দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় স্থিতিশীল থাকার পর বাংলাদেশে মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট—টিএফআর) আবার বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসফের যৌথভাবে পরিচালিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টর সার্ভে (মিকস) ২০২৫ অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ টিএফআর ২ দশমিক ৩-এ স্থির ছিল, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪-এ। সংখ্যাটি দেখতে সামান্য মনে হলেও এর তাৎপর্য গভীর—স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে এমন উল্টা যাত্রা আগে কখনো দেখা যায়নি।
দীর্ঘ পতনের পর কেন এই মোড় বদল
স্বাধীনতার পরপর বাংলাদেশে টিএফআর ছিল ৬-এর বেশি। ১৯৮২ সালে তা ছিল ৫ দশমিক শূন্য ৭, ১৯৯৪ সালে কমে দাড়ায় ৩ দশমিক ৪, আর ২০০৪ সালে তা নেমে আসে ৩-এ। এরপর দীর্ঘদিন এই হার প্রায় স্থির ছিল, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে তা ২ দশমিক ১৭-এর কাছাকাছি নেমে এসেছিল বলেও তথ্য পাওয়া যায়। জন্মহার নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতের অন্যতম বড় সাফল্যের গল্প। সেই ধারা এখন উল্টে যাওয়ায় জনসংখ্যাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে ফাটল
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে জন্মহার বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের দুর্বলতা। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অধিদপ্তরের প্রায় ২৭ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে, ফলে মাঠপর্যায়ে অনেক পরিবারকল্যান সহকারীকে একাধিক এলাকার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহেও ঘাটত দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ব্যবহারের হারে—২০১৯ সালে বিবহিত নারীদের মধ্যে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ছিল ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে।
অঞ্চলভেদে বৈষম্য
জন্মহারর এই প্রবণতা দেশজুড়ে সমান নয়। মকস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ বিভাগে প্রজনন হার সবচেয়ে বেশি, ২ দশমিক ৮, আর সবচেয় কম রাজশাহী বিভাগে, ২ দশমিক ২। এই বৈষম্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান—সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারীদের মধ্যে এবং কম শিক্ষিত বা নিরক্ষর নারীদের মধ্যে টিএফআর তুলনামূলক বেশি। বাল্যবিবাহকেও এই বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা।
শুধু জন্মসংখ্যা নয়, চাপ পড়বে পুরো ব্যবস্থায়
জনসংখ্যাবিদদের মতে, প্রজনন হার বৃদ্ধির অর্থ শুধু বেশি শিশু জন্ম নেওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহুমুখী চাপ—এই বৃদ্ধি ভবিষ্যত জনসংখ্যা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।  স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের পাশাপাশি ঘন ঘন গর্ভধারণের কারণে মাতৃস্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ার আশংকা রয়েছে।
সমাধানের পথ কী
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ দরকার—মাঠপর্যায়ে জনবল নিয়োগ, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, এবং তরুণ দম্পতিদের মধ্যে সচেতনতামূলক উদ্যোগ। দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য একটাই—টিএফআরকে প্রতিস্থাপনযোগ্য স্তর ২ দশমিক ১-এ ফিরিয়ে আনা।
একটি জরুরি টীকা: পরিসংখ্যনে ভিন্নতা
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও প্রজনন হার নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ভিন্নতা রয়েছে। বিবিএস, ইউএনএফপিএ ও নিপোর্টর হিসাবে মাঝেমধ্যে পার্থক্য দেখা যায়, কারণ পদ্ধতিগত ভিন্নতা ও উপাত্ত সংগ্রহের সময়কাল আলাদা। প্রতিবেদন তৈরির সময় একধিক সূত্র মিলিয়ে দেখা এবং সাম্প্রতিক সরকারি জরিপকে অগ্রাধিকার দেওয়াই সমীচীন।
আপনার মতামত জানানঃ