
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রথম সরকার ক্ষমতায় আসার পর একশ দিন পূর্ণ করেছে। এই সময়ের সাফল্য তুলে ধরতে ৪১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ এবং চার কোটি মানুষের কাছে সরকারের কাজ পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছে দলটি। শিল্প, প্রশাসন, সরকারি কর্মীদের ভাতা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নানা দাবি থাকলেও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে সীমান্তনীতিতে।
নতুন সরকার তার প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ বিএসএফ ও এসএসবিকে ১ হাজার ১২৯ একর জমি দিয়েছে। যে জমির জন্য কেন্দ্র ২০১৪ সাল থেকে অপেক্ষা করছিল বলে তাঁর দাবি।
এর অর্থ শুধু কয়েকশ কিলোমিটার সীমান্তে নতুন কাঁটাতার ওঠা নয়। কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গে একই দলের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভারতের বাংলাদেশ সীমান্তনীতি থেকে একটি বড় রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সরে গেছে। সীমান্তের জমি, রাজ্য পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিকত্ব যাচাই, আটককেন্দ্র এবং কথিত অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করার উদ্যোগ—সব ক্ষেত্রেই দিল্লি ও কলকাতার মধ্যে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সমন্বয় তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি তাই স্পষ্ট: পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত আর শুধু দুই দেশের প্রান্তবর্তী একটি প্রশাসনিক এলাকা থাকছে না; এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং জনসংখ্যাগত রাজনীতির অন্যতম প্রধান পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।
মমতার বাধা থেকে শুভেন্দুর সহযোগিতা
ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার ৯৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অংশই প্রায় ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার। দুই দেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে এটিই দীর্ঘতম।
ভারতের সরকারি হিসাবে পুরো সীমান্তের ৩ হাজার ২৩২ কিলোমিটারের বেশি অংশে বেড়া দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৮৬৪ কিলোমিটার এখনো বেড়াবিহীন, যার কিছু অংশ নদী, জনবসতি ও ভৌগোলিক জটিলতার কারণে বেড়া দেওয়ার অনুপযোগী। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৪৩৫ কিলোমিটার সীমান্ত বেড়াবিহীন থাকার তথ্যও বিভিন্ন আদালত ও সরকারি নথিতে এসেছে। এর একটি বড় অংশে জমি অধিগ্রহণের জটিলতাকে দায়ী করেছে কেন্দ্র। এনইউএস ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার দীর্ঘদিন কেন্দ্রের সীমান্ত বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি ও বিলম্বের অভিযোগের মুখে ছিল। তৃণমূলের বক্তব্য ছিল, জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ এবং ঘনবসতিপূর্ণ সীমান্ত এলাকার বাস্তবতা বিবেচনা না করে পুরো বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিজেপির পাল্টা অভিযোগ ছিল, তৃণমূল তার সংখ্যালঘু ‘ভোটব্যাংক’ এবং কথিত অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করতে ইচ্ছাকৃতভাবে জমি দিচ্ছে না।
শুভেন্দু অধিকারীর সরকার সেই অবস্থান পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরই প্রয়োজনীয় জমি ৪৫ দিনের মধ্যে কেন্দ্রকে দেওয়ার ঘোষণা আসে। পরে অমিত শাহ জানিয়েছেন, ১ হাজার ১২৯ একর জমি ইতোমধ্যে বিএসএফ ও এসএসবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি সীমান্ত সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত নিরাপদ হবে না বলেও মন্তব্য করেছেন। ভারত সরকারের আকাশবাণী সংবাদ
