পাকিস্তানের সঙ্গে পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থানে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা এসেছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন (পিসিএ) বলেছে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার মতো ভারতের দেওয়া কারণও আদালত গ্রহণ করেনি। একই সঙ্গে কাশ্মীরে নির্মাণাধীন রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কিছু কাজের ওপর অন্তর্বর্তী সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে আদালত। তবে রায় ঘোষণার পরপরই ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা এই সিদ্ধান্ত মানছে না। নয়াদিল্লির দাবি, ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়ে এই আদালতের কোনো এখতিয়ার নেই এবং রায়ের কোনো প্রভাব ভারতের চলমান প্রকল্পগুলোর ওপর পড়বে না।
একটি পানি বণ্টন চুক্তিকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের এই বিরোধ নিছক পানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কাশ্মীর, দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা, সীমান্ত সংঘাত, কৃষি অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফলে দ্য হেগের এই রায়কে শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। বরং এটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট তীব্র এবং পানি ক্রমেই কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারত-পাকিস্তানের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘস্থায়ী দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর একটি। দুই দেশের মধ্যে ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালের মতো বড় সংঘাত হয়েছে, সীমান্তে বহুবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে; কিন্তু এত কিছুর পরও সিন্ধু পানি চুক্তি টিকে ছিল। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি দুই দেশের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনার একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে।
চুক্তির মূল কাঠামো অনুযায়ী, সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি নদীকে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাবের পানি ব্যবহারের প্রধান অধিকার পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত হয়। আর পূর্বাঞ্চলীয় রাভি, বিয়াস ও শতদ্রুর পানি ব্যবহারের অধিকার মূলত ভারতের হাতে থাকে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে ভারত পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি একেবারেই ব্যবহার করতে পারে না। চুক্তির নির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী ভারত এসব নদীতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ কিছু পানি ব্যবহারের সুযোগ পায়। কিন্তু সেই ব্যবহারকে নির্দিষ্ট নকশা, ধারণক্ষমতা ও পরিচালনাগত শর্তের মধ্যে রাখতে হয়।
পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা সিন্ধু নদী অববাহিকার পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটির বিপুল পরিমাণ কৃষিজমিতে সেচের পানি আসে এই নদীব্যবস্থা থেকে। ফলে ভারতের পক্ষ থেকে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়ানোর যেকোনো উদ্যোগ পাকিস্তানের কাছে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সংবেদনশীল সম্পর্কের মধ্যেই ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কাশ্মীরের একটি পর্যটনকেন্দ্রে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারত হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক বা পাকিস্তানি নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলে। পাকিস্তান অবশ্য হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে। হামলার পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাধিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেয়। এরই অংশ হিসেবে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় নয়াদিল্লি।
চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এত দীর্ঘ সময় ধরে নানা সংঘাতের মধ্যেও পানি চুক্তিকে সরাসরি দ্বন্দ্বের বাইরে রাখার একটি ঐতিহ্য ছিল। ভারত যখন চুক্তি স্থগিত করে, তখন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ আসে। ইসলামাবাদের অবস্থান ছিল, একতরফাভাবে এমন একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত করার অধিকার ভারতের নেই। এর পরপরই দুই দেশের মধ্যে পানি নিয়ে পুরোনো বিরোধ নতুন মাত্রা পায়।
ভারতের অবস্থানের পেছনে কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি পানি ব্যবস্থাপনাকে কৌশলগতভাবে ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। চুক্তি স্থগিতের পর কাশ্মীর অঞ্চলে দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধারে পানি ধারণের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করে ভারত। পাকিস্তান অভিযোগ করে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত চুক্তির নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে নদীর পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইছে।
এর মধ্যেই পাকিস্তান আইনি পথে এগিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে সিন্ধু পানি চুক্তির বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ থাকলেও এবার প্রশ্নটি দাঁড়ায়—ভারত কি একতরফাভাবে চুক্তিটি স্থগিত করতে পারে? আর চুক্তি যদি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটির আইনি ভিত্তি কী? এই প্রশ্নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিয়েছে দ্য হেগের পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন।
আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো পুরোপুরি কার্যকর। ভারতের পক্ষ থেকে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার যে কারণ দেখানো হয়েছে, সেগুলো চুক্তির কার্যকারিতা বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাগত বিরোধ যতই তীব্র হোক, তার কারণে পানি চুক্তির বাধ্যবাধকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না—আদালতের সিদ্ধান্তের মূল তাৎপর্য এখানেই।
রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোতে ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা ও পরিচালনা। আদালত বলেছে, সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর ক্ষেত্রে ভারতকে সিন্ধু পানি চুক্তির নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। এর ফলে কাশ্মীরে ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ওপর পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের আপত্তি আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় আরও গুরুত্ব পেল।
রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আদালতের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। পাকিস্তানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত জানিয়েছে, নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি বাঁধের দেয়াল এবং পানি প্রবেশের কিছু কাঠামো নির্মাণ করতে পারবে না ভারত। ফলে প্রকল্পের কিছু অংশে কাজ সাময়িকভাবে সীমিত থাকবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা। একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নকশা ও কার্যক্রম সিন্ধু পানি চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। তাঁর সিদ্ধান্তের পর আরও ৯০ দিন পর্যন্ত রাতলে প্রকল্পের নির্দিষ্ট অংশে কাজের ওপর বিধিনিষেধ থাকবে। অর্থাৎ এই বিরোধের আইনি প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হচ্ছে না; বরং সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অপেক্ষা করছে।
তবে আদালতের রায় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে ভারতের প্রতিক্রিয়া। নয়াদিল্লি রায় প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, তথাকথিত এই সালিসি আদালতের ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো এখতিয়ার নেই। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের সিদ্ধান্ত এখন বা ভবিষ্যতে তাদের চলমান প্রকল্পগুলোর ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
এখানেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। একদিকে একটি আন্তর্জাতিক সালিসি প্রতিষ্ঠান বলছে, চুক্তি কার্যকর এবং ভারতকে এর বিধান মেনে চলতে হবে। অন্যদিকে ভারত বলছে, এই আদালতই তাদের ওপর এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার রাখে না। ফলে রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নটি কেবল পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক সালিসি ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই এই সালিসি প্রক্রিয়ার এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। ফলে নয়াদিল্লির বর্তমান প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়। অন্যদিকে পাকিস্তান আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। ইসলামাবাদের জন্য এটি কূটনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য, কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ভারত চুক্তির সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এই রায়ের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে ভারত-পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ পানি কূটনীতিতে। দুই দেশের সম্পর্ক যখন রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনায় ভরা, তখন পানি নিয়ে সমঝোতার জায়গা আরও সংকুচিত হতে পারে। আবার একই সঙ্গে চুক্তিটি পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়নি—আদালতের সিদ্ধান্ত সেটিই মনে করিয়ে দিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আলোচনার জন্য একটি আইনি কাঠামো এখনো বিদ্যমান।
সিন্ধু পানি চুক্তির ইতিহাসও দেখায়, পানি কখনো শুধু পানি থাকে না। এটি খাদ্য উৎপাদন, কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পাকিস্তানের মতো পানিনির্ভর কৃষি অর্থনীতির জন্য নদীর প্রবাহের সামান্য পরিবর্তনও বড় অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের জন্যও কাশ্মীরের নদীগুলো জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও আঞ্চলিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ এখানে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের নদীগুলোর ভবিষ্যৎ প্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। হিমবাহ গলন, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি পানির সংকট আগামী দিনে নদীর পানিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে পরিণত করতে পারে। এই বাস্তবতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তির মতো একটি কাঠামো কার্যকর থাকা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্যও এই ঘটনা পরোক্ষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি নিয়ে বিরোধ নতুন কিছু নয়। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদীর পানি নিয়ে যে আইনি ও কূটনৈতিক লড়াই চলছে, তা আঞ্চলিক পানি কূটনীতির একটি বড় উদাহরণ। গঙ্গা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেও দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তির বাধ্যবাধকতা এবং রাষ্ট্রগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তের সীমা—এসব প্রশ্ন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সিন্ধু পানি চুক্তি ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এমন একটি সেতু হিসেবে কাজ করেছে, যা যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। এখন সেই সেতুর ওপরই সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। আদালত বলছে চুক্তি কার্যকর, ভারত বলছে আদালতের এখতিয়ার নেই। ফলে আইনি সিদ্ধান্ত এবং বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সামনে দুটি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, দুই দেশ আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে চুক্তির আওতায় বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভারত আদালতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যানের অবস্থানে অনড় থাকলে পানি নিয়ে বিরোধ আরও রাজনৈতিক ও কৌশলগত রূপ নিতে পারে। দ্বিতীয় পরিস্থিতি বাস্তবায়িত হলে কাশ্মীরের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, নদীর প্রবাহ এবং পানি সংরক্ষণ—সবকিছুই ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার নতুন উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
দ্য হেগের এই রায় তাই শুধু একটি পুরোনো পানি চুক্তির আইনি ব্যাখ্যা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় পানি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ভারত যদি আদালতের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের প্রকল্প এগিয়ে নেয় এবং পাকিস্তান যদি আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে থাকে, তাহলে এই বিরোধ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। আবার দুই দেশ যদি বুঝতে পারে যে পানি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত কারও জন্যই লাভজনক নয়, তাহলে এই রায় নতুন করে আলোচনার সুযোগও তৈরি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে, ভারত ও পাকিস্তান কি পানি ব্যবস্থাপনাকে দ্বিপক্ষীয় সংঘাতের আরেকটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে, নাকি ছয় দশকের পুরোনো চুক্তিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টিকিয়ে রাখার পথ খুঁজবে? কাশ্মীরের পাহাড় থেকে প্রবাহিত নদীর পানি এখন শুধু কৃষিজমি বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয় নয়; এটি দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। দ্য হেগের রায় সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