গতকাল শুক্রবার বিকেল পাঁচটা। ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে তখনো তেমন কোনো আলোড়ন ওঠেনি। কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই খবরটা ছড়িয়ে পড়ল—রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। একটি সাংবিধানিক পদ হঠাৎ শূন্য হয়ে যাওয়ার খবর যেকোনো দেশেই আলোড়ন তোলে, বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হলো না। বঙ্গভবনের সেই চেয়ারটি এখন খালি, আর তা পূরণের দায়িত্ব সাময়িকভাবে বর্তেছে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের ওপর। সংবিধান অনুযায়ী তিনিই এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, যতদিন না নতুন কেউ নির্বাচিত হন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নতুন রাষ্ট্রপতি হবেন কে? সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ বলছে, পদ শূন্য হওয়ার নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। আর যেহেতু সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই ভোটাভুটির আনুষ্ঠানিকতা যা-ই হোক না কেন, বাস্তবে দলটির মনোনীত প্রার্থীই যে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন, তা নিয়ে কারও মনে তেমন সংশয় নেই। আসল আগ্রহ তাই একটাই জায়গায় কেন্দ্রীভূত—বিএনপি শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই এই পদ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছিল। তখন থেকেই দলের কয়েকজন প্রবীণ নেতার নাম ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছিল। এর মধ্যে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ছিল সবচেয়ে বেশি শোনা যাওয়া দুটি নাম। পরে এই তালিকায় যুক্ত হয় স্থায়ী কমিটির আরও দুই সদস্য—আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নাম। সাম্প্রতিক সময়ে এসে আলোচনায় নতুন করে ঢুকে পড়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণিও। এমনকি এক সাবেক প্রধান বিচারপতির নামও কোনো কোনো মহলে শোনা গেছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য তালিকাটা শুরুতে বেশ লম্বাই ছিল।
তবে সরকার ও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানাচ্ছে ভিন্ন এক হিসাবের কথা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরে থেকে কাউকে না এনে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ—জাতীয় স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকেই এবার রাষ্ট্রপতি বানানোর সম্ভাবনা বেশি। যদিও দলীয় ফোরামে এখনো এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি, তবে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতির উত্তরসূরি ঠিক করার প্রস্তুতি বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে অনেকটাই নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে বলে জানা যাচ্ছে।
এই নিঃশব্দ প্রস্তুতির মধ্যেই গত দুই দিনে একটি নাম হঠাৎ করে বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে—স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলামের নাম। প্রাথমিক আলোচনায় যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছিল, তাঁদের মধ্যে দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা শারীরিক নানা প্রতিকূলতাসহ বিভিন্ন বিবেচনায় পিছিয়ে পড়েছেন বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। ফলে সম্ভাব্যদের তালিকা যতটা লম্বা মনে হচ্ছিল, বাস্তবে তা এখন অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে। আর সেই সংক্ষিপ্ত তালিকায় দলের একাংশের সক্রিয় সমর্থন নিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম।
শুধু দলের ভেতরেই নয়, রাজনীতির বাইরের মহলেও মির্জা ফখরুলকে ঘিরে সমর্থনের সুর শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ চোখে পড়ার মতো। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এ প্রসঙ্গে সরাসরি নিজের মত জানিয়েছেন ফেসবুকে। ‘বাংলাদেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন’—এমন শিরোনামে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মির্জা ফখরুলকে এই পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর যুক্তি, শেখ হাসিনার শাসনামলে কঠিন সময়ে দলের হাল ধরে রাখা, দীর্ঘ নির্যাতন সহ্য করা এবং বহু ত্যাগ স্বীকারের অভিজ্ঞতা তাঁকে আলাদা করে তোলে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে মধ্যপন্থা, ভদ্র আচরণ ও বাগ্মিতার দিক থেকেও তিনি অগ্রগণ্য বলে মন্তব্য করেছেন আসিফ নজরুল। তাঁর কথায়, বিএনপিতে যোগ্য আরও কয়েকজন থাকলেও সার্বিক বিবেচনায় মির্জা ফখরুলই এগিয়ে থাকবেন, আর রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেওয়া হলে তিনিই সম্ভবত সবচেয়ে ভালো পছন্দ হবেন।
আসিফ নজরুলের আগে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহও একই রকম মত প্রকাশ করেছিলেন তাঁর ফেসবুক পাতায়। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, কেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অন্যদের চেয়ে এই পদের জন্য বেশি যোগ্য বলে তিনি মনে করেন। রাজনীতির বাইরের এই দুই পরিচিত মুখের প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়াটা লক্ষণীয়, কারণ সাধারণত রাষ্ট্রপতি পদের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রকাশ্যে এভাবে মত দেওয়ার প্রবণতা কম দেখা যায়।
তবে এত আলোচনার মধ্যেও একধরনের সতর্কতার সুরও শোনা যাচ্ছে সরকারের ভেতর থেকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে এখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি। রাজনীতির চিরন্তন বাস্তবতা হলো, পরিস্থিতি যেকোনো সময় দ্রুত বদলে যেতে পারে। ফলে আজ যাঁরা আলোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বলে মনে হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে। এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো অনেকটাই খোলা, আর দলীয় ফোরামে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার আগে কোনো নাম নিয়ে একেবারে নিশ্চিত হয়ে যাওয়াটা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার শুরুটা হয়েছিল অবশ্য একটি আকস্মিক ঘটনা দিয়ে। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ কোনো দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল ছিল না বলেই মনে হচ্ছে জনসমক্ষে আসা তথ্য থেকে। এর আগের দিন স্পিকারের একটি সংক্ষিপ্ত সফর নিয়েও গুঞ্জন উঠেছিল যে রাষ্ট্রপতি বিকেলে বা পরদিন পদত্যাগ করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত তা-ই ঘটল। পদত্যাগপত্রে সাহাবুদ্দিন ব্যক্তিগত অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে, যেখানে চারটি শারীরিক জটিলতার প্রসঙ্গ এসেছে এবং মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির কথাও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন রাষ্ট্রপতির বিদায় এভাবেই হলো—বিস্ময় নিয়ে শুরু হওয়া মেয়াদের সমাপ্তি ঘটল আরেক দফা বিতর্ক আর জল্পনার মধ্য দিয়ে।
এখন সবার নজর সামনের দিকে। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সাংবিধানিক বিধান থাকলেও, সংসদে বিএনপির স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় আসল লড়াইটা হবে দলের অভ্যন্তরেই—কে হবেন দলের মনোনীত প্রার্থী। গত কয়েক দিনে বিএনপির নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে রাজনীতি-সচেতন সব মহলেই এই প্রশ্নটাই ঘুরেফিরে আসছে। যত দিন না আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় সিদ্ধান্ত জানা যাচ্ছে বা প্রকৃত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন এই জল্পনা চলতেই থাকবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সব মিলিয়ে চিত্রটা এমন দাঁড়াচ্ছে—একদিকে দলের ভেতরের ঐতিহ্যবাহী প্রবীণ নেতৃত্ব, যাঁদের নাম শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল; অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে জোরালো হয়ে ওঠা একটি নাম, যাঁর পক্ষে দলের ভেতরে ও বাইরে দুই জায়গাতেই সমর্থনের ঢেউ দেখা যাচ্ছে। মাঝখানে রয়েছে সরকারের সতর্ক অবস্থান, যা মনে করিয়ে দিচ্ছে রাজনীতিতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছুই একেবারে নিশ্চিত নয়। নব্বই দিনের সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা কে হবেন, তা জানতে তাই আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে বাংলাদেশের রাজনীতি-পর্যবেক্ষকদের।
আপনার মতামত জানানঃ