এখানে জমির পরিমাণের চেয়ে রাজনৈতিক গতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক দশক ধরে আটকে থাকার দাবি করা সিদ্ধান্ত নতুন সরকার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কার্যকর করেছে। অর্থাৎ সীমান্ত নিয়ে কেন্দ্রের নীতি বাস্তবায়নে কলকাতা এখন বাধা নয়; বরং সক্রিয় অংশীদার।
বেড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘থ্রি-ডি’
নতুন সরকারের সীমান্তনীতি শুধু বেড়া নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ব্যবহৃত হয়েছিল—‘Detect, Delete and Deport’। অর্থাৎ কথিত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করা, ভোটার তালিকা ও সরকারি নথি থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং ভারত থেকে বহিষ্কার করা।
এই ‘থ্রি-ডি’ নীতির তিনটি পৃথক অথচ পরস্পরসংযুক্ত স্তর রয়েছে।
প্রথমত, সীমান্তে কাঁটাতার, ওয়াচটাওয়ার, ক্যামেরা ও নজরদারি অবকাঠামো বাড়িয়ে অননুমোদিত চলাচল বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের ভেতরে বসবাসকারী মানুষের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করা। তৃতীয়ত, যাদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো।
একই সময়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের অধীনে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে যাওয়া অমুসলিমদের নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়াও দ্রুত করা হচ্ছে। অমিত শাহ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের আট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দ্রুত CAA সনদ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
ফলে নীতিটিতে ধর্মভিত্তিক একটি স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে: নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষের জন্য নাগরিকত্বের পথ সহজ করা হচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশি হিসেবে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও বহিষ্কারের অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।
সমস্যা হলো, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী সমাজের ইতিহাস কাগজপত্রের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। দেশভাগ, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, ছিটমহল, নদীভাঙন, আন্তসীমান্ত বিবাহ এবং কয়েক প্রজন্মের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এই অঞ্চলের জনবিন্যাস তৈরি করেছে। সেখানে নথির সামান্য অসংগতি কাউকে রাতারাতি বিদেশি প্রমাণ করে না।
রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে এই জটিলতা মোকাবিলা করা হলে ভারতীয় নাগরিকরাও হয়রানি, ভোটাধিকার হারানো কিংবা রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে মুসলমান, মতুয়া, দলিত, আদিবাসী এবং দরিদ্র সীমান্তবাসীর কাছে এটি শুধু নিরাপত্তানীতি নয়; নিজেদের পরিচয় প্রমাণের নতুন পরীক্ষা।
সীমান্ত সুরক্ষা ভারতের অধিকার, কিন্তু ‘পুশ-ইন’ নয়
সীমান্তে অননুমোদিত চলাচল, মাদক ও অস্ত্র পাচার, মানবপাচার কিংবা আন্তদেশীয় অপরাধ বন্ধ করা ভারতের বৈধ নিরাপত্তা-স্বার্থ। বাংলাদেশও এসব অপরাধ দমনে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছে। কাঁটাতার নির্মাণের বিরোধিতা করলেই সীমান্ত উন্মুক্ত রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয় না।
বিতর্ক তৈরি হয় বেড়া কোথায় নির্মিত হচ্ছে, সীমান্ত চুক্তি মানা হচ্ছে কি না এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কী পদ্ধতিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে—এসব প্রশ্নে।
১৯৭৫ সালের যৌথ সীমান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমারেখার ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। ভারত সাধারণ কাঁটাতারকে প্রতিরক্ষা স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করে না; বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্নমত জানিয়েছে। নদী, সীমান্তঘেঁষা বাড়িঘর এবং জিরো লাইনের কাছাকাছি জনবসতির কারণে কোথাও কোথাও ১৫০ গজের নিয়ম অনুসরণ করা কঠিন।
