচনা ও মানসিক যন্ত্রণার কারণে পদত্যাগ করেছিলেন বলে সাক্ষ্যতে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনুশোচনা বা পদত্যাগের ঘটনা তদন্তে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, কিন্তু এটি নিজে কোনো নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের সত্যতা প্রমাণ করে না। তার বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য সাক্ষ্য ও দলিলের মিল খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ বহু পরিবারকে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে। নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে—তিনি কোথায়? তার কী হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শোকও যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অনেক পরিবার বছরের পর বছর প্রশাসনের কাছে ঘুরেছে, মামলা করতে চেয়েছে, সংবাদমাধ্যমের দ্বারস্থ হয়েছে। কেউ কেউ স্বজনের ছবি হাতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন আদালত, কারাগার কিংবা সরকারি দপ্তরের সামনে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তির জন্য নয়; ভুক্তভোগী ও স্বজনদের সত্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যও প্রয়োজন। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে হলে সাক্ষ্য যাচাই, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত—সবকিছু নিশ্চিত করতে হবে।
‘গল্ফ অপারেশন’ নামটি তাই শুধু একটি কথিত হত্যাপদ্ধতির সাংকেতিক পরিচয় নয়; এটি একটি বড় প্রশ্নের প্রতীক—কীভাবে ক্ষমতার ছায়ায় কোনো মানুষকে নিখোঁজ করে দেওয়া সম্ভব হয়? কারা নির্দেশ দেয়, কারা বাস্তবায়ন করে, কারা জানে, কারা নীরব থাকে এবং কারা সত্য প্রকাশের চেষ্টা করে? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মেজর সাব্বিরের জবানবন্দিতে বর্ণিত অভিযোগগুলো সত্য হলে তা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইঙ্গিত বহন করবে। কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠার পথ হতে হবে প্রমাণনির্ভর। নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, ফরেনসিক পরীক্ষা, প্রত্যক্ষদর্শীদের নিরাপত্তা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং নথিপত্র পর্যালোচনা—সবকিছুর সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন। শুধু আদালতে একটি চাঞ্চল্যকর বক্তব্য শোনা নয়, সেই বক্তব্যের প্রতিটি দাবি যাচাই করাই হবে প্রকৃত বিচারিক অগ্রগতি।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার ক্ষমতায় নয়, বরং ক্ষমতাবানদেরও আইনের আওতায় আনার সক্ষমতায়। গুম, হত্যা কিংবা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সত্য উদ্ঘাটন হলে তা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়; বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি প্রক্রিয়া। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে নির্দোষ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করাও একই বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব।
নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া মরদেহের গল্প তাই শুধু অতীতের একটি ভয়াবহ বর্ণনা নয়। এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন নিখোঁজ মানুষের পরিবারগুলো উত্তর খুঁজেছে, আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই প্রশ্নের উত্তর এখন আদালত, তদন্তকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে। সত্য যত গভীরেই চাপা থাকুক, ন্যায়বিচারের লক্ষ্য হওয়া উচিত তাকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসা।
আপনার মতামত জানানঃ