বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর হাতে সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান, নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্র, উন্নত গোয়েন্দা প্রযুক্তি এবং বিপুল সামরিক সম্পদ থাকলেই একটি যুদ্ধ জিতে যাওয়া যায়—এই ধারণা বহুদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত সেই ধারণার সামনে আবারও কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক হামলা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অসাধারণ প্রদর্শনের পরও যুক্তরাষ্ট্র তার ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। বরং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক সক্ষমতা ছিল স্পষ্ট। ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ, দূরপাল্লা থেকে হামলা পরিচালনা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে চাপে ফেলার ক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনী যে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্বের অন্য কোনো দেশের পক্ষে এত দূরে গিয়ে এত বড় মাত্রায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা এখনো সহজ নয়। কিন্তু সামরিক সক্ষমতা আর কৌশলগত সাফল্য এক জিনিস নয়। একটি বাহিনী শত্রুর ওপর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিতে পারে, অথচ যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে। ইরানের ক্ষেত্রে ঠিক সেই ব্যবধানটিই ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল লক্ষ্য নির্ধারণ। একটি দেশের সরকারকে কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া—এমন ধারণা সামরিক ইতিহাসে নতুন নয়। বিশ শতকের শুরু থেকেই বিমানশক্তির প্রবক্তারা মনে করতেন, শত্রুর শহর, শিল্প ও অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করলে তার জনগণ ও নেতৃত্ব দ্রুত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। ইতালীয় সামরিক তাত্ত্বিক জিউলিও দুহেতের বিমানশক্তি-নির্ভর যুদ্ধতত্ত্ব এই চিন্তাকে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করেছিল। কিন্তু পরবর্তী এক শতাব্দীর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বারবার দেখিয়েছে, বোমা দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করা সম্ভব হলেও শুধু বোমা ফেলে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া অনেক বেশি কঠিন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। জার্মান বোমারু বিমান লন্ডনে ব্যাপক হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু সেই আক্রমণ ব্রিটিশ জনগণকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেনি; বরং প্রতিরোধের মনোভাব আরও শক্তিশালী করেছিল। পরে মিত্রবাহিনী জার্মানির ওপর বিপুল পরিমাণ বোমা ফেলেও একা বিমান হামলার মাধ্যমে নাৎসি শাসনের পতন ঘটাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত জার্মানির পরাজয় এসেছিল স্থলযুদ্ধ, সামরিক দখল, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং বহুমুখী সামরিক চাপের সম্মিলিত ফলে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধও একই শিক্ষা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বিপুল পরিমাণ বোমা ফেলেছিল। কিন্তু উত্তর ভিয়েতনাম ও ভিয়েত কংয়ের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধ শেষ হয়ে যায়নি। বরং দীর্ঘস্থায়ী বোমাবর্ষণ অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রতিরোধের মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করেছে। অর্থাৎ শত্রুর অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং শত্রুর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ধ্বংস করা এক বিষয় নয়।
ইরানের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি বা পারমাণবিক অবকাঠামোতে আঘাত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে, কিন্তু সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা অনেক কঠিন। কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতা শুধু কয়েকটি ভবন বা সামরিক ঘাঁটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা কাঠামো, রাজনৈতিক সংগঠন, জনগণের জাতীয়তাবোধ এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বিতীয় বড় সমস্যা ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুরোপুরি অকার্যকর করার প্রত্যাশা। আধুনিক প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। একটি মোবাইল লঞ্চার দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়, আড়ালে রাখা যায় এবং প্রয়োজনের সময় হঠাৎ আঘাত করা যায়। একটি গোয়েন্দা ব্যবস্থা কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করার আগেই সেটি অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে। ফলে নিখুঁত অস্ত্র থাকলেও প্রতিটি লঞ্চার ধ্বংসের নিশ্চয়তা তৈরি করা কঠিন।
এই সমস্যার ঐতিহাসিক নজিরও রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনী জার্মানির ভি-১ ও ভি-২ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে লুকিয়ে রাখা, স্থান পরিবর্তন করা এবং শক্ত কাঠামোর আড়ালে পরিচালনা করার কারণে শুধু বিমান হামলা দিয়ে সেগুলো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধেও ইরাকি স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের মোবাইল লঞ্চার ধ্বংসের ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়।
আজকের যুগে এই চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। ড্রোন অপেক্ষাকৃত সস্তা, সহজে উৎপাদনযোগ্য এবং ছোট হওয়ায় এগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। একটি ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ধ্বংস করা সামরিকভাবে সফল হলেও অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। ফলে আধুনিক যুদ্ধের একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—আক্রমণকারী প্রযুক্তি অনেক সময় প্রতিরক্ষার চেয়ে সস্তা।
ইরানের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা হরমুজ প্রণালির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজের সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস পরিবহনের ওপর এই জলপথের গুরুত্ব এত বেশি যে এখানে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববাজারে। তেলের দাম বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হয় এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো নতুন সমস্যার মুখে পড়ে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি কৌশলগত দুর্বলতা প্রকাশ পায়। সামরিক বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তিশালী হলেও একটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য অনেক বড় হতে পারে। অস্ত্রের মজুত, প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ, মাইন অপসারণকারী জাহাজ, সামরিক ঘাঁটির সুরক্ষা এবং জ্বালানি সরবরাহ—এসব বিষয় যুদ্ধের শুরুতে গৌণ মনে হলেও সংঘাত দীর্ঘ হলে এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরেকটি সমস্যা হলো আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঘাঁটি, বিমানক্ষেত্র ও অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইরান যদি এসব স্থাপনা বা সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে সক্ষম হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুটি যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়—একদিকে ইরানের মূল সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে অভিযান, অন্যদিকে নিজের মিত্রদের স্থাপনা রক্ষা। ফলে সামরিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
