গ্রিক জাহাজডুবির ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার হওয়া অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমকে বলা হয় বিশ্বের প্রাচীনতম পরিচিত অ্যানালগ কম্পিউটার। সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের গতিবিধি হিসাব করতে পারত এই জটিল যন্ত্র। আধুনিক কম্পিউটারের জন্মের বহু আগে মানুষ কীভাবে তৈরি করেছিল এমন বিস্ময়কর প্রযুক্তি?
সমুদ্রের নীল অন্ধকারে ডুবে ছিল একটি প্রাচীন জাহাজ। তার ভেতরে ছিল মূর্তি, মুদ্রা, মৃৎপাত্র আর নানা মূল্যবান সামগ্রী। কিন্তু প্রায় দুই হাজার বছর পর সেই জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে এল এমন একটি বস্তু, যা ইতিহাসের প্রচলিত ধারণাকেই নাড়িয়ে দিল। দেখতে অনেকটা ক্ষয়ে যাওয়া ধাতব বাক্সের মতো। মরিচা, চুনাপাথর আর সামুদ্রিক আবরণে ঢাকা। প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে কী অসাধারণ রহস্য।
১৯০১ সালের দিকে গ্রিসের অ্যান্টিকাইথেরা দ্বীপের কাছে ডুবে থাকা একটি জাহাজ থেকে উদ্ধার করা হয় বস্তুটি। প্রথমে প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এটি ছিল অন্য সব প্রাচীন নিদর্শনের মতোই একটি আবিষ্কার। কিন্তু পরে গবেষণায় জানা গেল, এটি কোনো সাধারণ বাক্স নয়। এর ভেতরে ছিল একাধিক সূক্ষ্ম দাঁতযুক্ত চাকা, ঘূর্ণনব্যবস্থা, কাঁটা ও চিহ্ন। এই যন্ত্র আকাশের বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গতিবিধি হিসাব করতে পারত।
বিজ্ঞানীরা এর নাম দেন অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম। সময়ের হিসাবে এটি প্রায় ২ হাজার বছরের পুরোনো। আর বিস্ময়ের জায়গাটি এখানেই—এই যন্ত্র তৈরি হয়েছিল এমন এক যুগে, যখন পৃথিবীতে বিদ্যুৎচালিত কম্পিউটার তো দূরের কথা, আধুনিক যন্ত্রপ্রযুক্তির ধারণাই মানুষের কাছে ছিল অজানা। অথচ প্রাচীন গ্রিক কারিগররা এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন, যা নির্দিষ্ট গাণিতিক অনুপাত ও যান্ত্রিক গতির মাধ্যমে মহাকাশের কিছু জটিল হিসাব করতে পারত।
এটি আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়—প্রাচীন মানুষ এত উন্নত জ্ঞান পেল কোথায়? কীভাবে তারা এমন সূক্ষ্ম দাঁতযুক্ত চাকা বানাল? আর কেনই বা এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা হয়েছিল?
অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমের গল্প শুরু হয় ভূমধ্যসাগরের এক জাহাজডুবির মধ্য দিয়ে। ধারণা করা হয়, জাহাজটি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের কাছাকাছি সময়ে ডুবে যায়। জাহাজে ছিল গ্রিক বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও মূল্যবান বস্তু। সম্ভবত এটি কোনো ধনী ব্যক্তি বা অভিজাত শ্রেণির জন্য সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছিল। সমুদ্রের তলদেশে বহু শতাব্দী ধরে পড়ে থাকার কারণে যন্ত্রটির ধাতব অংশ ক্ষয়ে যায়। পাথর ও সামুদ্রিক আবরণ জমে এর মূল কাঠামো ঢেকে ফেলে।
উদ্ধারের পর প্রথম দিকে যন্ত্রটির গুরুত্ব বোঝা যায়নি। এর কারণও ছিল স্বাভাবিক। বস্তুটি ভেঙে কয়েকটি অংশে পরিণত হয়েছিল। ধাতব চাকার অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাইরের আবরণে জমে থাকা স্তর সরিয়ে ভেতরের অংশ দেখার সুযোগও ছিল সীমিত। তবু গবেষকদের চোখ এড়ায়নি এর অস্বাভাবিক গঠন।
বিশেষ করে দাঁতযুক্ত চাকার উপস্থিতি তাদের আগ্রহী করে তোলে। প্রাচীন গ্রিসে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের চর্চা ছিল উন্নত। কিন্তু এত জটিল যান্ত্রিক ব্যবস্থা বাস্তবে ব্যবহার করা হতো—এমন প্রমাণ খুবই বিরল। ফলে অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম ধীরে ধীরে প্রত্নতত্ত্বের পাশাপাশি বিজ্ঞানের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
যন্ত্রটির প্রকৃত রহস্য বোঝার জন্য প্রয়োজন ছিল এর ভেতরের কাঠামো দেখা। কিন্তু সরাসরি ভেঙে ফেলা সম্ভব ছিল না। কারণ প্রতিটি অংশই ছিল ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান। গবেষকদের তাই ব্যবহার করতে হয় উন্নত প্রযুক্তি। এক্স-রে, কম্পিউটারভিত্তিক ছবি বিশ্লেষণ এবং ত্রিমাত্রিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তাঁরা যন্ত্রটির ভেতরের অংশ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে থাকেন।
এভাবে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম ছিল একটি জটিল গিয়ার সিস্টেম। এর বিভিন্ন চাকা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। একটি চাকা ঘোরালে অন্য চাকার গতিও নির্দিষ্ট অনুপাতে পরিবর্তিত হতো। এই অনুপাতগুলো এমনভাবে নির্ধারিত ছিল, যাতে আকাশের নির্দিষ্ট গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আধুনিক ভাষায় একে অ্যানালগ কম্পিউটার বলা হয়। তবে এখানে কম্পিউটার বলতে বিদ্যুৎচালিত ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ বোঝানো হচ্ছে না। অ্যানালগ কম্পিউটার এমন একটি যন্ত্র, যেখানে কোনো ভৌত পরিবর্তন—যেমন ঘূর্ণন, অবস্থান বা বৈদ্যুতিক সংকেত—ব্যবহার করে হিসাব করা হয়। অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমে সেই কাজটি করত ধাতব দাঁতযুক্ত চাকা।
যন্ত্রটির বাইরের দিকে থাকা কাঁটা ও ডায়ালের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য দেখানো হতো। গবেষণায় জানা গেছে, এটি সূর্য ও চাঁদের অবস্থান এবং চন্দ্রপর্বের হিসাব করতে পারত। অর্থাৎ পূর্ণিমা কখন হবে, অমাবস্যা কখন হবে—এ ধরনের তথ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল। চাঁদের গতির হিসাব করা সহজ নয়, কারণ চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এমন গতিতে, যা সূর্যের আপাত গতির সঙ্গে এক নয়। প্রাচীন গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই পার্থক্য সম্পর্কে জানতেন এবং তা গণনার চেষ্টা করতেন।
অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকগুলোর একটি হলো এর সঙ্গে সারোস চক্রের সম্পর্ক। প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানে সারোস চক্র ব্যবহার করা হতো সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সম্ভাব্য পুনরাবৃত্তি বোঝার জন্য। প্রায় ১৮ বছর ১১ দিন পর সূর্য ও চাঁদের গ্রহণের ধরন অনেকটা পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এই চক্রকে কাজে লাগিয়ে গ্রহণের সময় সম্পর্কে ধারণা দেওয়া সম্ভব ছিল।
যন্ত্রটির পেছনের ডায়ালে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চক্রের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ফলে ধারণা করা হয়, এটি শুধু সাধারণ ক্যালেন্ডার ছিল না। বরং আকাশের ঘটনাগুলোকে নিয়ম ও গাণিতিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকাশ করার একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। জনপ্রিয় লেখায় প্রায়ই বলা হয়, অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম সূর্য, চাঁদ ও সব গ্রহের নিখুঁত অবস্থান নির্ণয় করতে পারত। কিন্তু গবেষণার ভিত্তিতে এমন দাবি সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়। এর কিছু অংশে গ্রহের গতিবিধি দেখানোর ব্যবস্থা ছিল বলে ধারণা করা হয়, তবে যন্ত্রটির সব কাঠামো আজও সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি। তাই একে প্রাচীন বিশ্বের একটি অত্যন্ত উন্নত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনাযন্ত্র বলা বেশি সঠিক।
প্রশ্ন হলো, এই যন্ত্র বানানোর জন্য কী ধরনের জ্ঞান প্রয়োজন ছিল?
