
ডক্টরেট ডিগ্রি নেই, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গবেষণাগারও নেই—তবু কি একজন প্রান্তিক কৃষক বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে পারেন? ঝিনাইদহের এক নিরক্ষর কৃষকের জীবন প্রমাণ করে দিয়েছে, পারেন। ফসলের মাঠকেই গবেষণাগার বানিয়ে যিনি বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়েছেন, তিনি হরিপদ কাপালী।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
১৯২২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ সদর উপজেলার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হরিপদ কাপালী। বাবা কুঞ্জু লাল কাপালী ও মা সরোধনীর ঘরে জন্ম নেওয়া হরিপদের শৈশব কাটে তীব্র দারিদ্র্যের মধ্যে। মাত্র নয় বছর বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও কৃষিকাজে তাঁর হাতেখড়ি হয় শৈশব থেকেই, আর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁকে একজন সূক্ষ্মদর্শী পর্যবেক্ষকে পরিণত করে।
হরি ধানের আবিষ্কার
নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে নিজের ইরি ধানের জমিতে পরিচর্যা করতে গিয়ে হরিপদের চোখে পড়ে একটি ব্যতিক্রমী ধানগাছ। শত শত একই জাতের ধানগাছের মধ্যে গাছটি ছিল আলাদা—উচ্চতায়, গড়নে, শীষের বৈশিষ্ট্যে। কৃষিকাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝতে পারেন, এটি একটি ভিন্ন কিছু। প্রচলিত ধানের সঙ্গে মিশে না যাওয়ার জন্য তিনি গাছটিকে আলাদা করে চিহ্নিত করে রাখেন এবং তা থেকে বীজ সংগ্রহ করেন।
পরের মৌসুমে সেই বীজ নিজের জমিতে বপন করে হরিপদ পান চমকপ্রদ ফল। তৎকালীন জনপ্রিয় জাত বিআর-১১ বা স্বর্ণা ধানে বিঘাপ্রতি ফলন যেখানে সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ২০ মণ, সেখানে তাঁর নতুন জাতের ধানে ফলন দাঁড়ায় ২০ থেকে ২২ মণ পর্যন্ত। ধানের শীষ পুষ্ট, খড় মজবুত, চাল কিছুটা মোটা হলেও ভাত সুস্বাদু। প্রতিবেশী কৃষকেরা প্রথমে কৌতূহলী হয়ে, পরে নিশ্চিত হয়ে হরিপদের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ শুরু করেন। ১৯৯৪-৯৫ সাল নাগাদ নাম-পরিচয়হীন এই ধান ঝিনাইদহ ছাড়িয়ে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি
কৃষকের মুখে মুখে ছড়ানো এই ধান একসময় গণমাধ্যমের নজরে আসে এবং বিভিন্ন দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজের তত্ত্বাবধানে গবেষক রোকাইয়া বেগমসহ অন্যরা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ চালিয়ে নিশ্চিত হন যে, এটি সত্যিই একটি নতুন ও স্বতন্ত্র ধানের জাত—কোনো কৃষকের কল্পনাপ্রসূত দাবি নয়, বরং জিনগতভাবেই ভিন্ন একটি জাত। এই বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতির পরই আবিষ্কারকের নামানুসারে ধানটির নামকরণ করা হয় “হরি ধান”।
একজন আনুষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন কৃষকের হাতে নতুন উদ্ভিদ-জাত আবিষ্কারের এই ঘটনা বাংলাদেশের কৃষি ও বিজ্ঞান মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর থেকেই তাঁকে সম্মানের সঙ্গে ডাকা হতে থাকে “কৃষক বিজ্ঞানী” নামে।
কৃষিতে প্রভাব ও স্বীকৃতি
হরি ধান শুধু ঝিনাইদহেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। উচ্চ ফলনশীলতা ও প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীলতার কারণে ইরি ও বোরো—দুই মৌসুমেই কৃষকদের কাছে এটি জনপ্রিয়তা পায়। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাগারের বাইরে থেকে, শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একজন কৃষকের নতুন জাত উদ্ভাবনের এই দৃষ্টান্ত কৃষি বিজ্ঞানীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি মনে করিয়ে দেয়, শত-সহস্র বছর ধরে বাংলার কৃষকরাই বিভিন্ন ধানের জাত সৃষ্টি ও সংরক্ষণ করে এসেছেন, যদিও তাঁদের এই অবদান প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরেই থেকে গেছে।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০১৭ সালের ৬ জুলাই ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন হরিপদ কাপালী। কিন্তু তাঁর নাম রয়ে গেছে বাংলাদেশের ধানখেতে, কৃষকের মুখে মুখে, আর কৃষি গবেষণার ইতিহাসে। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিহীন একজন মানুষ কীভাবে নিছক পর্যবেক্ষণ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানের অবদান রাখতে পারেন—হরিপদ কাপালীর জীবন তার একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত। তাঁর গল্প আজও কৃষিবিজ্ঞানীদের মনে করিয়ে দেয়, গবেষণাগার আর মাঠের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করতে পারলে কৃষি খাতে কতটা অভাবনীয় পরিবর্তন সম্ভব।
আপনার মতামত জানানঃ