এখানে একটি মৌলিক সামরিক বাস্তবতা সামনে আসে: আক্রমণ প্রতিহত করার চেয়ে আক্রমণ চালানো অনেক সময় সস্তা হতে পারে। একটি ড্রোন তৈরি ও উৎক্ষেপণের খরচ যদি তুলনামূলক কম হয়, সেটি ধ্বংস করতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হতে পারে। দীর্ঘ সংঘাতে এই অর্থনৈতিক অসমতা আক্রমণকারীর পক্ষে কাজ করতে পারে।
তবে এই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরাজয় হিসেবে সরলভাবে ব্যাখ্যা করাও যথাযথ হবে না। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কিন বাহিনী এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীগুলোর একটি এবং ইরানের ওপর ব্যাপক আকাশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও জনবলের ক্ষয়ক্ষতিও ব্যাপক হতে পারে। ফলে প্রশ্নটি হচ্ছে না যে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী কি না; প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সামরিক শক্তি দিয়ে যে রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা অর্জন করা সম্ভব কি না।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। সামরিক শক্তি দিয়ে আপনি শত্রুর ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু তার রাজনৈতিক ইচ্ছা সবসময় ধ্বংস করতে পারবেন না। কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন করতে চাইলে শুধু বোমা নয়, রাজনৈতিক বিকল্প, স্থলভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক পরিকল্পনাও প্রয়োজন। অন্যথায় পুরোনো সরকার দুর্বল হলেও তার জায়গায় কী আসবে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে আরও বড় সমস্যা।
ইরানের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—দেশটির আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক ও দীর্ঘদিনের সামরিক কৌশল। ইরান শুধু নিজের ভূখণ্ডের সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও দেশটির কৌশলগত প্রভাবের অংশ। ফলে ইরানের ওপর সরাসরি হামলা করলেই তার আঞ্চলিক প্রভাব একদিনে শেষ হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সামরিক নয়, রাজনৈতিক। যুদ্ধের লক্ষ্য যদি পরিষ্কার না থাকে, তাহলে সামরিক সাফল্যও শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। একটি অভিযানের শুরুতে যদি বলা হয় শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে হবে, পরে যদি লক্ষ্য হয় পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো, এরপর যদি সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন উঠে আসে—তাহলে যুদ্ধের সীমা কোথায় শেষ হবে, সেটি নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সামরিক বাহিনীর জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা। এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত নয়, যা সামরিক বাহিনীকে অসম্ভব কিছু করার নির্দেশ দেয়। কারণ যুদ্ধের ময়দানে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, রাজনৈতিক বাস্তবতার বিকল্প তৈরি করতে পারে না।
এখানে নেতৃত্বের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। একজন রাজনৈতিক নেতা যদি কেবল নিজের পছন্দের তথ্য শুনতে চান এবং ভিন্নমতকে দূরে সরিয়ে রাখেন, তাহলে যুদ্ধের ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ কমে যায়। সামরিক বাহিনীর ভেতরে পেশাদার মতামত, গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য থাকা জরুরি। যুদ্ধের সময় নেতার চারপাশে শুধু প্রশংসাকারী থাকলে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—ভুল সিদ্ধান্তকে কেউ সময়মতো ভুল বলে জানাবে না।
ইরান সংঘাতের শিক্ষা তাই শুধু পেন্টাগনের জন্য নয়; রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যও। অস্ত্রের মজুত বাড়ানো, আরও যুদ্ধবিমান কেনা বা আরও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু কোনো দেশের সামরিক কৌশলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা যদি লক্ষ্য নির্ধারণে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত অস্ত্র সেই দুর্বলতা দূর করতে পারবে না।
এই সংঘাত আরও একটি বিষয় সামনে এনেছে—বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও সব ধরনের যুদ্ধ নিজের শর্তে শেষ করতে পারে না। প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধা দেয়, কিন্তু যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করে রাজনীতি, অর্থনীতি, ভূগোল, জনগণের মনোভাব এবং সময়ও। একটি দেশ যত শক্তিশালীই হোক, দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ তাকে ক্রমেই সীমাবদ্ধ করে।
তাই ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংকটকে শুধু একটি সামরিক অভিযানের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি আসলে আধুনিক যুদ্ধের একটি পুরোনো সত্যকে আবার সামনে এনেছে—যুদ্ধ জেতা আর যুদ্ধের উদ্দেশ্য অর্জন করা এক নয়। শত্রুর ওপর ভয়াবহ আঘাত হানা সম্ভব, তার আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তার বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করাও সম্ভব; কিন্তু তার রাজনৈতিক ইচ্ছা, প্রতিরোধের ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলকে একসঙ্গে ভেঙে দেওয়া অনেক বেশি কঠিন।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই: বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রও ভুল কৌশলের বিকল্প নয়। একটি যুদ্ধের আগে যদি লক্ষ্য অস্পষ্ট থাকে, ঝুঁকি ভুলভাবে মূল্যায়ন করা হয় এবং সামরিক বাহিনীর কাছে বাস্তবতার বাইরে গিয়ে ফলাফল দাবি করা হয়, তাহলে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বও কাঙ্ক্ষিত বিজয় এনে দিতে পারে না। ইরানের সঙ্গে সংঘাত সেই বাস্তবতারই আরেকটি কঠিন উদাহরণ হয়ে উঠছে। আর যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই পরিষ্কার হবে—এই সংঘাতে কে কত বেশি বোমা ফেলেছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শেষ পর্যন্ত কে নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে।
আপনার মতামত জানানঃ