ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর অধ্যায়গুলোর একটি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক বারবার যুদ্ধ, সীমান্ত উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদ, কূটনৈতিক সংকট এবং পারমাণবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাতের ধরন আরও বদলেছে। সীমান্তে গোলাগুলি বা সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি এখন ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার সক্ষমতা এবং দূরপাল্লার নির্ভুল হামলা যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামীতে যদি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে সেটি অতীতের যেকোনো সংঘাতের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। একই সঙ্গে আশার বিষয় হলো, দুই দেশই এমন যুদ্ধের সম্ভাব্য মূল্য সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।
২০২৫ সালের মে মাসে সংঘটিত চার দিনের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকে ১৯৭১ সালের পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর আগে ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ ছিল সীমিত ভৌগোলিক পরিসরে সংঘটিত একটি সংঘর্ষ। কিন্তু ২০২৫ সালের সংঘাতে যুদ্ধের বিস্তার ছিল অনেক বেশি। দুই দেশই একে অপরের অভ্যন্তরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে যুদ্ধের নতুন মাত্রা যোগ করে। পাকিস্তান চীন ও তুরস্কের তৈরি বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে, অন্যদিকে ভারত নির্ভর করে ফ্রান্স ও ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ওপর। এই সংঘাত দেখিয়ে দেয় যে দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধ আর শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতারও প্রতিফলন।
এই সংঘাতের সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে। ওই হামলায় ২৬ জন ভারতীয় নিহত হন। ভারতের সরকার হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং জবাবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদ হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরিস্থিতি দ্রুত সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। এর পাশাপাশি ভারত সীমান্ত বন্ধ করে, বাণিজ্য স্থগিত করে এবং বহু দশকের পুরোনো সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তিও স্থগিত রাখে। এই পদক্ষেপ শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কই নয়, দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিকেও নাড়িয়ে দেয়।
তবে ইতিহাস বলছে, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—যুদ্ধের পরও একসময় সংলাপের পথ ফিরে আসে। দেশভাগের পর প্রথম যুদ্ধের পরও দুই দেশ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর সিমলা চুক্তির মাধ্যমে নতুন কূটনৈতিক অধ্যায় শুরু হয়। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পরও শান্তি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আবার ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হলেও ২০২১ সালে দুই দেশ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই উত্তপ্ত হোক না কেন, বাস্তব প্রয়োজনের তাগিদে দুই দেশই শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার চেষ্টা করেছে।
বর্তমান সময়ে নতুন করে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। পাকিস্তান একদিকে আফগান সীমান্তে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলা মোকাবিলা করছে। অন্যদিকে ইরান সীমান্তেও তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। একই সময়ে ভারতকে চীনের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি ধরে রাখতে হচ্ছে। ফলে উভয় দেশই জানে, একাধিক ফ্রন্টে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে লাখ লাখ ভারতীয় ও পাকিস্তানি প্রবাসী কাজ করেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দুই দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে নতুন যুদ্ধ কেবল সামরিক ক্ষতিই নয়, অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি দুই দেশের কিছু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইঙ্গিতও আশাবাদ তৈরি করেছে। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেউ কেউ পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সময়ে দুই দেশের সাবেক কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। এসব উদ্যোগ দেখায় যে, উভয় পক্ষই সংঘাতের ঝুঁকি উপলব্ধি করছে এবং অন্তত সীমিত আকারে হলেও যোগাযোগ বজায় রাখতে আগ্রহী।
তবে এই ইতিবাচক ইঙ্গিতের মধ্যেও উদ্বেগের কারণ কম নয়। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, দুই দেশই হয়তো মনে করতে শুরু করেছে যে পারমাণবিক যুদ্ধের সীমা অতিক্রম না করেও তারা নিয়মিত সীমিত সামরিক সংঘাত চালিয়ে যেতে পারবে। ২০১৬, ২০১৯ এবং ২০২৫ সালের সংঘাতের ধারাবাহিকতা দেখলে বোঝা যায়, প্রতিবারই আগের তুলনায় যুদ্ধের পরিধি ও তীব্রতা বেড়েছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘর্ষকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। কারণ যুদ্ধের সময় ভুল সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপ মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। দুই দেশেই জাতীয়তাবাদী আবেগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুদ্ধের সময় সরকারগুলো সাধারণত জনসমর্থন বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয় এবং বিরোধী কণ্ঠ দুর্বল হয়ে পড়ে। পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। ভারতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান সরকারকে রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেয়। ফলে ভবিষ্যতেও রাজনৈতিক প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রলোভন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা সহজ হবে না।
এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বহির্বিশ্বের ভূমিকাও ক্রমেই বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যেমন গভীর হয়েছে, তেমনি ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের কৌশলগত সম্পর্কও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে ভারত-পাকিস্তানের যেকোনো সংঘাত এখন কেবল দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য, অস্ত্রবাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি বাস্তব এবং অতীতের তুলনায় আরও ভয়াবহ হতে পারে। অন্যদিকে সেই যুদ্ধের সম্ভাব্য মানবিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতি সম্পর্কে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাই সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উত্তেজনাকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা।
দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা শুধু ভারত ও পাকিস্তানের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই ইতিহাসের শিক্ষা, কূটনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক সংযম এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর পথ। কারণ পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশীর মধ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধের মূল্য কোনো পক্ষের পক্ষেই বহন করা সম্ভব নয়।
আপনার মতামত জানানঃ