
পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্তের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রাম এখন নির্বাসনের নীরব সাক্ষী। গত এপ্রিলে রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর চালু হওয়া ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (সনাক্ত, বাতিল ও নির্বাসন) অভিযানের জেরে প্রতিদিন শত শত অনথিভুক্ত বাংলাদেশি অভিবাসীকে সীমান্ত পেরিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। ‘দ্য ওয়্যার’-এর প্রতিবেদক মধু সুধন চট্টোপাধ্যায়ের সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ফিরে যাওয়ার মর্মন্তুদ চিত্র।
হাকিমপুরে যা দেখা গেল
হাকিমপুর, একসময় যেখানে ছিল নিস্তব্ধ গ্রামীণ জীবন, সেখানে এখন প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন নারী-পুরুষ-শিশুসহ শত শত মানুষ। তাঁরা সবাই অনথিভুক্ত বাংলাদেশি অভিবাসী, যাঁদের আটক করা হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত হোল্ডিং সেন্টার থেকে। সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষে এঁদের সরাসরি হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
দ্য ওয়্যার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব মানুষজন একসময় উন্নত জীবনের আশায় ভারতে পা রেখেছিলেন। কেউ এসেছিলেন কাজের সন্ধানে, কেউ বা সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু এখন তাঁদের ফিরতে হচ্ছে ‘যা নিয়ে এসেছিলেন, তার চেয়ে সামান্য বেশি’ নিয়ে—পিছনে পড়ে থাকছে বাড়ি, জমানো টাকা, আর বছরের পর বছর গড়ে তোলা জীবন।
‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ কী?
মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি প্রশাসন ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই এই কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর আওতায়:
| ধাপ | কী হয় |
|---|---|
| সনাক্তকরণ (Detect) | রাজ্য জুড়ে অভিযান চালিয়ে অনথিভুক্ত বিদেশি নাগরিকদের চিহ্নিত করা। |
| বাতিলকরণ (Delete) | তাদের পরিচয় ও নথিপত্র যাচাই করে বৈধতা বাতিল করা। |
| নির্বাসন (Deport) | যাচাই-বাছাই শেষে তাদের সীমান্ত দিয়ে ফেরত পাঠানো। |
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় মানুষের পরিচয়, শ্রমের ইতিহাস, পারিবারিক বন্ধন—সবকিছু ‘বাতিল’ হয়ে যাচ্ছে, এবং তাঁরা হয়ে যাচ্ছেন ‘ডিলিটেড’ নাগরিক।
মানবিক বিপর্যয়ের মুখে হাজারো পরিবার
দ্য ওয়ারের গ্রাউন্ড রিপোর্টে পরিষ্কার হয়ে ওঠে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। হাজারো জীবন বদলে যাচ্ছে এই নির্বাসন অভিযানের ফলে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক:
-
শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত: যাঁদের ফিরতে হচ্ছে, তাঁদের অনেকের সন্তান ভারতেই জন্মেছিল বা ভারতীয় স্কুলে পড়ত।
-
অর্থনৈতিক ধ্বংস: বহু বছর ধরে গড়ে তোলা পেশা, ব্যবসা বা চাকরি মুহূর্তে হারিয়ে যাচ্ছে।
-
মানসিক আঘাত: ‘নির্বাসনের’ আগে কোনও কার্যকর মানসিক সহায়তা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেই।
প্রতিবেদক চট্টোপাধ্যায়ের ভাষ্য, এই মানুষজন ‘রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী নন, তাঁরা অর্থনৈতিক অভিবাসী’—যাঁরা কাজ ও খাদ্যের সন্ধানে সীমান্ত পেরিয়েছিলেন।
আইনি ও মানবাধিকার প্রশ্ন
এই অভিযান বেশ কিছু জটিল প্রশ্ন তুলে দাঁড়িয়েছে—
১. সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কি? নির্বাসনের আগে কি প্রত্যেককে পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে?
২. দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব কী? ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই একতরফা নির্বাসন কর্মসূচি কতটা সহায়ক?
৩. মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে কি? বিশেষ করে শিশু ও নারীদের অধিকার রক্ষায় কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
সরকারি প্রতিক্রিয়া ও বিরোধীদের অবস্থান
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, এই অভিযান ‘আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই’ পরিচালিত হচ্ছে।
বিরোধী দলগুলো অবশ্য এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে ‘মানবিক বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দাবি জানিয়েছে।
‘দ্য ওয়্যার’-এর প্রতিবেদন যা বলছে
দ্য ওয়ারের প্রতিবেদন কোনো পরিসংখ্যানগত তথ্য বা সরকারি সংখ্যা উপস্থাপন করেনি। বরং এটি মানবগল্পের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি ফুটিয়ে তুলেছে—যারা ভারতে ‘আশ্রয়’ খুঁজতে এসেছিল, তাদের এখন ‘নির্বাসন’ খুঁজে দিচ্ছে ইতিহাস। প্রতিবেদকের মতে, হাকিমপুর এখন কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত নয়, এটি ‘মানবিক সীমান্ত’ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনের সারমর্ম: ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ কেবল প্রশাসনিক শব্দ নয়; এটি হাজারো বাস্তব জীবনের গল্প, যারা এখন পথে বসে তাদের অজানা ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
সূত্র: ‘দ্য ওয়্যার’-এর ২৬ জুন ২০২৬-এর প্রতিবেদন “Watch | On the Bengal-Bangladesh Border, Thousands of Lives Could Change Direction”-এর ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