
ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের ওপর কাঁটাতারের বেড়া নতুন নয়। নতুন হলো বেড়াটিকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভাষা। একসময় যে সীমান্ত নিয়ে আলোচনা হতো চোরাচালান, মানবপাচার, গবাদিপশু ব্যবসা, সীমান্ত হত্যা কিংবা দুই দেশের নদী ও ছিটমহলের প্রসঙ্গে—এখন তার কেন্দ্রে বসেছে একটি শব্দ: ‘অনুপ্রবেশ’।
শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে আইনগত। কোনো বিদেশি ব্যক্তি বৈধ অনুমতি ছাড়া অন্য দেশে প্রবেশ করলে তাঁকে অনিয়মিত অভিবাসী বলা যায়। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা, প্রবেশকারীর পরিচয় যাচাই এবং আইন অনুযায়ী প্রত্যাবাসনের অধিকারও রয়েছে।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনীতিতে ‘অনুপ্রবেশকারী’ কেবল সীমান্ত অতিক্রমের পদ্ধতি বোঝাচ্ছে না। শব্দটি প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও ভাষাগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে আসা অমুসলিম ব্যক্তিকে ‘নির্যাতিত শরণার্থী’ এবং একই দেশ থেকে আসা মুসলমানকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উপস্থাপনের রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। ফলে কাঁটাতারের বেড়া শুধু দুই রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ভাগ করছে না; পশ্চিমবঙ্গের ভেতরেও কে আপন, কে পর—তার নতুন রেখা টানছে।
৪৫ দিনে ১১২৯ একর
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ও এসএসবিকে ১১২৯ একর জমি হস্তান্তর করেছে। তাঁর দাবি, সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় এসব জমির অনুরোধ ২০১৪ সাল থেকে ঝুলে ছিল। তিনি কাঁটাতার সম্পন্ন করা এবং ‘অনুপ্রবেশ’ বন্ধ করাকে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। ভারত সরকারের আকাশবাণী সংবাদ
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত প্রায় ২২১৬ কিলোমিটার। সরকারি হিসাবে এর বড় অংশে বেড়া থাকলেও নদী, চর, বসতিপূর্ণ এলাকা, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা থেকে নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রাখার কারণে শত শত কিলোমিটার এখনো পুরোপুরি বেড়াবিহীন।
নতুন রাজ্য সরকারের দ্রুত জমি হস্তান্তর তাই বাস্তব সীমান্ত অবকাঠামোর পরিবর্তন। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকায় দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দ্বন্দ্বও কমেছে। কিন্তু এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক মূল্য বেড়েছে ‘কাঁটাতার’কে নিরাপত্তার দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করার কারণে।
সীমান্তে নজরদারি, বৈধ প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ এবং পাচার রোধের প্রয়োজন নিয়ে খুব বেশি বিরোধ নেই। প্রশ্ন হলো—বেড়া নির্মাণের বাস্তব কাজকে ঘিরে কেন বারবার ধর্ম, জনসংখ্যা ও নির্বাচনের ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে?
একটি সংখ্যাহীন আতঙ্ক
‘অনুপ্রবেশ’ কথাটি শক্তিশালী হওয়ার প্রথম কারণ—এর আকার নিয়ে ভয়াবহ সব দাবি থাকলেও নির্ভরযোগ্য মোট সংখ্যা নেই।
ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বিভিন্ন সময়ে দেশটিতে এক কোটি, দেড় কোটি কিংবা দুই কোটি ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ থাকার দাবি করেছেন। অথচ ভারত সরকারই সংসদে একাধিকবার জানিয়েছে, অনিয়মিত প্রবেশ গোপনে ঘটে বলে দেশে অবস্থানরত অবৈধ অভিবাসীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। NDTV-তে সংকলিত সংসদীয় জবাব
সুনির্দিষ্ট তথ্যের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক ভাষ্যকে দুর্বল করেনি; বরং আরও শক্তিশালী করেছে। কারণ যাচাইযোগ্য সংখ্যা না থাকলে ‘অনুপ্রবেশকারী’কে দৃশ্যমান কোনো জনগোষ্ঠী হিসেবে নয়, সীমাহীন অদৃশ্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
কোনো এলাকায় মুসলমানের জনসংখ্যা বেড়েছে—অনুপ্রবেশ। বাংলাভাষী শ্রমিক পাওয়া গেছে—অনুপ্রবেশ। কারও নথিতে বানান বা বয়সের অসংগতি—অনুপ্রবেশ। সীমান্ত জেলায় বিরোধী দল জিতেছে—অনুপ্রবেশকারীর ভোট। এই রাজনৈতিক যুক্তিতে প্রতিটি সামাজিক পরিবর্তনের একটিই সহজ ব্যাখ্যা তৈরি হয়।