এই ব্যতিক্রমগুলো দুই দেশের সম্মতি ও যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে সমাধান করার কথা। কিন্তু একতরফা নির্মাণ হলে তা স্থানীয় উত্তেজনা এবং বিজিবি–বিএসএফ মুখোমুখি অবস্থার কারণ হতে পারে।
আরও গুরুতর বিষয় হলো ‘পুশ-ইন’। ভারত কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে সন্দেহ করলে তার পরিচয় যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের কাছে তথ্য পাঠাতে পারে। নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলে কূটনৈতিক ও সীমান্তবাহিনীর নির্ধারিত ব্যবস্থায় তাকে ফেরত নেওয়া সম্ভব। কিন্তু পরিচয় যাচাই ছাড়া রাতের অন্ধকারে কিংবা অননুমোদিত সীমান্তপথ দিয়ে কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া আইনসম্মত প্রত্যাবাসন নয়।
বাংলাদেশ বলছে, তারা যাচাইয়ের পর নিজ নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত; তবে প্রক্রিয়াটি আইনসিদ্ধ ও মানবিক হতে হবে। ভারতের দাবি, সন্দেহভাজন ২ হাজার ৮৬০ জনের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অনুরোধ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কাছে আটকে আছে। এই বিপরীত অভিযোগই এখন সীমান্ত উত্তেজনার কেন্দ্র। রয়টার্স
বিজিবির হিসাবে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে; তাঁদের মধ্যে ১২০ জন ভারতীয় নাগরিক বলেও দাবি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর আবার পুশ-ইনের চেষ্টা বেড়েছে বলে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের অভিযোগ। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রায় ৪ হাজার ৮৮০ ‘অনুপ্রবেশকারীকে’ ফেরত পাঠানোর দাবি করেছে। সংখ্যাগুলোর মধ্যকার পার্থক্যই দেখায়, স্বচ্ছ যৌথ যাচাই ছাড়া বিষয়টি কত দ্রুত রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হতে পারে। প্রথম আলো
বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক ঝুঁকি
নতুন সীমান্তনীতির প্রথম ঝুঁকি হলো আকস্মিক জনসমাগম ও জোরপূর্বক প্রবেশ। পশ্চিমবঙ্গে পরিচয় যাচাই অভিযান বাড়লে সন্দেহভাজন মানুষ সীমান্তের দিকে ছুটতে পারেন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি, ভারতীয় এবং পরিচয়হীন মানুষ—সব শ্রেণিই থাকতে পারে। যাচাই ছাড়া সবাইকে গ্রহণ করলে বাংলাদেশ নিজের ওপর একটি অনির্ধারিত মানবিক ও নিরাপত্তা সমস্যা চাপিয়ে নেবে।
দ্বিতীয় ঝুঁকি সীমান্তে সংঘর্ষ। বেড়া নির্মাণ, জমি ব্যবহার অথবা কাউকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে স্থানীয় বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। গুলি, আটক, কৃষিজমিতে প্রবেশের বাধা এবং সীমান্ত হাট বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।
তৃতীয় ঝুঁকি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য। পেট্রাপোল–বেনাপোলসহ পশ্চিমবঙ্গের স্থলবন্দরগুলো বাংলাদেশ–ভারত বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। নিরাপত্তা তল্লাশি ও পরিচয় যাচাই কঠোর হওয়া স্বাভাবিক হলেও প্রশাসনিক হয়রানি বা দীর্ঘসূত্রতা পরিবহন ব্যয় বাড়াতে পারে। চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসার প্রয়োজনে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়া বাংলাদেশিদের ভিসা এবং প্রবেশ প্রক্রিয়াও আরও কঠিন হতে পারে।
চতুর্থ ঝুঁকি রাজনৈতিক ভাষার প্রতিক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গে ‘বাংলাদেশি’ শব্দটি যদি নিয়মিতভাবে অপরাধী বা জনসংখ্যাগত হুমকির সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, বাংলাদেশেও ভারতবিরোধী জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হবে। দুই পাশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উগ্রবাদ পরস্পরকে খাদ্য জোগাবে।
একই দলের সরকার কি অন্য দরজা খুলতে পারে?