প্রথমত, প্রয়োজন ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান। সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের গতির নিয়ম সম্পর্কে ধারণা ছাড়া এমন যন্ত্র তৈরি সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন ছিল গণিত। কারণ একটি চাকা অন্য একটি চাকাকে কতবার ঘোরাবে, কোন অনুপাতে গতি বদলাবে—এসব নির্ধারণ করতে হতো গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে। তৃতীয়ত, প্রয়োজন ছিল ধাতু কাটার দক্ষতা। এত ছোট ছোট দাঁতযুক্ত চাকা তৈরি করতে হলে কারিগরদের অসাধারণ নিখুঁততা অর্জন করতে হয়েছিল।
প্রাচীন গ্রিসে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের চর্চা ছিল গভীর। হিপারকাসের মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চাঁদ ও সূর্যের গতিবিধি নিয়ে কাজ করেছিলেন। আর্কিমিডিসের মতো গণিতবিদ ও প্রকৌশলীরা জটিল যান্ত্রিক যন্ত্র তৈরির দক্ষতার জন্য পরিচিত ছিলেন। অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম সেই জ্ঞানধারার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।
তবে এই যন্ত্রের নির্মাতা কে ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কোনো শিলালিপি বা নির্ভরযোগ্য নথিতে এর নির্মাতার নাম পাওয়া যায়নি। এটি কোনো নির্দিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানীর নকশা ছিল, নাকি কোনো কারিগরি কর্মশালায় তৈরি হয়েছিল—এ নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
আরও একটি রহস্য হলো, এটি একেবারে একক আবিষ্কার ছিল কি না। অর্থাৎ এই ধরনের যন্ত্র কি শুধু একটিই তৈরি হয়েছিল, নাকি প্রাচীন বিশ্বে আরও অনেক অনুরূপ যন্ত্র ছিল? এখন পর্যন্ত অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমের মতো সম্পূর্ণ জটিল যন্ত্রের আর কোনো উদাহরণ পাওয়া যায়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে আর কোনো যন্ত্র ছিল না। প্রাচীন ধাতব বস্তু সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। জাহাজডুবি, যুদ্ধ, লুটপাট ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে অনেক প্রযুক্তির চিহ্ন হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই জায়গাতেই অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম ইতিহাসবিদদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, প্রাচীন প্রযুক্তির ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের ধারণা হয়তো অসম্পূর্ণ। আমরা অনেক সময় মনে করি, আধুনিক প্রযুক্তির আগে মানুষ কেবল সাধারণ যন্ত্র ব্যবহার করত। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়ে এমন কিছু উদ্ভাবন হয়েছিল, যা পরবর্তী যুগে হারিয়ে যায় বা ভুলে যাওয়া হয়।
অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমের সঙ্গে আধুনিক কম্পিউটারের তুলনা এখানেই আকর্ষণীয়। আধুনিক কম্পিউটার বৈদ্যুতিক সংকেত, ট্রানজিস্টর, সফটওয়্যার ও ডিজিটাল গণনার মাধ্যমে কাজ করে। অন্যদিকে অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। এটি মানুষের হাতে ঘোরানো একটি ইনপুটের ওপর নির্ভর করত। ব্যবহারকারী একটি কাঁটা বা হাতল ঘোরালে গিয়ারগুলো নিজেদের নির্দিষ্ট অনুপাতে ঘুরত এবং ডায়ালে ফলাফল দেখানো হতো।
