একটি রাষ্ট্র যখন সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন করে, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে সেই আইন ব্যবহার হবে সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, উগ্রবাদী ও সহিংস গোষ্ঠীগুলোকে দমন করতে। কিন্তু যখন সেই আইনই নিরপরাধ শিশু-কিশোরদের জীবনে ভয়াবহ দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন উঠতে বাধ্য—আইনের উদ্দেশ্য কি সত্যিই পূরণ হচ্ছে, নাকি আইনের প্রয়োগই হয়ে উঠছে নতুন অন্যায়ের হাতিয়ার? চট্টগ্রামের কয়েকজন কিশোরের অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ছিল একটি সাধারণ শুক্রবার। ষোলো বছর বয়সী ইয়াসিন দীর্ঘ দুই বছর পর তার শৈশবের বন্ধু ওয়াসিফের সঙ্গে দেখা করে। তারা দুজনই চট্টগ্রামের বাইতুশ শরফ মসজিদ থেকে জুমার নামাজ শেষে বের হচ্ছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তাদের চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। এলাকায় আওয়ামী লীগের একটি মিছিল যাচ্ছিল। হঠাৎ মানুষ দৌড়াতে শুরু করে, চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কী ঘটছে, তা বোঝার আগেই ইয়াসিন ও ওয়াসিফ নিজেদের একটি পুলিশি অভিযানের মধ্যে আবিষ্কার করে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের আরও অনেকের সঙ্গে একটি পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়। সন্ধ্যা নামার আগেই তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়। যে আইন মূলত জঙ্গি, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলার জন্য তৈরি, সেই আইনের আসামি হয়ে যায় কয়েকজন স্কুলপড়ুয়া কিশোর। তাদের অপরাধ কী ছিল, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী কোনো শিশুকে গ্রেপ্তার করা হলে তার অভিভাবককে দ্রুত জানাতে হবে এবং শিশুকে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে আটক রাখা যাবে না। আইনের ভাষায় শিশুদের আটক রাখা হবে একান্ত প্রয়োজন হলে এবং সেটিও হবে বিশেষ ব্যবস্থার আওতায়। বাস্তবতা অবশ্য অনেক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ইয়াসিন, ওয়াসিফ ও সাজ্জাদের মতো কিশোরদের অভিযোগ, তাদের কাউকেই যথাযথ আইনি সহায়তা বা অভিভাবকের উপস্থিতি ছাড়াই আটক রাখা হয়েছিল।
ইয়াসিনের ভাষ্য অনুযায়ী, মিছিলের সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সে একটি গলিতে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে ওয়াসিফকে প্রথমে কয়েকজন ধরে ফেলে। পরে তার কাছ থেকে ইয়াসিনের ফোন নম্বর নিয়ে ইয়াসিনকেও ডেকে আনা হয়। দুই কিশোরের দাবি, যারা প্রথমে তাদের আটক করেছিল তারা নিজেদের বিএনপি বা যুবদলের কর্মী-সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। যদিও এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পরে পুলিশ এসে তাদের হেফাজতে নেয় এবং থানায় নিয়ে যায়।
থানায় পৌঁছানোর পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, ছবি তোলা হয় এবং আটক রাখা হয়। ইয়াসিনের দাবি, সে পুলিশকে বারবার বলেছিল যে তারা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়নি। কিন্তু তার কথায় কর্ণপাত করা হয়নি। বরং এক পুলিশ সদস্য নাকি তাকে বলেছিলেন, নির্দিষ্ট সংখ্যক আসামি দেখানোর প্রয়োজন রয়েছে, তাই অনেককেই আটক করা হয়েছে। এই অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইনের অপব্যবহারই নয়, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার জন্যও মারাত্মক হুমকি।
এদিকে পরিবারের সদস্যরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জানতেই পারেননি তাদের সন্তান কোথায় আছে। ইয়াসিনের বাবা মোজিবর রহমান ছেলেকে খুঁজতে বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়ান। ফোন বন্ধ থাকায় কোনো যোগাযোগও সম্ভব হয়নি। পরে জানতে পারেন, তার ছেলে থানায় আটক রয়েছে। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে ছেলের মুক্তির অনুরোধ জানান। কারণ সামনে ছিল মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ইয়াসিনসহ অন্যদের কারাগারে পাঠানো হয়।
ওয়াসিফের বাবা জানান, কারাগারে থাকার সময় তাদের ছেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন ছিল। প্রথম দেখা হওয়ার সময় ওয়াসিফ কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে জানায়, দীর্ঘ সময় তারা ঘুমাতে পারেনি এবং খাবারের অবস্থাও ছিল অত্যন্ত খারাপ। অন্যদিকে ইয়াসিনের বাবার স্মৃতিতে সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্তটি ছিল যখন ছেলে শুধু একটু পানি চেয়েছিল। একজন বাবার জন্য সেই অসহায় মুহূর্তের বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