কিন্তু জনসংখ্যার পরিবর্তনে জন্মহার, মৃত্যু, শহরমুখী যাত্রা, আন্তজেলা শ্রমস্থানান্তর, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রভাবও থাকে। সেই জটিলতা বাদ দিয়ে সবকিছুকে সীমান্ত পারাপারের ফল বললে রাজনৈতিক প্রচার সহজ হয়, বাস্তবতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
‘শরণার্থী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’: ধর্ম কোথায় প্রবেশ করল
পশ্চিমবঙ্গের পরিচয়ের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বা CAA। আইনটি বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিষ্টানদের নির্দিষ্ট শর্তে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ দেয়। মুসলমানরা এই ব্যবস্থার বাইরে।
২০২৬ সালের আগস্টে অমিত শাহ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের আট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে CAA-র অধীনে নাগরিকত্ব সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই বক্তব্যে তিনি নির্যাতিত অমুসলিমদের নাগরিকত্ব এবং ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ শনাক্ত, বাদ ও বহিষ্কারের নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন। Economic Times
এখানেই সীমান্ত পারাপারের আইনগত প্রশ্ন ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত হয়। দুই ব্যক্তি একই সময়ে, একই সীমান্ত দিয়ে এবং একই ধরনের বৈধ নথি ছাড়া প্রবেশ করে থাকলেও একজনের পরিচয় হতে পারে ‘নির্যাতিত শরণার্থী’, অন্যজনের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’।
আইনের সমর্থকেরা বলবেন, প্রতিবেশী মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রে নির্যাতিত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেওয়া ভারতের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এই যুক্তির মানবিক ভিত্তি আছে। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
তবে সমালোচকদের প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না: নিপীড়ন কি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ঘটে? বাংলাদেশের কোনো মুসলমান রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হলে, কিংবা কোনো নাস্তিক, আদিবাসী বা যৌন সংখ্যালঘু জীবন বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিলে তাঁর মানবিক অবস্থান কী হবে? নাগরিকত্বের দরজা ধর্মের ভিত্তিতে খুললে রাষ্ট্র নিজেই ‘শরণার্থী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’র পরিচয় ধর্ম দিয়ে নির্ধারণ করছে—এমন অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিক।
বাংলা ভাষাই যখন সন্দেহের প্রমাণ
‘বাংলাদেশি’ শনাক্ত করার অভিযানে আরেকটি সমস্যা হলো—ভাষা ও পোশাককে নাগরিকত্বের বিকল্প প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও অন্যান্য অঞ্চলে কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিক বাংলা ভাষায় কথা বলেন। কাজের সন্ধানে তাঁদের অনেকে দিল্লি, মুম্বাই, গুজরাট, রাজস্থান বা দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে যান।
কিন্তু বাংলাভাষী দরিদ্র শ্রমিক—বিশেষ করে মুসলমান—সহজেই ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহের মুখে পড়েন। নথিতে গ্রামের নামের ভুল বানান, আধারের ঠিকানা পুরোনো হওয়া, জন্মসনদ না থাকা কিংবা অন্য রাজ্যের ভাষা না জানার কারণে তাঁকে নাগরিকত্ব প্রমাণের চাপে পড়তে হতে পারে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৫ সালে অভিযোগ করেছিল, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই শত শত জাতিগত বাঙালি মুসলমানকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন। ভারত সরকার অনিয়মিত অভিবাসন রোধের কথা বললেও অধিকার সংগঠনটি পরিচয় যাচাই, আইনজীবীর সহায়তা ও আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। Human Rights Watch
কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে অবৈধভাবে থাকলে আইন অনুযায়ী প্রত্যাবাসন হতে পারে। কিন্তু ‘বাংলা বলেন’, ‘মুসলমান’ কিংবা ‘দরিদ্র শ্রমিক’—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য নাগরিকত্ব হারানোর প্রমাণ হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি সন্দেহকেই প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে সীমান্ত দেশের প্রান্তে আটকে থাকে না; প্রতিটি বাংলাভাষী মুসলমানের শরীরে স্থানান্তরিত হয়।
নির্বাচনে শব্দটির এত শক্তি কেন
পশ্চিমবঙ্গে ‘অনুপ্রবেশ’ কথাটি নির্বাচনীভাবে শক্তিশালী হওয়ার অন্তত চারটি কারণ আছে।
প্রথমত, এটি একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও পরিচয়ের ভয় তৈরি করে। ভোটারকে বলা যায়—আপনার জমি, চাকরি, সরকারি সুবিধা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বাইরের মানুষ নিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষের জন্য তখন দৃশ্যমান কোনো নীতিগত ব্যর্থতার বদলে অদৃশ্য বিদেশিকে দায়ী করা যায়।
দ্বিতীয়ত, এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটকে একত্র করার কার্যকর ভাষা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিচয় দীর্ঘদিন শ্রেণি, ভাষা, বামপন্থা, আঞ্চলিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার মিশ্রণে গড়ে উঠেছিল। ‘অনুপ্রবেশ’ সেই বহুমাত্রিক পরিচয়কে হিন্দু–মুসলমানের সহজ বিভাজনে পুনর্গঠন করে।
তৃতীয়ত, এটি বিরোধী দলকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দেয়। অভিবাসীদের মানবাধিকার বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার কথা বললেই তাদের বিরুদ্ধে ‘অনুপ্রবেশকারীদের ভোটব্যাংক রক্ষা’র অভিযোগ তোলা যায়। ফলে নাগরিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলাটিও রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়।
চতুর্থত, ‘অনুপ্রবেশ’ ভোটার তালিকার সঙ্গে যুক্ত হলে নির্বাচনী ফল বদলানোর সরাসরি হাতিয়ার হতে পারে। ‘Detect, Delete and Deport’—শনাক্ত, ভোটার তালিকা থেকে বাদ, তারপর বহিষ্কার—এই স্লোগানে নিরাপত্তা অভিযান এবং নির্বাচনী তালিকা সংশোধন একই রাজনৈতিক প্রকল্পে যুক্ত হয়।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির প্রচারে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ও ‘জনসংখ্যাগত আগ্রাসন’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। দলটি অনিয়মিত অভিবাসী শনাক্ত, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ এবং প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ISAS–NUS
বাস্তব সমস্যা কি তবে নেই?
পরিচয়ের রাজনীতির সমালোচনা করতে গিয়ে অনিয়মিত অভিবাসনকে কাল্পনিক বলা ভুল হবে। ভারত–বাংলাদেশের দীর্ঘ ও ঘনবসতিপূর্ণ সীমান্ত দিয়ে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া মানুষ পারাপার করেন। মানবপাচারকারী, জাল নথি প্রস্তুতকারী, মাদক ও পণ্য চোরাচালানকারী চক্রও সক্রিয়। অর্থনৈতিক সুযোগ, পারিবারিক যোগাযোগ, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি এবং সীমান্তের দুই পাশের সামাজিক সম্পর্ক মানুষের চলাচলে ভূমিকা রাখে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এসব অপরাধ মোকাবিলা করা, পাচারের শিকার মানুষকে রক্ষা করা এবং বৈধ যাতায়াত সহজ করা। আধুনিক নজরদারি, যৌথ টহল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং নির্ধারিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
২০২৬ সালের জুনে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বৈঠকে সমন্বিত টহল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অননুমোদিত ও জোরপূর্বক সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। ভারত বাংলাদেশকে ২৮৬০ জন সন্দেহভাজন অনিয়মিত অভিবাসীর জাতীয়তা যাচাই করতে বলেছে; অন্যদিকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ‘পুশ-ইন’-এর অভিযোগ তুলেছে। Reuters
এই প্রক্রিয়াই দেখায়, নাগরিকত্ব নির্ধারণ রাজনৈতিক সমাবেশের স্লোগানে হতে পারে না। একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশি বললেই বাংলাদেশ তাঁকে গ্রহণ করতে বাধ্য নয়। জন্মস্থান, পূর্ববর্তী ঠিকানা, পরিবার, সরকারি নথি এবং দুই দেশের যাচাইয়ের মাধ্যমে জাতীয়তা নিশ্চিত করতে হয়।
কাঁটাতার কী করতে পারে, কী পারে না