কিন্তু দুই ব্যবস্থার মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই জটিল নিয়মকে একটি যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগত কাঠামোর মাধ্যমে হিসাবযোগ্য করা হয়। আধুনিক কম্পিউটার সফটওয়্যার ও ইলেকট্রনিক সার্কিট ব্যবহার করে। প্রাচীন যন্ত্রটি ব্যবহার করত ধাতব চাকা ও গাণিতিক অনুপাত। এই কারণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমকে কম্পিউটিংয়ের এক প্রাচীন পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এটি কি সত্যিই বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার? এই প্রশ্নের উত্তর কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে দিতে হয়। অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম হলো এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত জটিল অ্যানালগ কম্পিউটিং যন্ত্রগুলোর একটি, এবং সাধারণভাবে একে বিশ্বের প্রাচীনতম পরিচিত অ্যানালগ কম্পিউটার বলা হয়। তবে “প্রথম” শব্দটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদেরা সাবধানী। কারণ এর আগে বা একই সময়ে অন্য কোনো যন্ত্র তৈরি হয়নি—এমন দাবি প্রমাণ করা কঠিন।
অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমের আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো এর ডায়ালগুলো। সামনের দিকে একটি বড় ডায়াল ছিল, যেখানে সূর্য ও চাঁদের অবস্থান দেখানোর ব্যবস্থা ছিল বলে ধারণা করা হয়। পেছনের দিকে ছিল একাধিক সর্পিল ডায়াল, যা দীর্ঘমেয়াদি চক্র দেখাত। এর মধ্যে মেটোনিক চক্রের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন গ্রিক ক্যালেন্ডারে প্রায় ১৯ বছরের একটি চক্র ব্যবহার করা হতো, যেখানে ২৩৫টি চান্দ্রমাস প্রায় ১৯টি সৌর বছরের সমান। এই ধরনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চক্রকে যন্ত্রে যুক্ত করা হয়েছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
এখানে বোঝা যায়, যন্ত্রটি শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনো অনুমান করত না। বরং পর্যবেক্ষণ, গণিত ও যান্ত্রিক নকশাকে একসঙ্গে কাজে লাগানো হয়েছিল। এটি ছিল এক ধরনের জ্ঞানকে অন্য ধরনের প্রযুক্তিতে রূপান্তর করার উদাহরণ।
সমুদ্রের তলদেশে পড়ে থাকা এই যন্ত্র আজও বিজ্ঞানীদের জন্য একটি অসম্পূর্ণ ধাঁধা। এর কিছু চাকা চিহ্নিত করা গেছে, কিছু চাকার কাজ অনুমান করা হয়েছে। অনেক অংশ ভেঙে যাওয়ায় পুরো কাঠামো পুনর্গঠন করা কঠিন। তবু আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকেরা এর সম্ভাব্য নকশা তৈরি করেছেন। বিভিন্ন গবেষণায় কম্পিউটার মডেল ও প্রতিরূপ ব্যবহার করে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, কীভাবে এর চাকা ও ডায়াল কাজ করত।
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এমন পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি বস্তু কেবল দেখলেই তার ব্যবহার বোঝা যায় না। তার ভেতরের প্রযুক্তি, ঐতিহাসিক সময়, ব্যবহারের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য এবং নির্মাণপদ্ধতি—সবকিছু মিলিয়ে একটি ব্যাখ্যা তৈরি করতে হয়। অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।
