রাজনীতিতে কিছু বিদায় হয় হৈচৈ করে, আবার কিছু বিদায় ঘটে নিঃশব্দে, নিয়মতান্ত্রিক ভাষায় মোড়ানো এক প্রজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে। মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যাওয়াটা অনেকটা সেরকমই। কাগজে-কলমে এটি একজন অসুস্থ মানুষের স্বেচ্ছা অবসর। কিন্তু রাজনৈতিক অলিন্দে যে গল্প ঘুরছে, তাতে এই বিদায়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দিনের দর-কষাকষি, একাধিক পক্ষের হিসাব-নিকাশ এবং শেষ পর্যন্ত একটি নিঃশব্দ সমঝোতা।
গত ২৪ জুলাই স্পিকার তথা সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক প্রধান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন সাহাবুদ্দিন। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তার পদত্যাগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন এবং স্পিকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি হয়। প্রকাশ্যে যা বলা হয়েছে, তার সারমর্ম একটাই—দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি আর দায়িত্বে থাকতে পারছেন না। স্পিকার ও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি বলে দেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণেই রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন, এর বাইরে বলার মতো কিছু নেই। কিন্তু রাজনীতির অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা জানেন, প্রকাশ্য ব্যাখ্যা আর পর্দার আড়ালের বাস্তবতা সব সময় এক হয় না।
একাধিক রাজনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যাচ্ছে, সাহাবুদ্দিনের এই পদত্যাগের পেছনে রয়েছে বিএনপির সঙ্গে হওয়া একটি সুনির্দিষ্ট সমঝোতা। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে, যা টাইমস অফ বাংলাদেশের বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে, বলা হয়েছে যে পদত্যাগের বিনিময়ে সাহাবুদ্দিনকে নির্বিঘ্নে দেশত্যাগের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি পদত্যাগ করবেন এবং বিনিময়ে কোনো বাধা ছাড়াই দেশ ছেড়ে যেতে পারবেন—এই শর্তেই দুই পক্ষ একমত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। রাজনীতিতে এ ধরনের ‘নিরাপদ প্রস্থান’ সমঝোতা নতুন কিছু নয়, তবে বাংলাদেশের মতো উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে এমন সমঝোতা অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ।
সমঝোতার শর্তগুলো নিয়ে অবশ্য স্পষ্ট সীমারেখা টানা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি শুধু সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের আওতায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর জন্য তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে রাজি হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে তার দায়িত্ব পালনকালীন গৃহীত সিদ্ধান্তের জন্য আইনি দায়মুক্তি দেয়—এটি রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য একটি প্রচলিত সাংবিধানিক সুরক্ষা। কিন্তু এই সুরক্ষা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো কর্মকাণ্ড বা বিতর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলেই স্পষ্ট করে দিয়েছে দলটি। অর্থাৎ, সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে যদি কোনো মামলা বা অভিযোগ থেকে থাকে, সেই দায়ভার নিতে বিএনপি প্রস্তুত নয়। এই সূক্ষ্ম বিভাজনটিই বলে দেয়, সমঝোতাটি নিছক সৌজন্যমূলক বিদায় নয়, বরং হিসেব করে সাজানো একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।
বিএনপির নেতাদের অনেকের যুক্তি হলো, সাহাবুদ্দিন যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাই তার দ্রুত দেশত্যাগই সবচেয়ে নিরাপদ পথ বলে মনে করা হচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকারের সময় নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে দীর্ঘদিন দেশে রাখাটা রাজনৈতিকভাবে জটিলতা তৈরি করতে পারে বলেই তাদের ধারণা। এই প্রেক্ষাপটেই পদত্যাগের পর নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সাহাবুদ্দিন নিজেও গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে আগামী ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে তিনি বিদেশে চলে যাবেন। এই বক্তব্য এক অর্থে সমঝোতার বাস্তবায়নের দিকেই ইঙ্গিত করে—পদত্যাগের পরপরই দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি একজন সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির চেয়ে বরং একটি পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার ছাপ বহন করে।
তবে এই সমঝোতা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন। তার বক্তব্য মূলত ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়া নিয়ে কেন্দ্রীভূত—তিনি জানিয়েছেন, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবে এবং এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে নেওয়া হবে। এই মন্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—সমঝোতার বিস্তারিত নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার চেয়ে দলটি বরং সামনের দিকে তাকিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দিকে মনোযোগী।
এই ঘটনাক্রমে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং এই সংক্রান্ত সমঝোতার বিষয়টি দলটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আগে থেকেই জানতেন। জামায়াতের এক জ্যেষ্ঠ নেতার বক্তব্য এই পুরো প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ—তার ভাষায়, তাদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের জন্য চাপ ছিল, এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিএনপিও আর তাকে স্বপদে রাখতে আগ্রহী ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটি সম্মানজনক বিদায়ের পথই বেছে নিয়েছে দলটি, যাতে সরাসরি সাংবিধানিক সংকট বা অভিশংসনের মতো দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ায় যেতে না হয়। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল একাধিক রাজনৈতিক শক্তির চাপ ও দেন-দরবারের ফসল, যেখানে অভিশংসনের পরিবর্তে একটি নিয়ন্ত্রিত প্রস্থানের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়—কৌশলগত কারণেই বিএনপি নেতারা এবং সরকারের প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে সাহাবুদ্দিনের ‘গুরুতর অসুস্থতা’কেই পদত্যাগের মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন। রাজনৈতিক সমঝোতার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ্যে না এনে অসুস্থতার বিষয়টিকে সামনে রাখা হচ্ছে, সম্ভবত এই কারণে যে এটি বিতর্ক এড়িয়ে একটি স্বাভাবিক ও সৌজন্যমূলক আখ্যান তৈরি করে। প্রকাশ্য বক্তব্য ও পর্দার আড়ালের সমঝোতার এই দ্বৈততা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বেলায় এটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আইনি দিক থেকে বিষয়টি নিয়ে খোলাসা করে বক্তব্য দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যদি কোনো মামলা দায়ের হয়, তবে তা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হবে। তিনি স্বীকার করেছেন যে সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে সুরক্ষা দেয়, তবে এই সুরক্ষা অসীম নয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সাহাবুদ্দিনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের দায় বিএনপি নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সমঝোতাটি নিরঙ্কুশ দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ সুরক্ষা—যা কেবল সাংবিধানিক পদে থাকাকালীন সিদ্ধান্তের জন্যই প্রযোজ্য।
রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা, যেখানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্পিকার সাময়িকভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেন। তবে এই ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা নয়। জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ অধিবেশনেই দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। অর্থাৎ, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সাহাবুদ্দিনের এই বিদায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির পদত্যাগ নয়, বরং ক্ষমতা পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কীভাবে সমঝোতা, চাপ এবং কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কাজ করে তার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত। প্রকাশ্যে অসুস্থতার আখ্যান আর অন্তরালে দেশত্যাগের নিশ্চয়তা সংবলিত সমঝোতা—এই দুই স্তরের বাস্তবতা একসঙ্গে মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র। আগামী দিনগুলোতে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং সাহাবুদ্দিনের প্রকৃত দেশত্যাগ কীভাবে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই অধ্যায়ের চূড়ান্ত পরিণতি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর তাই আপাতত সেই দিকেই স্থির।
আপনার মতামত জানানঃ