কাঁটাতারের বেড়া অননুমোদিত পারাপার কঠিন করতে পারে। নজরদারি বাড়াতে পারে। পাচারকারীর নির্দিষ্ট পথ বন্ধ করতে পারে। সীমান্তরক্ষীদের দায়িত্বের এলাকা স্পষ্ট করতে পারে।
কিন্তু বেড়া অভিবাসনের কারণ দূর করতে পারে না। অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, পারিবারিক যোগাযোগ এবং শ্রমের চাহিদা থাকলে মানুষ নতুন পথ খুঁজবে। নদী ও চরাঞ্চলে স্থায়ী বেড়ার কার্যকারিতাও সীমিত।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কাঁটাতার কোনো ব্যক্তির ধর্ম দেখে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে পারে না। সীমান্তে বসানো বেড়া যদি রাজনীতির ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের পাড়া, কর্মস্থল ও ভোটকেন্দ্রে স্থানান্তরিত হয়, তাহলে তার নিরাপত্তামূলক ভূমিকার চেয়ে সামাজিক বিভাজন বড় হয়ে ওঠে।
সীমান্তের বাসিন্দাদের জীবনও এখানে প্রায় অনুপস্থিত। বেড়া নির্মাণের কারণে অনেক জায়গায় কৃষকের জমি সীমান্তরেখা ও বেড়ার মাঝখানে পড়ে। চাষ করতে নির্দিষ্ট গেট ও সময়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। আত্মীয়তা, হাটবাজার ও নদীকেন্দ্রিক জীবনের পুরোনো পথ বদলে যায়। জাতীয় নিরাপত্তার বড় ভাষ্যের নিচে তাঁদের জমি, চলাচল ও জীবিকার প্রশ্ন চাপা পড়ে।
বাংলাদেশের জন্য বার্তা
পশ্চিমবঙ্গের ‘অনুপ্রবেশ’ রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য তিনটি ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রথমত, যাচাইহীন পুশ-ইন বাড়লে সীমান্তে সংঘর্ষ ও মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। ভারতীয় নাগরিক কিংবা অজ্ঞাত জাতীয়তার ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নাম ভারতের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় রাজনীতিতে নিয়মিত নেতিবাচক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হবে। সরকারগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা চললেও সাধারণ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়তে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা CAA ও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পক্ষে নতুন যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের নিজস্ব সাংবিধানিক দায়িত্বের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রয়োজনও।
ঢাকার উচিত অনিয়মিত অভিবাসনের বাস্তবতা অস্বীকার না করা, আবার যাচাইহীন প্রত্যাবাসনও মেনে না নেওয়া। যৌথ জাতীয়তা যাচাই, নির্ধারিত সীমান্তপথে হস্তান্তর, কনস্যুলার সহায়তা এবং প্রতিটি ব্যক্তির পরিচয়ের লিখিত নথি নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত লড়াইটি পরিচয়ের
পশ্চিমবঙ্গে ‘অনুপ্রবেশ’ কথাটি শক্তিশালী, কারণ একটি শব্দ একই সঙ্গে বহু রাজনৈতিক কাজ করছে। এটি সীমান্ত নিরাপত্তার উদ্বেগ প্রকাশ করছে, মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে ভয় তৈরি করছে, অমুসলিম উদ্বাস্তুকে নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, বিরোধীদের ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে অভিযুক্ত করছে এবং ভোটার তালিকা পুনর্গঠনের যুক্তি সরবরাহ করছে।
এ কারণেই শব্দটির মোকাবিলা শুধু ‘অনুপ্রবেশ নেই’ বলে করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক অভিবাসননীতি, স্বচ্ছ পরিসংখ্যান, নিরপেক্ষ নাগরিকত্ব যাচাই এবং ধর্মনির্বিশেষে একই আইনি প্রক্রিয়া।
সীমান্ত সুরক্ষিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সীমান্ত রক্ষার নামে যদি নাগরিকের ভাষা, ধর্ম ও দারিদ্র্যকে সন্দেহের প্রমাণ বানানো হয়, তাহলে কাঁটাতার আর দুই দেশের মাঝখানে থাকে না। সেটি সমাজের ভেতরে প্রবেশ করে—প্রতিবেশীকে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে, নাগরিককে নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়।
তখন প্রশ্নটি আর কে সীমান্ত পেরিয়েছেন, সেটুকু থাকে না। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—পশ্চিমবঙ্গে কার পরিচয়কে নাগরিক বলে বিশ্বাস করা হবে, আর কাকে বারবার নিজের দেশ প্রমাণ করতে হবে?
আপনার মতামত জানানঃ