
সংসদে বাজেট অধিবেশন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে দুর্নীতি, জবাবদিহি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অতীত সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দল শুধু অর্থনৈতিক বিষয়েই মতপার্থক্য প্রকাশ করেনি, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড, আওয়ামী লীগ আমলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান, জুলাই আন্দোলনের মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে। ফলে এবারের বাজেট অধিবেশন কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি দেশের রাজনৈতিক জবাবদিহি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে একটি বিস্তৃত জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দাবি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের প্রতিটি কার্যক্রম দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত। তাঁর মতে, বর্তমান সরকারের ভিত্তিই হচ্ছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। তাই অতীত বা বর্তমান—যে সরকারের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠুক না কেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট, অর্থপাচার ও আর্থিক অনিয়ম যেমন তদন্তের আওতায় আসা উচিত, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলেন, সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উচ্চমাত্রার দুর্নীতির কথা উঠে এসেছে। যদিও তিনি নিজে এ অভিযোগের সত্যতা দাবি করেননি, তবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত বলে মত দেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, বর্তমান সরকার দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দায়মুক্তি দিতে চায় না।
অর্থনৈতিক প্রসঙ্গে তিনি অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্রের তথ্য তুলে ধরে বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ঘাটতির কারণে ‘লুটেরা অর্থনীতি’ এবং ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’-এর বিকাশ ঘটে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময়ে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে এবং মোট পাচারের পরিমাণ প্রায় ২৯ থেকে ৩০ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ এবং মেগাপ্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়গুলোও তিনি অর্থনৈতিক সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে তিনি একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অস্থিরতা মোকাবিলা করেই এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গেও সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন, জাতীয় স্বার্থ ও নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে বিভিন্ন বিষয়ে আপস করে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা হয়েছে। তবে তিনি বলেন, এটি কোনো দুর্বলতা নয়; বরং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, কিছু রাজনৈতিক শক্তির দীর্ঘ সময় নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনাও সেই সময় বিবেচনায় নিতে হয়েছিল।
বাজেট নিয়ে আলোচনায় বিরোধী দলের সদস্যরা সুদভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তে জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর দাবি তোলেন। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, দেশে কার্যকরভাবে জাকাত আদায় করা গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ সম্ভব, যা বাজেট ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে। তিনি একটি জাতীয় জাকাত কমিশন বা পৃথক জাকাত মন্ত্রণালয় গঠনেরও প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি কালো টাকা সাদা করার সুযোগকে তিনি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।
জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সরকারপক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসলামের নামে রাজনীতি করলেও দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। তিনি দলটির প্রতিষ্ঠাকাল, পাকিস্তান প্রশ্নে অবস্থান এবং ১৯৭১ সালের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে বর্তমান রাজনীতিতে তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একই ধারাবাহিকতায় বলেন, জামায়াতে ইসলামী এখনো ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি। তাঁর মতে, অতীতের ভুল স্বীকার করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করলে জাতীয় রাজনীতিতে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে দেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর অর্থনীতি পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, এবারের বাজেট শুধু বার্ষিক আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা নয়; বরং আগামী পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা।
সড়ক, সেতু, নৌপরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বিরোধী দলের বাজেট সমালোচনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। তিনি বলেন, বিরোধী দল হিসেবে এটি তাদের প্রথম অভিজ্ঞতা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা আরও গঠনমূলক সমালোচনা করতে শিখবে। তিনি দাবি করেন, ই-চালান ব্যবস্থা, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ভ্যাট ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, এবারের বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উন্নয়ন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে তিনি সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর বিষয়টিকেও তিনি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন।
সংসদে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয়েও বিভিন্ন মন্ত্রী বক্তব্য দেন। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আগামী চার বছরে ৪১ লাখ পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এবং নতুন ব্যবসা নিবন্ধনের সময় ৩৫৫ দিন থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১৪ দিনে নামিয়ে আনার উদ্যোগ সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
অন্যদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদের কার্যপ্রণালি যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ তুলে ওয়াকআউট করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, গুরুত্বপূর্ণ বিল সময়মতো সংসদ সদস্যদের হাতে পৌঁছানো হয়নি এবং পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে। তবে ডেপুটি স্পিকার জানান, সংসদের বিধি অনুসরণ করেই বিল উত্থাপন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের বাজেট অধিবেশন স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কেবল বাজেটের অঙ্ক নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্নীতির অভিযোগ, অতীত সরকারের জবাবদিহি, অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন—সবকিছুই সংসদীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকার তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধী দল বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো, সংসদীয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন তুলছে। আগামী দিনে তদন্ত প্রক্রিয়া, বাজেট বাস্তবায়ন এবং ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতিই নির্ধারণ করবে এই বিতর্কগুলোর বাস্তব প্রভাব এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ।
আপনার মতামত জানানঃ