ঘটনার আরও ভয়াবহ দিক সামনে আসে সাজ্জাদের বর্ণনায়। তার দাবি, ডাবল মুরিং থানায় নিয়ে যাওয়ার পর আটক কিশোরদের জোর করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করানো হয়। ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদের দিয়ে বক্তব্য দেওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। এমনকি নির্যাতনের অভিযোগও উঠে আসে। সাজ্জাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছিল। কান, গলা ও পেটে শক প্রয়োগ করা হয় বলে সে দাবি করে। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিশোরদের দিয়ে এমন কিছু কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়েছিল যা তারা পড়ার সুযোগই পায়নি। তাদের বলা হয়েছিল, স্বাক্ষর করলে মুক্তি দেওয়া হবে। আইন ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে এমন আচরণ সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর কাছ থেকে জোরপূর্বক বা না বুঝিয়ে স্বাক্ষর নেওয়া গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবীরা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা শিশু আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। একজন শিশুকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার আগে তার বয়স, মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পটভূমি এবং ঘটনার বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অভিযানের সময় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না।
পরবর্তীতে ইয়াসিন ও সাজ্জাদকে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। নামের সঙ্গে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি থাকলেও তাদের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। তারা জানান, কেন্দ্রটিতে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি শিশু রাখা হয়েছিল। ছোট ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হতো। ইয়াসিনের ভাষায়, পরিস্থিতি ছিল মাছের বাজারে বরফের মধ্যে ইলিশ মাছ স্তূপ করে রাখার মতো। সেই কারণেই বন্দিরা জায়গাটিকে ‘ইলিশ ফাইল’ নামে ডাকত।
সেখানে একটি অঘোষিত ক্ষমতার কাঠামোও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পুরোনো ও প্রভাবশালী বন্দিরা নতুনদের ওপর কর্তৃত্ব করত। শৌচাগার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বৈষম্য ছিল। ছোটখাটো ভুলের জন্য মারধরের মতো শাস্তি দেওয়া হতো। সাজ্জাদ জানান, কেন্দ্রে পৌঁছানোর প্রথম দিনই তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে কতটা অবগত ছিল বা ব্যবস্থা নিয়েছিল, সে প্রশ্নও থেকে যায়।
অবশেষে প্রায় এক মাস পর তারা জামিনে মুক্তি পায়। কিন্তু কারাগার ও আটক কেন্দ্রের দরজা পেরিয়ে এলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। ইয়াসিন পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারেনি। একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় সে পরবর্তী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারায়। ওয়াসিফের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। আদালতে যাতায়াত, মামলা পরিচালনা এবং সামাজিক চাপ তাদের জীবনে নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সাজ্জাদের ক্ষেত্রে প্রভাব আরও গভীর। তার ভাষায়, আটক জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। সে এখনও অস্থিরতা অনুভব করে, স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভোগে। শিশু বয়সে এমন মানসিক আঘাত দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিশুদের সুরক্ষার জন্য যে আইন বিদ্যমান, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর? শিশু আইন স্পষ্টভাবে বলছে, শিশুদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে হবে এবং তাদের পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা যদি হয় ভয়, নির্যাতন, কারাবাস ও মানসিক ট্রমা, তাহলে সেই আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
সন্ত্রাসবিরোধী আইন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সেই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদি যথাযথ জবাবদিহি না থাকে, তাহলে নিরপরাধ মানুষের জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এমন ভুলের মূল্য অনেক বেশি। কারণ তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, শিক্ষাজীবন এবং মানসিক বিকাশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
ইয়াসিন, ওয়াসিফ ও সাজ্জাদের গল্প শুধু তিনজন কিশোরের গল্প নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের ভারসাম্য রক্ষা করা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আইন প্রয়োগের নামে যদি শিশুদের অধিকার উপেক্ষিত হয়, তবে সেই সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু কঠোর আইন প্রণয়নে নয়, বরং সেই আইন প্রয়োগের সময় সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকে, তার ওপরও নির্ভর করে। আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, চট্টগ্রামের এই কিশোরদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিশু অধিকার ও বিচারব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