পরিবর্তনটির একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকও আছে। আগে দিল্লি ও কলকাতার রাজনৈতিক বিরোধ বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে জটিল করেছে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কেন্দ্র কোনো সমঝোতায় আগ্রহ দেখালেও পশ্চিমবঙ্গের আপত্তি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আটকে দিয়েছে।
এখন কেন্দ্র ও রাজ্যে বিজেপির সরকার। ফলে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের ঘাটতিকে আর অজুহাত হিসেবে দেখানোর সুযোগ কমেছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, স্থলবন্দর আধুনিকায়ন, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে।
কিন্তু একই রাজনৈতিক সমন্বয় তিস্তা চুক্তি নিশ্চিত করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পশ্চিমবঙ্গের পানির চাহিদা ও উত্তরবঙ্গের কৃষি-রাজনীতি সরকার বদলের সঙ্গে অদৃশ্য হয়নি। বরং সীমান্ত ও ‘অনুপ্রবেশ’ প্রশ্নে কঠোর অবস্থান বাংলাদেশের প্রতি নমনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়াকে বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
দিল্লি–কলকাতা সমন্বয় তাই বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি। আগে রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে সিদ্ধান্ত থেমে যেত; এখন সিদ্ধান্ত দ্রুত হবে। প্রশ্ন হলো, সেই দ্রুততা সহযোগিতায় ব্যবহৃত হবে, নাকি নিয়ন্ত্রণে।
ঢাকার কী করা উচিত
বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া শুধু প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকলে কার্যকর ফল আসবে না। প্রথম প্রয়োজন দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের একটি স্থায়ী ডিজিটাল ব্যবস্থা। ভারত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তথ্য দিলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা যাচাই করে উত্তর দেওয়ার প্রক্রিয়া থাকা উচিত। সত্যিকারের বাংলাদেশি নাগরিক হলে তাকে নিয়মমাফিক ফিরিয়ে নেওয়া এবং ভারতীয় বা পরিচয়হীন হলে তা প্রমাণসহ প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সীমান্ত বেড়ার প্রতিটি বিতর্কিত স্থানে যৌথ জরিপ ও লিখিত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে হবে। বিজিবি–বিএসএফ সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো শুধু যৌথ ঘোষণায় রেখে না দিয়ে স্থানীয় কমান্ডার পর্যায়ে বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বাড়াতে হবে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কেন্দ্রের অধীন হলেও সীমান্তের জমি, স্থানীয় পুলিশ, পরিবহন, স্থলবন্দর ও রাজনৈতিক পরিবেশে রাজ্য সরকারের বড় ভূমিকা রয়েছে। দিল্লির পাশাপাশি কলকাতার সঙ্গে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ প্রয়োজন।
চতুর্থত, বাংলাদেশকে নিজের সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বা বৈষম্যের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের CAA ও ‘হিন্দু বিপন্ন’ রাজনীতিকে শক্তিশালী করে। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু বাংলাদেশের সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিবেশী দেশের বিভাজনমূলক রাজনীতির জবাবও।
সীমান্ত কি প্রাচীর হবে, নাকি ব্যবস্থাপনার রেখা?
বিজেপি সরকারের প্রথম একশ দিন দেখিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তনীতি মৌলিকভাবে বদলে গেছে। তৃণমূল আমলের অনীহা ও কেন্দ্র–রাজ্য বিরোধের জায়গায় এসেছে দ্রুত জমি হস্তান্তর, কাঁটাতার সম্প্রসারণ, নাগরিকত্ব যাচাই এবং বহিষ্কারের রাজনৈতিক ঘোষণা।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, এই পরিবর্তনকে সাময়িক নির্বাচনী উত্তেজনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেন্দ্র ও রাজ্যের প্রশাসনিক সমন্বয় সীমান্তনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোয় পরিণত করতে পারে।
একটি নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত দুই দেশের জন্যই প্রয়োজন। কিন্তু সীমান্ত সুরক্ষা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার পরস্পরের বিপরীত নয়। যাচাই ছাড়া বহিষ্কার, ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের ভিন্ন মানদণ্ড এবং প্রতিটি বাংলাদেশিকে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দেখার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাড়ানোর বদলে নতুন অসন্তোষ ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার বেড়া নির্মাণের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে আস্থা কাঁটাতার দিয়ে নির্মাণ করা যায় না। আগামী দিনগুলোয় বোঝা যাবে দিল্লি ও কলকাতার নতুন সমন্বয় সীমান্তকে নিয়মতান্ত্রিক ও নিরাপদ করবে, নাকি বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের মাঝখানে আরও উঁচু একটি রাজনৈতিক প্রাচীর তুলে দেবে।
আপনার মতামত জানানঃ