বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়, এটি একটি প্রতীক। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। বহু প্রজন্মের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের উৎস এবং জাতির বিবেক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ঐতিহ্যের এই প্রতিষ্ঠান কি আজও তার একাডেমিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে পেরেছে, নাকি অতীতের গৌরবের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর সংকট?
সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ একটি পডকাস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে “কোচিং সেন্টার” বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, গবেষণার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তর সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। মন্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এই বক্তব্যকে অবমাননাকর, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং ইতিহাসবিবর্জিত বলে আখ্যা দেন।
প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত ববি হাজ্জাজ নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। তিনি স্বীকার করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক অবদান অনস্বীকার্য এবং তার বক্তব্য অনেকের মনে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু বিতর্কের উত্তাপে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যায়—বক্তব্যের ভাষা আপত্তিকর হতে পারে, কিন্তু বক্তব্যের মূল বক্তব্য কি সম্পূর্ণ ভুল ছিল?
এখানেই শুরু হয় আসল আলোচনা।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা প্রায়ই প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহাসিক অবদান নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞান উৎপাদনের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে তুলনামূলক কম কথা বলি। অথচ বিশ্বের যেকোনো শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে গবেষণা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর একটি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতগুলো গবেষণা প্রকাশ করছে, সেগুলো কতবার উদ্ধৃত হচ্ছে, কতটা নতুন জ্ঞান তৈরি করছে এবং সমাজের জন্য কতটা কার্যকর সমাধান তৈরি করছে—এসবই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নির্ধারণ করে।
এই প্রেক্ষাপটে ববি হাজ্জাজের বক্তব্য নতুন নয়। বরং কয়েক সপ্তাহ আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায় একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শিক্ষক নিয়োগ, দুর্বল গবেষণা সংস্কৃতি এবং মানসম্পন্ন একাডেমিক প্রকাশনার অভাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তার বক্তব্য ছিল আরও সরাসরি। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে গবেষণা, উদ্ধৃতি এবং উদ্ভাবনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ এবং শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের উন্নতি সম্ভব নয়।
অর্থাৎ দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বও যে সমস্যাগুলোর কথা বলছেন, ববি হাজ্জাজও মূলত সেগুলোকেই সামনে এনেছিলেন। পার্থক্য ছিল কেবল ভাষার ব্যবহার এবং বক্তব্য উপস্থাপনের ধরনে।
সমস্যার গভীরে গেলে দেখা যায়, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সীমিত। সাম্প্রতিক বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গবেষণা খাতে বরাদ্দ মোট ব্যয়ের তুলনায় খুবই কম। কয়েক হাজার শিক্ষক এবং অসংখ্য বিভাগ ও গবেষণা প্রকল্পের জন্য এই অর্থ কার্যত অপ্রতুল।
আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করতে প্রয়োজন উন্নত ল্যাবরেটরি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবেশাধিকার, গবেষণা সহকারী, ভ্রমণ অনুদান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে সীমিত সম্পদ নিয়েই কাজ করতে হয়। ফলে গবেষণা প্রায়ই ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তখন তাকে গবেষণার দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো সুসংগঠিত কাঠামো খুব একটা চোখে পড়ে না। গবেষণা কীভাবে করতে হয়, আন্তর্জাতিক জার্নালে কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, গবেষণা প্রস্তাব কীভাবে লিখতে হয়—এসব বিষয়ে পদ্ধতিগত সহায়তা সীমিত।
যেসব শিক্ষার্থী গবেষণায় ভালো করেন, তাদের অনেকেই তা করেন নিজের আগ্রহ, পরিশ্রম এবং কিছু সহায়ক শিক্ষকের ব্যক্তিগত উদ্যোগের কারণে। অর্থাৎ সাফল্য আসে ব্যক্তিগত সংগ্রামের মাধ্যমে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কারণে নয়। এই বাস্তবতা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই কমবেশি সত্য।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে। একটি প্রকৃত গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হলো গবেষণা। কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, সেগুলোর মান কেমন, আন্তর্জাতিকভাবে কতটা স্বীকৃতি পেয়েছেন—এসব বিষয় গুরুত্ব পায়।
কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়, গোষ্ঠীগত আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে প্রভাব ফেলে। যদিও এ বিষয়ে সবসময় বিতর্ক রয়েছে, তবুও এই অভিযোগ এতটাই বিস্তৃত যে এটি এখন প্রায় জনপরিসরের আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
ফলে প্রশ্ন ওঠে, যদি গবেষণা উৎপাদন এবং একাডেমিক উৎকর্ষতা নিয়োগের প্রধান ভিত্তি না হয়, তাহলে গবেষণা সংস্কৃতি কীভাবে শক্তিশালী হবে?
এখানেই ববি হাজ্জাজের মন্তব্যকে ঘিরে প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সমালোচনার জবাবে অনেকেই তার বক্তব্যের ভাষার বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে তুলনামূলক কম আলোচনা হয়েছে। ফলে যে সুযোগটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পথ খুলে দিতে পারত, সেটি অনেকাংশেই আবেগনির্ভর বিতর্কে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও অবদান নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এই প্রতিষ্ঠানই ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। এখান থেকেই স্বাধীনতার চেতনা শক্তিশালী হয়েছে। অসংখ্য শিক্ষক, গবেষক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক নেতা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েছেন। দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে এর অবদান অনস্বীকার্য।
কিন্তু অতীতের গৌরব বর্তমানের দুর্বলতাকে আড়াল করতে পারে না। বরং ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ মানুষ তাদের কাছ থেকেই নেতৃত্ব আশা করে।
বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় শত বছরের ঐতিহ্য বহন করলেও তারা নিয়মিত নিজেদের সংস্কার করে। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করে এবং শিক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে। কারণ তারা জানে, ইতিহাস সম্মান এনে দিতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও একই কথা প্রযোজ্য। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিই দেশের উচ্চশিক্ষার নেতৃত্ব ধরে রাখতে চায়, তাহলে গবেষণা খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ, স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণামুখী পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এটিই যে সমালোচনা সবসময় শত্রুতা নয়। কখনও কখনও সমালোচনা একটি আয়নার মতো কাজ করে, যেখানে প্রতিষ্ঠান নিজের দুর্বলতাগুলো দেখতে পারে। অবশ্যই সমালোচনার ভাষা ভদ্র ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। কিন্তু কেবল ভাষা নিয়ে আলোচনা করে মূল সমস্যাকে উপেক্ষা করলে কোনো লাভ হয় না।
ববি হাজ্জাজ শেষ পর্যন্ত তার মন্তব্য প্রত্যাহার করেছেন। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নটি তুলেছিলেন, সেটি এখনও রয়ে গেছে। কেন আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে? কেন গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা ও প্রভাব প্রত্যাশিত নয়? কেন শিক্ষার্থীরা গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না? কেন গবেষণা সংস্কৃতি নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা শুধু তার অতীত দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় বর্তমানের কর্মক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দিয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের গর্ব। কিন্তু সেই গর্বকে টিকিয়ে রাখতে হলে আত্মতুষ্টি নয়, আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তব মূল্যায়ন। আর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রশ্নটিও সেখানেই—বক্তব্যটি কে বলেছে, সেটি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, বক্তব্যে যে সমস্যার কথা বলা হয়েছে, সেটি সত্যিই কতটা বাস্তব। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ।
আপনার মতামত জানানঃ