এই যন্ত্রের আবিষ্কার আমাদের আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তির ইতিহাস সরলরেখায় এগোয় না। আজকের প্রযুক্তি সবসময় আগের যুগের প্রযুক্তির সরাসরি ধারাবাহিকতা নয়। কখনো কোনো সভ্যতা অসাধারণ জ্ঞান অর্জন করে, কিন্তু সেই জ্ঞান পরবর্তী সময়ে হারিয়ে যায়। কখনো একটি আবিষ্কার তৈরি হয়, কিন্তু তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায় না। কখনো যুদ্ধ, অর্থনৈতিক পরিবর্তন বা সামাজিক সংকট প্রযুক্তির ধারাকে থামিয়ে দেয়।
অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম হয়তো এমনই এক হারিয়ে যাওয়া প্রযুক্তির নিদর্শন। এটি দেখায়, প্রাচীন মানুষ কেবল পাথর কেটে মন্দির বানাত না। তারা আকাশের গতিবিধি নিয়ে চিন্তা করত, গাণিতিক নিয়ম তৈরি করত এবং সেই নিয়মকে ধাতব যন্ত্রে রূপ দিত।
যন্ত্রটির সামনে দাঁড়ালে তাই শুধু একটি পুরোনো প্রত্নবস্তু দেখা যায় না। দেখা যায় মানুষের কৌতূহলের ইতিহাস। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছে—সূর্য কেন ওঠে, চাঁদ কেন বদলায়, গ্রহণ কখন হয়, গ্রহগুলো কীভাবে চলে? অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম সেই প্রশ্নগুলোর কিছু উত্তরকে একটি ছোট যান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে ধরে রেখেছিল।
আজ আমরা মোবাইল ফোনে কয়েক সেকেন্ডে গ্রহণের সময় জেনে নিতে পারি। মহাকাশের গ্রহের অবস্থান দেখতে পারি। কম্পিউটার আমাদের জটিল হিসাব করে দেয়। কিন্তু দুই হাজার বছর আগে এসব তথ্য পেতে মানুষকে পর্যবেক্ষণ, গণিত এবং কারিগরি দক্ষতার ওপর নির্ভর করতে হতো। সেই সময়ের একটি যন্ত্র যদি এত উন্নত হতে পারে, তাহলে প্রাচীন জ্ঞানের আরও কত অংশ আমাদের অজানা রয়ে গেছে?
অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া সভ্যতাগুলোকে আমরা অনেক সময় আধুনিকতার মাপকাঠিতে বিচার করি। কিন্তু এই যন্ত্র প্রমাণ করে, আধুনিক প্রযুক্তি আসার বহু আগে মানুষ জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজছিল। তাদের হাতে ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না কম্পিউটার চিপ, ছিল না আধুনিক কারখানা। তবু তারা প্রকৃতির নিয়মকে বোঝার চেষ্টা করেছে এবং সেই বোঝাপড়াকে একটি কার্যকর যন্ত্রে রূপ দিয়েছে।
সমুদ্রের তলদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া ক্ষয়ে যাওয়া ধাতব বাক্সটি তাই শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়। এটি মানুষের মেধা, কৌতূহল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার এক অসাধারণ সাক্ষ্য। প্রায় দুই হাজার বছর আগে তৈরি সেই যন্ত্র আজও আমাদের অবাক করে। কারণ এটি মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ কল্পনা করার আগে আমাদের অতীতের দিকে আরও গভীরভাবে তাকাতে হবে।
হয়তো সমুদ্রের তলদেশে এখনও পড়ে আছে এমন আরও অনেক অজানা গল্প। হয়তো প্রাচীন মানুষের তৈরি কোনো যন্ত্র, কোনো নকশা বা কোনো জ্ঞান আজও অন্ধকারে অপেক্ষা করছে। অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম আমাদের সেই সম্ভাবনার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
আধুনিক কম্পিউটারের জন্মের বহু আগে মানুষ কি মহাকাশের হিসাব করা যন্ত্র বানিয়েছিল? অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজমের উত্তর—হ্যাঁ, অন্তত আংশিকভাবে। আর সেই উত্তর যতটা বিস্ময়কর, তার চেয়েও বিস্ময়কর হলো প্রশ্নটি: প্রাচীন প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন আরও কত অধ্যায় এখনও আমাদের অজানা?
আপনার মতামত জানানঃ